পবিত্র রমজানে এক মাস রোজা রাখা ফরজ। রমজান মাস শেষে ঈদ উদ্যাপন ও সদকাতুল ফিতর প্রদান করা ওয়াজিব। রমজান মাসে রয়েছে বিশেষ কিছু সুন্নত আমল। যেমন সাহ্রি খাওয়া, ইফতার করা, তারাবির নামাজ আদায় করা, কোরআন শরিফ তিলাওয়াত করা, শেষ দশকে ইতিকাফ করা। এ ছাড়া রয়েছে মোস্তাহাব ও নফল আমলে সত্তর গুণ অধিক সওয়াবের সুবর্ণ সুযোগ।
ইমানের পর ইসলামের যে দুটি বিধান সর্বজনের জন্য প্রযোজ্য, তা হলো নামাজ ও রোজা। রোজা ও নামাজ একই সঙ্গে মেরাজ রজনীতে ফরজ হয়েছিল। তাই রোজার সঙ্গে নামাজের সম্পর্ক সুনিবিড়। প্রিয় নবী (সা.) ইরশাদ করেছেন: ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করেছেন, আর আমি তোমাদের জন্য তারাবির নামাজকে সুন্নত করেছি; অতএব যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজানে দিনে রোজা পালন করবে ও রাতে তারাবির নামাজ আদায় করবে, সে গুনাহ থেকে এরূপ পবিত্র হবে, যেরূপ নবজাত শিশু মাতৃগর্ভ থেকে (নিষ্পাপ অবস্থায়) ভূমিষ্ঠ হয়।’ (নাসায়ি শরিফ, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা ২৩৯)।
প্রতিটি ফরজ ইবাদত শুরু করতে হয় সুন্নত দিয়ে, পালন করতে হয় সুন্নত পদ্ধতিতে। তাই তো পবিত্র রমজানের চাঁদ দেখা গেলে রোজার আগেই প্রথম যে আমলটি আমরা করি, তা হলো তারাবির নামাজ। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: ‘যে ব্যক্তি ইমানের সহিত সওয়াবের উদ্দেশ্যে রমজান মাসে রাত্র জাগরণ করে তারাবির নামাজ পড়বে, তার অতীতের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (বুখারি শরিফ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০, হাদিস ৩৬; ই. ফা.)।
তারাবি শব্দটি বহুবচন, এর একবচন হলো তারাবিহাহ; যার আভিধানিক অর্থ হলো বিশ্রাম ও প্রশান্তি। পরিভাষায় তারাবি হলো: ‘রমজান মাসে এশার নামাজের পর যে সুন্নত নামাজ কায়েম করা হয়, সে নামাজ হলো তারাবির নামাজ।’ (কামুসুল ফিকাহ)। যেহেতু চার রাকাত পরপর বিরতির মাধ্যমে বিশ্রাম নেওয়া হয়, তাই এর এ নামকরণ করা হয়েছে।
তারাবির নামাজ ২০ রাকাত সুন্নতে মুআক্কাদাহ। পুরুষদের জামাতে আদায় করা সুন্নত। তারাবির নামাজে পূর্ণ কোরআন শরিফ একবার পাঠ করা সুন্নত। একে আমরা খতম বা সমাপ্ত করা ও খতম তারাবি বলি। পূর্ণ কোরআন না পড়ে বিভিন্ন সুরা দিয়ে তারাবির নামাজ আদায় করা হলে একে সুরা তারাবি বলা হয়। সুরা তারাবি পড়লেও ২০ রাকাত পড়া সুন্নত। একা পড়লেও ২০ রাকাত সুন্নত। নারীদের জন্যও ২০ রাকাত সুন্নত। এশার নামাজের পর থেকে ফজরের নামাজের পূর্ব পর্যন্ত তারাবির নামাজের সময়।
হজরত হাসান (রা.) বলেন, ‘হজরত উমর (রা.) মানুষকে একত্র করলেন হজরত উবাই ইবনে কাআব (রা.)-এর পেছনে; তখন তিনি তাঁদের ইমামতি করে ২০ রাকাত নামাজ পড়তেন।’ (আবু দাউদ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৬৫, হাদিস ১৪২৯)। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, নবী (সা.) ২০ রাকাত (তারাবি) পড়তেন এবং বিতির। (মাকতাবাতু ইবনে তাইমিয়া, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ৩৯৩, হাদিস ১৬১০৬)। হজরত আবুজার গিফারি (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলে করিম (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি ইমামের সঙ্গে (তারাবির) নামাজ পড়ল, ইমাম প্রস্থান করা পর্যন্ত (সমাপ্ত করে গেল); তার কিয়ামে লাইল (রাত জাগরণের সওয়াব পূর্ণরূপে) লিখিত হবে। (তিরমিজি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৬১-১৬৯, হাদিস ৮০৬)। হজরত ইবনে রুমান (র.) বলেন, হজরত উমর (রা.)-এর খিলাফতের সময় মানুষ ২৩ রাকাতের (বিতিরসহ তারাবির নামাজ) মাধ্যমে রাত জাগরণ করত। (মুআত্তা মালিক, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১১০, হাদিস ২৮১; আবু দাউদ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৬৯৯, হাদিস ৪২৮৯)।
মোল্লা আলী কারি (র.) বলেন, তারাবির ২০ রাকাত, এ বিষয়ে সকল সাহাবি ইজমা (ঐকমত্য) হয়েছেন। (মিরকাত শারহে মিশকাত, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৯৪)। শাঈখ উসাইমিন (র.) বলেন: ‘সুন্নত হলো যে ইমামের অনুসরণ করবে; কারণ যখন ইমাম (তারাবি) সম্পূর্ণ করার পূর্বে (মুক্তাদি) চলে যায়, তখন সে কিয়ামে লাইলের (রাত জাগরণ) সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়।’ তিনি আরও বলেন: ‘আমরা দেখছি কিছু লোক ইমামের (২০ রাকাত তারাবি সমাপ্ত হওয়ার) আগেই চলে যায়; শরিয়তের বিধানমতে ইমামের অনুকরণই বড় ওয়াজিব, এর বিপরীত করা মন্দ কাজ। (মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড ১৪, পৃষ্ঠা ২০০-২০১)।
ইবনে তাইমিয়া (র.) বলেন: ‘তবে তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, নিশ্চয় উবাই ইবনে কাআব (রা.) রমজানে রাত জাগরণে ২০ রাকাতে (তারাবির নামাজে) মানুষের ইমামতি করতেন এবং ৩ রাকাত বিতির নামাজ পড়তেন। তাই বহু উলামায়ে কিরাম মনে করেন, এটাই সুন্নত; কেননা, তা আনসার ও মুহাজিরগণের (সকল সাহাবি) মধ্যে প্রতিষ্ঠিত, আর কেউ তা অস্বীকার করেননি। অন্য ইমামগণ ৩৯ রাকাত (বিতিরসহ) তারাবি পড়া পছন্দ করেন; কারণ, তা হলো মদিনার আমল। তিনি আরও বলেন: সুতরাং ২০ রাকাত তারাবিই উত্তম, আর এটাই অধিকাংশ মুসলমানের আমল; আর নিশ্চয় এটি ১০ (সর্বনিম্ন) ও ৪০-এর (সর্বোচ্চ) মাঝামাঝি। তবে যদি কেউ ৪০ রাকাত বা অন্য কোনো সংখ্যা আদায় করেন, তা-ও জায়েজ হবে; এ বিষয়ে অন্য ইমামগণও আলোকপাত করেছেন। (মজমুআহ ফাতাওয়া, খণ্ড ২২, পৃষ্ঠা ২৭২; খণ্ড ২৩, পৃষ্ঠা ১১২)।
পবিত্র রমজানে প্রথম প্রথম কয়েক দিন রোজার কথা মনে না-ও থাকতে পারে এবং ভুলক্রমে পানাহার বা রোজার বিপরীত কর্ম সংঘটিত হতে পারে। রোজা অবস্থায় দিনের বেলায় ভুলক্রমে (রোজার কথা ভুলে গিয়ে) পানাহার বা রতিক্রিয়া করলে রোজার কোনো ক্ষতি হবে না; কাজা বা কাফফারা কিছুই লাগবে না। কারণ, অনিচ্ছাকৃত ভুল আল্লাহ মাফ করবেন। তবে রোজার কথা মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা বন্ধ করে দিতে হবে। মনে হওয়ার পর খেলে রোজা ভঙ্গ হবে এবং কাজা ও কাফফারা উভয় আদায় করতে হবে। যেহেতু মনে হওয়ার পর ইচ্ছা করে করা হয়েছে; যা রোজা ভঙ্গের কারণ। আর ইচ্ছাকৃত রোজা ভঙ্গ করলে, তার কাজা ও কাফফারা উভয় আদায় করতে হয়। কাজা হলো ১টি রোজার পরিবর্তে ১টি আর কাফফারা হলো ৬০টি; সুতরাং ১টি রোজার কাজা ও কাফফারা মিলে মোট ৬১টি রোজা। (ফাতাওয়ায়ে শামি, তারভিরুল আবছার)।
মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী: যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি, সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম।
smusmangonee@gmail.com