
সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে নারীরা কোনো না কোনোভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন। কত যে বিচিত্র পন্থায় অহরহ নারীর প্রতি সহিংসতা ও ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটছে! ঘরে-বাইরে, শিক্ষাঙ্গনে-কর্মস্থলে—সর্বত্র মেয়েদের নানা ধরনের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। একশ্রেণির বখাটে যুবক নারীর প্রতি অন্যায় ও অশোভন আচরণ করে থাকে। ফলে নারী নির্যাতনের ঘটনা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ধর্ষণের শিকার নারীদের কেউ কেউ আত্মহত্যায় বাধ্য হন। কখনো পাষণ্ড স্বামী নিজের স্ত্রীকেও মারধর করছেন! এমনকি নির্যাতনকারী পুরুষ নারীকে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করছেন না। এসবের মূলে মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব-কর্তব্য ও আন্তরিক প্রেম-ভালোবাসার অভাব এবং নারীর সৌন্দর্যের প্রতি দৃষ্টিলোলুপ কামনা-বাসনা বখাটেদের অন্তরকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে। নারী নির্যাতনকারী ও অশালীন আচরণকারী ব্যক্তি সমাজের মানুষের কাছে অত্যন্ত ঘৃণ্য; আল্লাহর কাছেও নিকৃষ্ট। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্কবাণী ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ অশালীন ও দুশ্চরিত্র ব্যক্তিকে ঘৃণা করেন।’ (তিরমিজি) তিনি আরও বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে ওই ব্যক্তি সবচেয়ে খারাপ, যার অশ্লীলতা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য লোকেরা তাকে পরিত্যাগ করে।’ (বুখারি)
ইসলামে অহেতুক নারীদের নির্যাতন করার কোনো সুযোগ নেই। নারী নির্যাতনকারীকে জঘন্য অপরাধী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যেসব কারণে নারীরা সমাজে নির্যাতিত হন, সেসব থেকে বিরত থাকতে দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। ইসলামের বিধান অনুযায়ী পারিবারিক জীবনে স্বামী স্ত্রীকে শারীরিক বা মানসিকভাবে কোনো ধরনের নির্যাতন বা প্রহার করবেন না। স্ত্রীর ওপর যদি স্বামী কোনো কারণে রেগে যান, তবু তাঁকে অশ্লীলভাবে গালাগাল করবেন না। স্ত্রীর সঙ্গে যদি দাম্পত্য কলহ বা ঝগড়া-বিবাদ হয় এবং স্ত্রী স্বামীর কথা না শোনেন, তাহলে তাঁকে সদুপদেশ দিয়ে সংশোধনের সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। এতে কাজ না হলে স্ত্রীকে সাময়িক শাস্তি দেওয়ার জন্য ঘরের মধ্যে পৃথক বিছানায় রাখা যেতে পারে, কিন্তু অকারণে তাঁকে অমানুষিক নির্যাতন, মারধর করা বা ঘর থেকে বের করে দেওয়া যাবে না। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘তুমি (স্ত্রীর) মুখমণ্ডলের ওপর আঘাত কোরো না, তাকে অশ্লীল গালাগাল কোরো না এবং গৃহ ব্যতীত অন্য কোথাও তাকে পৃথক করে রেখো না।’ (আবু দাউদ)
অথচ অর্থের লোভে বিদেশে নারী পাচার করে, স্বামী-স্ত্রীর বিরোধের জের হিসেবে বা যৌতুকের জন্য মারধর বা শ্বাসরোধ করা, বিষ প্রয়োগ, গণধর্ষণের পর হত্যা, গুলি ও অ্যাসিড নিক্ষেপ করে নানা উপায়ে নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন চলছে। ইসলাম পরিপন্থী এসব লোমহর্ষক নির্যাতন বন্ধের উপায় খুঁজে বের করে সমস্যার সমাধানকল্পে ধর্মপ্রাণ জাতিকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচেষ্টা চালানো খুবই জরুরি। অ্যাসিড মেরে নারীর প্রতি প্রতিহিংসা চরিতার্থকরণ, যৌতুকের জন্য নিরীহ বধূর ওপর শ্বশুরালয়ের সবাই মিলে মানসিক নির্যাতন চালানো, কখনো শারীরিক অত্যাচার এমনকি গুপ্তহত্যার ঘটনাও ঘটে থাকে! নারী নির্যাতন বন্ধে সচেতন অভিভাবক মহলের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করা দরকার। সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে যে নারী-পুরুষ মিলে যে ঘরসংসার, বহু ঘর নিয়ে যে মুসলিম সমাজ, সেখানে প্রত্যেকেরই গুরুত্ব, মর্যাদা, অধিকার ও ভূমিকা রয়েছে। বৈবাহিক রীতি অনুযায়ী নারী ও পুরুষ পরস্পরকে পছন্দ করে যে নীড় বাঁধেন, সেই সুখের ঘরে একে অন্যের প্রতি কোনোক্রমেই শত্রুভাবাপন্ন ও নির্যাতনকারী হতে পারেন না। পারিবারিক জীবনে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে পারস্পরিক বিশ্বাস ও ভালোবাসাই ঘরের বন্ধনটি সুদৃঢ় ও শান্তিময় করে রাখতে পারে। ইসলামে নারীদের অনেক বেশি মর্যাদা ও অধিকার দেওয়া হয়েছে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে ইসলামের প্রকৃত মর্মবাণীকে কাজে লাগাতে হবে। নারী-পুরুষের সুন্দর শান্তিময় জীবন সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘নারীদের তেমনি ন্যায়সংগত অধিকার আছে, যেমন আছে তাদের ওপর পুরুষদের।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ২২৮)
নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। সমাজে নারী ও পুরুষের যে ন্যায্য অধিকার ও গুরুত্ব রয়েছে, উভয়ে মিলে তাঁরা যে অভিন্ন সত্তা, এ মানবিকতাবোধকে পুরুষেরা গভীরভাবে উপলব্ধি না করলে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটবে না। কারণ, নারী-পুরুষের সম্পর্ক ও দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই নির্যাতনের মূল সূত্রটি লুক্কায়িত আছে। এ মনোভাব পাল্টানোর জন্য উপযুক্ত আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের পাশাপাশি দেশের আলেম সমাজ ও সচেতন নাগরিকদের প্রধান দায়িত্ব নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করার লক্ষ্যে সমাজে ধর্মীয় মূল্যবোধ, সুনীতি ও আদর্শ প্রতিষ্ঠার সামাজিক আন্দোলন জোরদার করা। নারীর প্রতি পুরুষের যখন পরিপূর্ণ আস্থা আসবে এবং স্ত্রীকে প্রেম–প্রীতি ও মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ করা যাবে, তখনই পৃথিবী শান্তির নীড় হবে।
সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ও বিজাতীয় অপসংস্কৃতির প্রভাব, সুস্থ বিনোদনের অভাব কিংবা অন্যান্য কারণে সমাজে বখাটে যুবকদের সংখ্যা বাড়ছে, তা সমাজের অভিভাবকদের যেমন খুঁজে বের করতে হবে, তেমনি নারী নির্যাতন গণপ্রতিরোধের আন্দোলনেও শামিল হতে হবে। দেশে নারী নির্যাতনবিরোধী কঠোর আইন রয়েছে, কিন্তু এর যথাযথ প্রয়োগের অভাবে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হচ্ছে না। তাই নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে মসজিদের ইমাম, খতিব ও ধর্মীয় নেতাদের সচেতনতা সৃষ্টির গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে। সেই সঙ্গে মা-বোনদেরও নিজ নিজ মানবিক মর্যাদা, শালীনতা রক্ষা এবং অধিকার-কর্তব্যের প্রতি সজাগ থাকা উচিত। পুরুষ নারীর প্রতিপক্ষ নন, নারী পুরুষের প্রতিপক্ষ নন; বরং দুয়ে মিলেই সমাজ। এ সচেতন দৃষ্টিভঙ্গির লালন ও নীতি-নৈতিকতার বিকাশের মধ্যেই নিহিত আছে নারী নির্যাতন প্রতিরোধের বীজমন্ত্র।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com