ইবাদত

বরকতময় রমজান

পবিত্র মাহে রমজানের বরকত নিয়ে কোরআন ও হাদিসে অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে। মাহে রমজানের বরকত নিঃসন্দেহে অপার অসীম। পুরো মাস রমজানের রোজা রেখে আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ তাঁর আরও প্রিয় হয়ে ওঠেন। বরকতের নদী উপচে পরে মহান বান্দার ওপর। রোজাদার বান্দার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রয়েছে বিশেষ পুরস্কার।  

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে আছে, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি ইমান অবস্থায় আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও সওয়াবের নিয়তে রমজানের রোজা রাখবে, তার অতীতের সকল পাপ মাফ করে দেওয়া হবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস, ১৮০২)

রমজানের পুরো মাসেই রয়েছে বরকতের বিভিন্ন দিক। হাদিসে এসেছে, রমজানের প্রথম দিনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইবাদতকে নিরবচ্ছিন্ন রহমত দ্বারা আচ্ছাদিত করে নেন। অর্থাৎ রমজানের প্রতিটি ইবাদতের সঙ্গে আল্লাহর বিশেষ রহমত ও বরকত দান করেন। (সহিহ ইবনে খুজায়মা)

পুরো মাস রমজানের রোজা রেখে আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ তাঁর আরও প্রিয় হয়ে ওঠেন। বরকতের নদী উপচে পরে মহান বান্দার ওপর।

কোরআন অবতরণের মাস

পবিত্র রমজান মাসেই মহাগ্রন্থ কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, রমজান মাস, এতে নাজিল হয়েছে কোরআন, যা মানুষের দিশারি এবং স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারী। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫)

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও তার কবিতায় রমজানে পবিত্র কোরআন নাজিলের কথা বলেছেন।

‘ওগো রমজান, তোমারি তরে মুসলিম যত

রাখিয়া রোজা ছিল জাগিয়া চাহি তব পথ;

আনিয়াছিলে দুনিয়াতে তুমি পবিত্র কোরআন।’

তাকওয়ার অর্জন ও পুরস্কার লাভের মাস 

পবিত্র রমজান হলো তাকওয়ার অর্জনের মাস। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে ইমানদারগণ, তোমাদেরও পর রমজানের রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’ (সুরা বাকারা: ১৮৩)

হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘রোজা শুধু আমার জন্য, আমিই তার প্রতিদান দেব।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৬)

রাসুল (সা.) বলেন, ‘বেহেশতে একটি দরজা আছে, নাম ‘রাইয়্যান’। কিয়ামতের দিন রোজাদারেরা শুধু সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে, আর কেউ নয়। আহ্বান করা হবে, “রোজাদারেরা কোথায়?” তারা দাঁড়িয়ে যাবে এবং তারা ছাড়া কেউ এ দরজায় প্রবেশ করবে না। তাদের প্রবেশের পর দরজা বন্ধ হয়ে যাবে এবং এরপর কারও প্রবেশের উপায় থাকবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮৯৬)

রমজান মাস, এতে নাজিল হয়েছে কোরআন, যা মানুষের দিশারি এবং স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারী।
কোরআন, সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫

মুহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর শপথ, মুসলমানদের জন্য রমজানের চেয়ে উত্তম কোনো মাস আসেনি এবং মোনাফেকদের জন্য রমজান মাসের চেয়ে অধিক ক্ষতির মাসও আর আসেনি। কেননা, মুমিনরা এই মাসেই (সারা বছরের জন্য) ইবাদতের শক্তি ও পাথেয় সংগ্রহ করে। আর মোনাফেকরা তাতে মানুষের উদাসীনতা ও দোষত্রুটি অন্বেষণ করে। এ মাস মুমিনের জন্য গনিমত আর মোনাফেকের জন্য ক্ষতির কারণ।’ (মুসনাদে আহমাদ : ৮৩৬৮)

রাসুল (সা.) বলেন, ‘এই মাসের প্রতি রাতে একজন ঘোষণাকারী এই বলে আহ্বান করতে থাকে, হে কল্যাণ অনুসন্ধানী, অগ্রসর হও। হে অসৎ কাজের পথিক, থেমে যাও। তুমি কি জানো, এই মাসের প্রতি রাতে আল্লাহ কতজনকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৬৮৪)

রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইমান ও একনিষ্ঠতার সঙ্গে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে রোজা পালন করবে। আল্লাহ তার পেছনের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০১৪)

অন্য হাদিসে এসেছে, নবীজি (সা.) বলেন, ‘রমজান মাসের প্রতিটি রাত ও দিনের বেলায় বহু মানুষকে আল্লাহ–তাআলা জাহান্নাম থেকে মুক্তির  দেন। এ মাসে প্রত্যেক মুসলমানের দোয়া কবুল করা হয়।’ (মুসনাদে আহমাদ : ৭৪৫০)

হাদিসে এসেছে, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না—ইফতার অবধি রোজাদার, ন্যায়পরায়ণ শাসক ও অত্যাচারিতের দোয়া। এমন দোয়া মেঘ ছাড়িয়ে যায় এবং তার জন্য আকাশের দুয়ার খুলে দেওয়া হয়, আর আল্লাহ–তাআলা বলেন, “আমার মর্যাদার শপথ, বিলম্বে হলেও আমি তোমাকে সাহায্য করব।”’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৯৮)

রমজানের আরেকটি বরকত হলো, এ মাসে ওমরাহ আদায় করলে হজের সমান সওয়াব হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৭৮২; সহিহ মুসলিম : ১২৫৬)।

মহিমান্বিত রজনী শবে কদর 

রমজানে মুমিনের অন্যতম আরেকটি পাওনা হলো পবিত্র শবে কদর। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি কোরআন নাজিল করেছি মর্যাদাপূর্ণ কদর রজনীতে। আপনি কি জানেন, মহিমাময় কদর রজনী কী? কদর রজনী হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। সে রাতে ফেরেশতাগণ ও জিবরাইল সমভিব্যহারে অবতরণ করেন; তাঁদের প্রভু মহান আল্লাহর নির্দেশ ও অনুমতিক্রমে, সব বিষয়ে শান্তির বার্তা নিয়ে। এই শান্তির ধারা চলতে থাকে উষা বা ফজর পর্যন্ত। (সুরা কদর) 

তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না—ইফতার অবধি রোজাদার, ন্যায়পরায়ণ শাসক ও অত্যাচারিতের দোয়া।
সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৯৮

শবে কদর সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি কদরের রাতের সন্ধানে (রমজানের) প্রথম ১০ দিন ইতিকাফ করলাম। এরপর ইতিকাফ করলাম মধ্যবর্তী ১০ দিন। তারপর আমার প্রতি ওহি নাজিল করে জানানো হলো, তা শেষ ১০ দিনে রয়েছে। সুতরাং তোমাদের যে ইতিকাফ পছন্দ করবে, সে যেন ইতিকাফ করে। তারপর মানুষ (সাহাবিরা) তার সঙ্গে ইতেকাফে শরিক হয়।’ (সহিহ মুসলিম, আয়াত: ১১৬৭)

কাজী নজরুল ইসলাম ‘কেন জাগাইলি তোরা’ কবিতায় বলেছেন, 

‘মাহে রমজান’ এসেছে যখন, আসিবে ‘শবে কদর’,

নামিবে তাঁহার রহমত এই ধূলির ধরার পর।

এই উপবাসী আত্মা – এই যে উপবাসী জনগণ,

চিরকাল রোজা রাখিবে না – আসে শুভ ‘এফতার’ ক্ষণ!

মহান আল্লাহ আমাদের পবিত্র রমজানের বরকত ও রহমাত অর্জনের তাওফিক দিন। আমিন।