জাতীয় সংসদ ভবন
জাতীয় সংসদ ভবন

সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটি

জুলাই সনদের সঙ্গে বিএনপির ইশতেহারও বিবেচনায়

প্রথম বৈঠকের পর কমিটি বলেছে, সবার মতামতের ভিত্তিতে সংবিধানের একটি গ্রহণযোগ্য সংশোধনী প্রস্তাব আনা হবে।

জুলাই জাতীয় সনদ সামনে রেখে সংবিধান সংশোধনের জন্য সুপারিশ তৈরির কাজ করবে জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন–সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। পাশাপাশি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে যেসব প্রস্তাব রয়েছে, সেগুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে। সুপারিশ তৈরির ক্ষেত্রে পুরো সংবিধান পর্যালোচনার পাশাপাশি সংবিধানবিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন অংশীজনেরও মতামত নেবে কমিটি।

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে প্রথম বৈঠক করে সংবিধান সংশোধন–সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। বৈঠক শেষে কমিটির পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানানো হয়। কমিটি বলেছে, সবার মতামতের ভিত্তিতে সংবিধানের একটি গ্রহণযোগ্য সংশোধনী প্রস্তাব আনতে চায় তারা।

বিরোধী দলের আপত্তি উপেক্ষা করে সংবিধান সংশোধনের জন্য সুপারিশসহ প্রতিবেদন দিতে গত ১৩ জুলাই এই বিশেষ কমিটি গঠন করে সংসদ। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে পাঁচজনের নাম দেওয়ার অনুরোধ করা হলেও তারা এই কমিটি প্রত্যাখ্যান করে কারও নাম দেয়নি। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। গতকালের বৈঠকে এই কমিটির সদস্য ইসলামী আন্দোলনের সংসদ সদস্য মো. অলি উল্লাহ উপস্থিত ছিলেন না। অন্য সদস্যরা সবাই বিএনপি ও তাদের মিত্র দলের সংসদ সদস্য।

সংবিধানবিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী ও বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেবে কমিটি। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করলে তাদেরও মতামত নেওয়া হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বৈঠক সূত্র জানায়, গতকালের বৈঠকে মূলত কমিটি কীভাবে কাজ করবে, তা নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক হয় প্রায় এক ঘণ্টা। তবে সরকারি অন্য কর্মসূচি থাকায় কমিটির সভাপতি বেশি সময় ছিলেন না। কমিটির সদস্যদের জুলাই সনদের সঙ্গে সংগতি রেখে কীভাবে প্রয়োজনীয় সংশোধনী প্রস্তাব আনা যায়, তা নিয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। বৈঠকের মাঝপথে বের হয়ে যাওয়ার সময় কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, তাঁরা উদার, তাঁরা সবার কথা শুনবেন। সর্বত্র যা যা সংশোধনের প্রয়োজন, সেগুলোর বিষয়ে প্রতিবেদন প্রণয়ন করবেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো সংশোধনী প্রস্তাবে রাখার চেষ্টা করবে কমিটি। সংবিধানবিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী ও বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেবে কমিটি। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করলে তাদেরও মতামত নেওয়া হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এভাবে আমরা একটা গ্রহণযোগ্য সংশোধনী আনতে চাই এবং জনপ্রত্যাশার সবকিছু আমরা ধারণ করতে চাই। সবার সঙ্গে আলাপ–আলোচনা করে আমরা সেই রিপোর্টটা প্রণয়ন করতে চাই।’

জুলাই সনদে থাকা সংবিধান–সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই সনদের ৪৭টি প্রস্তাবের মধ্যে অনেক কিছু আছে। তাঁরা রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে জুলাই সনদে একমত হয়েছেন। যেগুলোতে তাঁদের নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) ছিল, সেগুলো সেভাবে বিবেচনায় নেওয়া হবে।

রাজনৈতিক মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়া হবে না

বৈঠক শেষে কমিটির সদস্য ও আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, ‘জুলাই সনদ সামনে রেখে, জুলাই সনদকে বৃত্তায়ন করে, জুলাই সনদকে ধারণ করে, জুলাই চেতনাকে ধারণ করে সংবিধান সংশোধনের পথে এগিয়ে যাব।’

আইনমন্ত্রী বলেন, জুলাই সনদকে বাইপাস করে তাঁরা নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শ বা অন্য কিছু চাপিয়ে দেবেন না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুরো সংবিধানই পর্যালোচনা করতে হবে। কারণ, একটার সঙ্গে আরেকটার গাঁথুনি রাখতে হবে।

জুলাই সনদে থাকা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোগত কিছু প্রস্তাবে বিরোধী দল একমত হলেও বিএনপির আপত্তি ছিল। এমন বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে কী হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, কোনটা মানা উচিত, তা জুলাই সনদে দেওয়া আছে। কোনো জায়গায় বিএনপি দ্বিমত পোষণ করেছে এবং সেই দ্বিমতের আলোকে যদি তার নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা থাকে, তাহলে সেটা প্রিভেইল করবে। সেটাও কিন্তু জুলাই সনদেরই অংশ।

পঞ্চদশ সংশোধনীর আগে গঠন করা বিশেষ কমিটিতেও বিরোধী দল ছিল না। তার পরিপ্রেক্ষিতে দেশে কী পরিস্থিতি হয়েছিল, তা সবাই দেখেছে। এবারও সে রকম হওয়ার আশঙ্কা আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, জুলাই সনদে অঙ্গীকারনামা আছে। সেখানে সব দল সই করেছে। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীতে বিরোধী দল এ রকম কোনো অঙ্গীকারনামায় সই করেনি।

জুলাই সনদকে ‘কমপ্লিট কোড অব পলিটিক্যাল গাইডলাইন’ আখ্যা দিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে আমরা ওই আলোকে যাচ্ছি কি না, তারা (বিরোধী দল) বাইরে থেকে এটাকে পর্যবেক্ষণ করবে। তারা যদি মনে করে যে আমরা জুলাই সনদের ব্যত্যয় ঘটিয়েছি, অবশ্যই তাদের সেটার সমালোচনা করার অধিকার আছে এবং যৌক্তিক যেকোনো সমালোচনা আমরা অ্যাকমোডেট করার চেষ্টা করব।’

এক প্রশ্নের জবাবে কমিটির সদস্য ও চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, তাঁরা আগামী এক বা দুই বছরের জন্য নয়, আগামী প্রজন্মের জন্য সংবিধান সংশোধন করতে চান। যাতে তাঁরা এর সুফল ভোগ করেন। সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দল আসবে বলে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, সংশোধন ও সংস্কারের মধ্যে মূলত কোনো পার্থক‌্য নেই। যা–ই পরিবর্তন, সেটাই সংস্কার।

বৈঠকে সদস্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, আন্দালিভ রহমান, প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক, ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, সাকিলা ফারজানা ও মো. মাহমুদুল হক।