
নির্বাচনে সহিংসতা বাংলাদেশে নতুন নয়। গত পাঁচটি সংসদ নির্বাচনের হিসাবে চোখ রাখলে দেখা যায়, তাতে অন্তত ১৬৫ জন মারা গেছেন। আহত ব্যক্তির সংখ্যা ৩ হাজার ৬৫৭ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সহিংসতা হয়েছিল ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনে। বিনা ভোটের নির্বাচন নামে পরিচিতি পাওয়া সেই নির্বাচন কেড়ে নিয়েছিল ১১৫ জনের প্রাণ। সেবার আহত ব্যক্তির সংখ্যাটি ছিল ৮৫৪।
সহিংসতায় নিহত ব্যক্তির এই হিসাব পুলিশ সদর দপ্তরের। হিসাবটি করা হয়েছে নির্বাচনগুলোর তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোটগ্রহণের পরবর্তী সাত দিন পর্যন্ত নির্বাচনী সহিংসতায় আহত ও নিহতের পরিসংখ্যান নিয়ে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও সহিংসতার আশঙ্কা করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। গত ডিসেম্বরে তফসিল ঘোষণার পরদিনই দুর্বৃত্তের গুলির নিশানা হন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি। পরে তাঁর মৃত্যু হয়। গত ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত হিসাব করে দেখা যাচ্ছে, তফসিল ঘোষণার পর ৩৬ দিনে সারা দেশে অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।
গত পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে তিনটিই অনুষ্ঠিত হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের সময়, এই সব কটি নির্বাচনই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত। এর মধ্যে ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল পুরোপুরি একতরফা। একজন মাত্র প্রার্থী থাকায় ১৫৩টি আসনে তখন ভোটেরই প্রয়োজন হয়নি। এরপর ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশজুড়ে ‘রাতের ভোট’ হিসেবে পরিচিতি পায়। সবশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচিতি পায় ‘ডামি নির্বাচন’ নামে।
বিগত পাঁচটি নির্বাচনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সহিংসতা হয় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচনে। এতে নিহত হন ১১৫ জন, আহত হন আহত হন ৮৫৪ জন। সহিংসতায় হতাহত সবচেয়ে কম ছিল ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে, ১১ জন।
এর আগে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম সংসদ নির্বাচনও হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন। সেই নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে নির্বাচনী সহিংসতায় মারা যান ২ জন, আহত হন ৭৫০ জন। ২০১৮ সালের একাদশ নির্বাচনে সহিংসতায় মারা যান ১৬ জন, আহত হন ৬৭০ জন। ২০১৪ সালের দশম নির্বাচনে সহিংসতায় মারা যান ১১৫ জন, আহত হন ৮৫৪ জন।২০০৮ সালের নবম নির্বাচনে সহিংসতায় মারা যান ৭ জন, আহত হন ৪ জন। ২০০১ সালের অষ্টম নির্বাচনে সহিংসতায় মারা যান ২৫ জন, আহত হন ৩৭৩ জন।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শঙ্কার বড় বিষয় হয়ে উঠেছে জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ে থানা থেকে লুটপাট হওয়া পুলিশের অস্ত্র। এই অস্ত্র উদ্ধার এবং সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ অভিযান ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ চলছে। পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি-ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচনী সহিংসতা রোধে পুলিশ সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে। বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে মাঠে কাজ করছে পুলিশ।
সবচেয়ে সহিংস দশম
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য দেখাচ্ছে, বিগত পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২৫ নভেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন থেকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন প্রধান বিরোধীদলীয় জোট ২৬ দিন অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোট গ্রহণের পরের সাত দিনে নিহত হন ১১৫ জন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে চারজন ছিলেন পুলিশ সদস্য।
নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার পাশাপাশি ২০১৩ সালে রাজনৈতিক সহিংসতায় সর্বাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান বলছে, বছরজুড়ে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের রায় এবং বছরের শেষ দিকে একতরফা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা ও বিরোধী জোটের অবরোধ কর্মসূচির মতো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সারা বছরে ৫০৭ জন মারা যান, আহত হন ২২ হাজার ৪০৭ জন।
এবারও সহিংসতার শঙ্কা
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দেশবাসী একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের অপেক্ষায় রয়েছেন। তার মধ্যে শঙ্কার ছায়া ফেলছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি।
জুলাই আন্দোলনের সময় পুলিশের ওপর হামলা, থানা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ করে পুলিশের অস্ত্র লুটের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। অন্তর্বর্তী সরকার গত দেড় বছরেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি করতে পারেনি বলেই মনে করেন পর্যবেক্ষকেরা। এখনো ‘মব ভায়োলেন্সের’ ঘটনা ঘটছে। এর প্রভাব নির্বাচনেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও কোনো প্রার্থীর পক্ষে সহিংসতা চালিয়ে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করতে পারেন।
নির্বাচনে সহিংসতার আশঙ্কা ও পুলিশের প্রস্তুতি নিয়ে পাঁচটি জেলার পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁরা বলেন, যেসব আসনে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে শক্তির প্রতিযোগিতা হবে, সেখানে সহিংসতার শঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি যেসব আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী শক্তিশালী, সেখানেও সহিংসতার শঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে জামালপুর জেলার পুলিশ সুপার চৌধুরী মো. যাবের সাদেক প্রথম আলোকে বলেন, যেসব আসনে সহিংসতার সম্ভাবনা রয়েছে, এমন আসনের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে নানা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকদের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। পাশাপাশি তল্লাশিচৌকি, নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এবার নির্বাচনে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ওপর বাড়তি নজরদারি রাখা হবে, যাতে কোনো প্রার্থী কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ব্যবহার করে নির্বাচনে সহিংসতা করতে না পারে।’
নির্বাচনে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর কোনো হুমকি রয়েছে কি না, তা নিয়ে সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই বৈঠকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসা থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জামাদি উদ্ধারের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ওই মাদ্রাসায় বানানো কিছু বোমা বিস্ফোরণের কয়েক দিন আগেই সেখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। নির্বাচনে সহিংসতা সেগুলো ব্যবহারের শঙ্কা রয়েছে।
অস্ত্র নিয়ে শঙ্কা
নির্বাচনী সহিংসতায় অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেশি হয়। নির্বাচনের আগে সীমান্ত নিয়ে দেশে অবৈধ অস্ত্র আসার তথ্য পেয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
পুলিশ সদর দপ্তরের একটি সূত্র বলছে, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র আসার তথ্য পেয়ে দেশের সীমান্তবর্তী ৩৫ জেলার পুলিশ সুপারকে নজরদারি ও অভিযান বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সীমান্তে যাঁরা অস্ত্র চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত, তাঁদের গ্রেপ্তারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শঙ্কার বড় বিষয় হয়ে উঠেছে জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ে থানা থেকে লুটপাট হওয়া পুলিশের অস্ত্র। এই অস্ত্র উদ্ধার এবং সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ চলছে। যেসব আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছে, সেখানেও সহিংসতার শঙ্কা রয়েছে।
অবৈধ অস্ত্রের পাশাপাশি গত ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত পুলিশের লুট হওয়া ১ হাজার ৩৩১টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। নির্বাচনী সহিংসতা সন্ত্রাসীরা এসব অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা। তাঁরা বলেন, পুলিশের খোয়া যাওয়া অস্ত্র ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আরও জোরালো অভিযান পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র রয়েছে, এমন সন্ত্রাসীদের নির্বাচনের আগেই গ্রেপ্তার করতে হবে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সম্প্রতি অবশ্য বলেছেন, নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রাধিকার। তিনি জানান, গত ১৩ ডিসেম্বর থেকে চালু হওয়া অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২ অভিযানে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ২২ হাজার ৪৬৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে ৪৮৩টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৪ হাজার ৬৬০টি গুলি, ৭৯৯টি কার্তুজ, ১ হাজার ৮৪টি দেশি অস্ত্র, গ্রেনেড, মর্টারের গোলা, গান পাউডার, আতশবাজি, বোমা তৈরির উপকরণ।