ইবাদতের জগতে ‘খুশু’ হলো এমন এক আধ্যাত্মিক শক্তি, যা একজন সাধারণ ইবাদতকারীকে আল্লাহর নৈকট্যভাজন বান্দাদের কাতারে নিয়ে যায়।
খুশু কেবল নামাজের কোনো অঙ্গভঙ্গি নয়, বরং এটি হৃদয়ের এক বিশেষ অবস্থা—যা আল্লাহর ভয়ে বিনয়াবনত হওয়া এবং তাঁর মহানুভবতার সামনে নিজেকে সঁপে দেওয়ার নাম।
খুশুই হলো ইবাদতের সেই রুহ বা আত্মা, যা ছাড়া আমলগুলো নিছক প্রাণহীন কাঠামোতে পরিণত হয়।
আরবি ‘খুশু’ শব্দের মূল অর্থ হলো বিনয়, স্থিরতা এবং মাথা নিচু করা। প্রখ্যাত ভাষাবিদ ইবনুল ফারিস বলেন, “খুশু বলতে অবনত হওয়া ও স্থির হওয়াকে বোঝায়।” (ইবনুল ফারিস, মুজামু মাকায়িসিল লুগাহ, ২/১৮১, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৭৯)
ইবনুল মানজুরের মতে, খুশু হলো দৃষ্টি নিচু রাখা এবং কণ্ঠস্বর ক্ষীণ করা। (লিসানুল আরব, ৮/৬৫, দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৯৪)
শরিয়তের পরিভাষায় খুশু হলো, “আল্লাহর সামনে হৃদয়কে বিনয় ও তুচ্ছতার সাথে দাঁড় করানো।”
ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহ.) অত্যন্ত চমৎকারভাবে বলেছেন, “প্রকৃতপক্ষে খুশু হলো আল্লাহর প্রতি মহব্বত, সম্মান, বিনয় এবং হৃদয়ের ভাঙন—এই চারটির সমন্বিত রূপ।” (মাদারিজুস সালিকিন, ১/৫২১, দারুল কুতুব আল-আরাবি, বৈরুত, ১৯৯৬)
হাফেজ ইবনে রজব (রহ.) বলেন, “খুশুর মূল উৎস হলো হৃদয়ের কোমলতা, স্থিরতা এবং আল্লাহর ভীতি। যখন হৃদয় বিনত হয়, তখন শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গও বিনত হয়ে যায়।” (আল-খুশু ফিস সালাহ, পৃষ্ঠা: ১৭, দারু ইবনিল কাইয়্যিম, দামেস্ক, ২০০৩)
খুশু অর্জন করা মুমিনের জন্য কেবল ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নয়, বরং এটি সফলতার মাপকাঠি।
১. সফলতার চাবিকাঠি: আল্লাহ তাআলা সফল মুমিনদের পরিচয় দিতে গিয়ে প্রথমেই খুশুর কথা বলেছেন, “নিশ্চয়ই মুমিনরা সফলকাম হয়েছে, যারা তাদের নামাজে বিনয়াবনত (খশিউন)।” (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১-২)
২. নামাজকে সহজ করার মাধ্যম: খুশুহীন ব্যক্তির কাছে নামাজ অনেক সময় বোঝা মনে হতে পারে। আল্লাহ বলেন, “তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। অবশ্যই তা কঠিন, কিন্তু বিনয়ীদের (খশিউন) জন্য নয়।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ৪৫)।
৩. রাসুলের সতর্কতা: যারা নামাজে এদিক-ওদিক তাকায় বা খুশু নষ্ট করে, তাদের সম্পর্কে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “লোকেরা যেন নামাজে আকাশের দিকে দৃষ্টিপাত করা থেকে বিরত থাকে, অন্যথায় তাদের দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেওয়া হবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৫৩)
খুশু হুট করে অর্জিত হয় না, এটি দীর্ঘ সাধনার বিষয়। নিবন্ধে খুশু অর্জনের কয়েকটি পথ বাতলে দেওয়া হয়েছে:
আল্লাহর পর্যবেক্ষণ অনুভব করা: আমি যখন ইবাদতে দাঁড়াই, তখন আল্লাহ আমাকে দেখছেন—এই অনুভূতি খুশুর মূল ভিত্তি। আলী ইবনুল হুসাইন (রহ.) যখন ওজু করতেন, তখন তাঁর চেহারা হলুদ হয়ে যেত। কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন, “তোমরা কি জানো, আমি কার সামনে দাঁড়াতে যাচ্ছি?” (ইমাম আহমদ, কিতাবুজ জুহদ, পৃষ্ঠা: ৩১৫, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, ১৯৯৯)
মৃত্যুর কথা স্মরণ করে নামাজ পড়া: প্রতিটি নামাজকে জীবনের শেষ নামাজ মনে করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যখন তুমি নামাজে দাঁড়াবে, তখন বিদায়ী ব্যক্তির মতো নামাজ পড়ো।” (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪১৭০)
কোরআন নিয়ে চিন্তা করা: আয়াতের অর্থ বুঝে তেলাওয়াত করলে হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টি হয়। আল্লাহ বলেন, “তারা কি কুরআন নিয়ে গভীর চিন্তা করে না?” (সুরা মুহাম্মদ, আয়াত: ২৪)
হৃদয়কে শৃঙ্খলামুক্ত করা: দুনিয়াবি ব্যস্ততা ও দুশ্চিন্তা থেকে হৃদয়কে খালি করে নামাজে দাঁড়ানো। হাসান বসরি (রহ.) বলতেন, “আল্লাহর শপথ! যখন তুমি নামাজে দাঁড়াবে, তখন তাঁর দিকেই পূর্ণ মনোযোগ দাও, অন্যথায় তিনি তোমার দিকে তাকাবেন না।” (মুহাম্মদ ইবনে নসর আল-মারওয়াযি, তাজিমু কাদরিস সালাহ, ১/১৬৪, মাকতাবাতুদ দার, মদিনা, ১৯৮৬)
আল্লাহর রাসুল (সা.) ছিলেন খুশুর মূর্ত প্রতীক। আবদুল্লাহ ইবনে শিখখির (রা.) বলেন, “আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে গেলাম যখন তিনি নামাজ পড়ছিলেন। তাঁর বুকের ভেতর থেকে কান্নার কারণে টগবগ করে ফোটা হাঁড়ির মতো শব্দ আসছিল।” (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৯০৪)
আবু বকর (রা.) ছিলেন অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের মানুষ। তিনি নামাজে দাঁড়ালে কান্নার কারণে তাঁর তেলাওয়াত শোনা কঠিন হয়ে যেত। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭১৩)
ওমর (রা.)-এর গালে কান্নার কারণে কালো দাগ পড়ে গিয়েছিল। এমনকি তিনি যখন মারাত্মক আহত অবস্থায় মৃত্যুশয্যায় ছিলেন, তখনও নামাজের কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “যে ব্যক্তি নামাজ ছেড়ে দেয়, ইসলামে তার কোনো অংশ নেই।” (ইবনুল কাইয়িম, কিতাবুস সালাহ, পৃষ্ঠা: ৪২, দারুল ফিকর, বৈরুত, ২০০৩)
খুশু কেবল একটি আধ্যাত্মিক আমল নয়, এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী:
১. শয়তানের মন্ত্রণা থেকে সুরক্ষা: যে হৃদয়ে খুশু থাকে, শয়তান সেখানে বাসা বাঁধতে পারে না।
২. মর্যাদা বৃদ্ধি: যে আল্লাহর সামনে মাথা নত করে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করেন।
৩. চরিত্র গঠন: খুশু মানুষকে বিনয়ী বানায়। ইবনুল কাইয়িম (রহ.)-এর মতে, উত্তম চরিত্রের মূল ভিত্তি হলো খুশু ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা।
৪. ইবাদতের তারতম্য: দুজন মানুষ একই কাতারে নামাজ পড়ছেন, কিন্তু খুশুর পার্থক্যের কারণে তাদের সওয়াবের ব্যবধান আসমান-জমিন হতে পারে। (সুনান নাসায়ি, হাদিস: ৬০৮)