ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নিজেদের ইশতেহার ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে থাকা খেলাফত মজলিস
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নিজেদের ইশতেহার ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে থাকা খেলাফত মজলিস

খেলাফত মজলিসের ৩৫ দফা নির্বাচনী ইশতেহার, ১ কোটি কর্মসংস্থান নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নিজেদের ইশতেহার ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে থাকা খেলাফত মজলিস। ৩৫ দফার এই নির্বাচনী ইশতেহারে দলটি এক কোটি চাকরি ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, সমাজে সব ধর্ম–বর্ণের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সুনিশ্চিত করা এবং বিদেশে নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি করাসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর পুরানা পল্টনে খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই ইশতেহার প্রকাশ করা হয়। সেখানে ইশতেহার পড়ে শোনান দলটির যুগ্ম মহাসচিব ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল। ইশতেহারে ইসলামি আদর্শের আলোকে ইনসাফ, জনকল্যাণমুখী ও জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠায় খেলাফত মজলিসের অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

মাওলানা আবদুল বাছিত আজাদ ও আহমদ আবদুল কাদের নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিসের ইশতেহারের ৩৫ দফার মধ্যে আছে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ও কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন ও জবাবদিহি, জননিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা, স্বাধীন গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা ও আধুনিকায়ন। এ ছাড়া এতে কঠোরভাবে দুর্নীতি দমন, অর্থ পাচার ও চাঁদাবাজি বন্ধ করারও প্রতিশ্রুতি আছে।

খেলাফত মজলিস জিডিপির প্রবৃদ্ধি ১২ শতাংশে নিতে চায়। সব অঞ্চলের সুষম উন্নয়ন ও আর্থিক সুশাসন, মাতৃভাষা, যার যার ধর্মীয় ভাষা ও ইংরেজি ভাষা শিক্ষা সর্বত্র বাধ্যতামূলক করা, প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে সামরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা। সব মিথ্যা ও রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার, পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা, বিনা পরোয়ানায় সাদাপোশাকে গ্রেপ্তার বন্ধ করা ও জনবান্ধব ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা তৈরি করতে চায় দলটি।

মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ নিশ্চিত করা ও যাবতীয় আধিপত্যবাদ–আগ্রাসী তৎপরতা মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া, মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সঠিক তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাসহ সব মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের উপযুক্ত মূল্যায়ন করার বিষয়টি আছে ইশতেহারে। এ ছাড়া সব নিয়োগ পরীক্ষা পিএসসির নিয়ন্ত্রণে আনা এবং দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা মজবুত করা, অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরি, উন্নত সমরাস্ত্র তৈরিতে মনোযোগ দেওয়া ও স্কুল–কলেজ–মাদ্রাসার শিক্ষার্থীসহ সব সক্ষম নাগরিককে দুই বছর মেয়াদি সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথাও ইশতেহারে বলেছে খেলাফত মজলিস।

ক্ষমতায় গেলে সম্পত্তিতে নারীর অধিকার, সর্বত্র নারীর সম্মান ও স্বাতন্ত্র্য নিশ্চিত করা, সাধারণ শিক্ষা ও মাদ্রাসা শিক্ষার মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে সমন্বিত একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু, তরুণ বিজ্ঞানীদের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন ও গবেষণামূলক কাজে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার কথা বলেছে খেলাফত মজলিস। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নয়নে বিশেষ পদক্ষেপ, ক্রীড়া সংগঠনগুলোকে রাজনীতিমুক্ত ও শক্তিশালী করা, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ‘সবার প্রতি বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়’—এই নীতি পালন, আধিপত্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদের বিরোধিতার কথা বলেছে তারা। রোহিঙ্গা সংকট সমাধান করে তাঁদের সম্মানের সঙ্গে প্রত্যাবর্তনের শক্তিশালী উদ্যোগ নেওয়া, আটকে পড়া পাকিস্তানি ইস্যু সমাধান, কৃষি ও ভূমি ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়া, দ্রুত দেশকে একটি আধুনিক শিল্পোন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং গ্রামের উন্নয়নও করতে চায় দলটি।

খেলাফত মজলিস তাদের ইশতেহারে বলেছে, শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা, সব শ্রেণির শ্রমিকদের সম্মানজনক জীবনধারণের উপযোগী ন্যূনতম বেতন–ভাতা নির্ধারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিপ্লব ঘটানো, দেশের প্রতিটি খনিজ সম্পদের সঠিক ব্যবহারের জন্য জাতীয় খনিজ নীতি প্রণয়ন করবে তারা। এর পাশাপাশি খনিজে অনুসন্ধান ও জরিপের জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ, প্রত্যেক নাগরিকের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা, উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে পূর্ণাঙ্গ ২০০ শয্যার ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে ১০০ শয্যার হাসপাতালে রূপান্তর, মাদকাসক্তি নির্মূলে পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলেছে তারা।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে উদ্যোগ নেওয়া, যানজটমুক্ত করা, গণপরিবহনব্যবস্থাকে আধুনিক, নিরাপদ ও সুলভ করা, জাতীয় বাজেটের ১০ শতাংশ স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি। ৫৪টি আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা, তিস্তা প্রকল্পকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে নদীভাঙন–কবলিত মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা এবং দেশের পর্যটনশিল্পকে উন্নত করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের মাধ্যম বাড়ানো, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে পর্যটন স্থানগুলোর বিশ্বব্যাপী প্রচারেও কাজ করবে খেলাফত মজলিস।

নির্বাচন সময়ের জন্য শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসহ সবার সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর সরকারপদ্ধতি প্রবর্তন, নির্বাচন কমিশনকে প্রকৃতপক্ষে নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও শক্তিশালী করা এবং প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করা, প্রবাসীরা যাতে দেশে এসে সুদমুক্ত ইসলামি বন্ড বা লাভজনক প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে পারেন, এর রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তা দেওয়ার কথাও নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করেছে খেলাফত মজলিস।

সংবাদ সম্মেলনে খেলাফত মজলিসের নেতা মাওলানা সাইয়েদ ফেরদাউস বিন ইসহাক, আবদুল জলিল, কাজী মিনহাজুল আলম, আমিনুর রহমান ফিরোজ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।