দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই বলে দাবি করেছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেছেন, পেট্রলপাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা গেলেও এটি প্রকৃত চিত্র নয়; বরং অতিরিক্ত ক্রয় ও মজুতের প্রবণতায় কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় সরকার ৩ হাজার ১৬৮টি অভিযান চালিয়েছে, ৫৩টি মামলা করেছে এবং ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায় এবং কারাদণ্ড দিয়েছে।
আজ সোমবার সংসদের বৈঠকে কার্যপ্রণালি বিধির ৩০০ বিধিতে নিজের মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত বিষয়ে কৈফিয়ত দিতে গিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী এই বিবৃতি দেন। বেলা সাড়ে তিনটায় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু জ্বালানি খাতের নয়; এর সঙ্গে জাতীয় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, অগ্রগতি, জনগণের দৈনন্দিন জীবনযাপন, উৎপাদন ব্যবস্থা, কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সামগ্রিক জাতীয় সমৃদ্ধির প্রশ্ন জড়িত। বৈশ্বিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে দেশের গ্যাস ও জ্বালানি তেলের মজুত ও সরবরাহের অগ্রিম প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা জনগণের সামনে উপস্থাপন জরুরি। বিভ্রান্তি সৃষ্টির মাধ্যমে যাতে কোনো মহল জনমনে উদ্বেগ তৈরি করতে না পারে, সে জন্যই তিনি এই বক্তব্য দিলেন বলে উল্লেখ করেন।
মন্ত্রী বলেন, বিশ্ব এখন অস্থির সময় অতিক্রম করছে। আন্তর্জাতিক সংঘাত, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সরবরাহ ঝুঁকি ও জ্বালানি পরিবহনের অনিশ্চয়তায় বিশ্ববাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করেছে, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। তবে তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, সরকারের সঠিক ও সময়োপযোগী প্রস্তুতির ফলে দেশে জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান জানান, দেশে বর্তমানে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই; বরং গত বছরের তুলনায় সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছরের একই সময়ে যে পরিমাণ জ্বালানি বিক্রি হয়েছিল, এ বছর তার চেয়েও বেশি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় ডিজেলের মজুত ছিল ২ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন, যা ৩০ মার্চে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন। এই ৪১ দিনে ৪ লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল বিক্রি হয়েছে। এত বিপুল বিক্রির পরও মজুত বজায় থাকা সরকারের আগাম প্রস্তুতি, ধারাবাহিক আমদানি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার প্রমাণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ঈদুল ফিতর সামনে রেখে পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা সচল রাখতে সরকার জ্বালানি মজুত বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চ মাসের চাহিদার ভিত্তিতে ২০২৬ সালের মার্চে ১০ থেকে ২৫ শতাংশ বেশি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। অর্থাৎ সম্ভাব্য চাহিদার চেয়েও বেশি প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তবে প্রকৃত চাহিদা সে অনুপাতে বাড়েনি। জনগণের মধ্যে অতিরিক্ত ক্রয় প্রবণতা বা আতঙ্ক পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সংসদে মন্ত্রী আরও বলেন, গত বছর মার্চে দৈনিক ডিজেলের চাহিদা ছিল ১২ হাজার মেট্রিক টন এবং অকটেন ও পেট্রলের চাহিদা ছিল যথাক্রমে ১ হাজার ২০০ ও ১ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন। চলতি বছরের ১ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত অকটেন বিক্রি হয়েছে ২৮ হাজার ৯৩৯ মেট্রিক টন, অর্থাৎ দৈনিক গড়ে ১ হাজার ২৫৮ মেট্রিক টন। এতে বোঝা যায় বাজারে জ্বালানির সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। মোট ব্যবহৃত জ্বালানির ৬৩ শতাংশ ডিজেল, আর অকটেন ৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং পেট্রল ৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন প্রকৃত পরিস্থিতির প্রতিফলন নয় উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, অতিরিক্ত ক্রয় ও মজুতের প্রবণতায় কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় সরকার ৩ হাজার ১৬৮টি অভিযান চালিয়েছে, ৫৩টি মামলা করেছে এবং ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা ও কারাদণ্ড দিয়েছে।
সরকার ডিজেলের পাশাপাশি অকটেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে এপ্রিল মাসে ৫ হাজার মেট্রিক টন অকটেন আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। এ ছাড়া দেশীয় উৎস থেকে আরও ৩ হাজার মেট্রিক টন পাওয়া যাবে। মাসিক চাহিদা ২৫ হাজার মেট্রিক টন হলেও এই ব্যবস্থায় অতিরিক্ত দুই মাসের চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে।
মন্ত্রী বলেন, মার্চ ২০২৬-এ অকটেনের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় কম নয়; বরং আগের সময়ের তুলনায় বেশি। কিন্তু ক্রেতাদের আচরণ অস্বাভাবিক। যেখানে একটি মোটরসাইকেল সাধারণত ৫ লিটার অকটেন নেয়, সেখানে এখন একই মোটরসাইকেল দিনে তিন-চারবার এসে ১৫–২০ লিটার নিচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি তেজগাঁও ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের তথ্য তুলে ধরেন—২০২৫ সালের মার্চে যেখানে দৈনিক ৫ হাজার ৪০০ লিটার অকটেন বিক্রি হতো, ২০২৬ সালের মার্চে তা অনেক বেড়েছে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে মন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রামে ৬ হাজার লিটার ডিজেল জব্দ, জামালপুরে জরিমানা, ময়মনসিংহে ২৪ হাজার লিটার জ্বালানি উদ্ধারসহ দেশজুড়ে অবৈধ মজুতের ঘটনা পাওয়া গেছে। ফলে সরবরাহ যথেষ্ট থাকলেও অতিরিক্ত ক্রয় ও মজুত স্বাভাবিক সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করছে এবং অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক সংকট সত্ত্বেও দেশে জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়নি, যদিও অনেক দেশে ২৫ শতাংশের বেশি দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, দেশে ডিজেলের বিক্রয়মূল্য ১০০ টাকা হলেও আন্তর্জাতিক বাজার অনুযায়ী ব্যয় প্রতি লিটার প্রায় ১৯৪–১৯৮ টাকা। অকটেনের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। মার্চ মাসে ডিজেলের আন্তর্জাতিক মূল্য ৮৮ শতাংশ এবং অকটেন ২৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এ কারণে মার্চ-জুন সময়ে ডিজেলে ১৫ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা এবং অকটেনে ৬২৬ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন হবে। এ ছাড়া এলএনজি আমদানিতে আরও ভর্তুকি দিতে হবে। তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক দেশ জ্বালানিসংকটে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্প কার্যক্রম সীমিত করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে সরকার জীবনযাত্রা সচল রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে এবং পরিবহন, শিক্ষা, শিল্প ও কৃষি কার্যক্রম চালু রয়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি না কিনতে, অপচয় রোধ, অবৈধ সংযোগ ও মজুতের বিরুদ্ধে সচেতন হতে এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ রাখা এবং নির্দিষ্ট সময়ের পর বিদ্যুৎ ব্যবহারে সংযত থাকতে তিনি অনুরোধ জানান।
সীমান্তবর্তী এলাকায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী জ্বালানি পাচারে জড়িত উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, সরকার তা কঠোরভাবে দমন করবে। অবৈধ মজুত সম্পর্কে তথ্য দিলে পুরস্কারের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। শেষে তিনি বলেন, সংকট মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ হতে হবে—‘আমি নই, আমরা; ব্যক্তি নয়, দেশ; অপচয় নয়, সাশ্রয়; বিভক্তি নয়, ঐক্য—সবার আগে বাংলাদেশ।’