জীবনে ইসলাম

‘শখের লাইফস্টাইল’: হারামের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে না তো

নগদহীন অর্থনীতির এই যুগে মানুষের মানিব্যাগে এখন টাকার চেয়ে প্লাস্টিকের একটি কার্ড বেশি জায়গা জুড়ে থাকে। ‘বাই নাও, পে লেটার’ বা বিনা সুদে ইএমআইয়ের সংস্কৃতিতে সামর্থ্য না থাকলেও সর্বশেষ মডেলের ফোন, দামি রেস্তোরাঁয় খাওয়া বা ধারদেনায় বিদেশ ভ্রমণ—এসবকে এখন একধরনের ‘প্রগতিশীল লাইফস্টাইল’ হিসেবে দেখানো হয়।

কিন্তু ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে ঋণে জীবন যাপন করা কোনো একক সমস্যা নয়; এটা একটার পর একটা স্তরে বাড়তে থাকা একটা ঝুঁকি, যার প্রতিটি স্তরের পরিণতি আগেরটার চেয়ে ভারী। তেমন চারটি স্তর আলোচনা হলো।

১: প্রতিদিনের মিথ্যা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ

ঋণের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ক্ষতি ঘটে চরিত্রে। মহানবী (সা.) নামাজে নিয়মিত দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে পাপ এবং ঋণের বোঝা থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।’

একজন সাহাবি জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কেন ঋণ থেকে এত বেশি আশ্রয় চান। জবাবে তিনি বলেন, ‘মানুষ যখন ঋণগ্রস্ত হয়, তখন সে কথা বলতে গিয়ে মিথ্যা বলে এবং ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩৯৭)

লক্ষণীয়, এখানে ঋণকে খারাপ বলা হয়নি, জরিমানা বা সুদের কারণে বলা হয়েছে। কেননা এটা মানুষের মুখ দিয়ে মিথ্যা আর ভাঙা প্রতিশ্রুতি বের করে আনে। কিস্তি পরিশোধের তারিখ এগিয়ে এলে অজুহাত বানানো, পরিবারের কাছে খরচ লুকানো—এই অভ্যাসগুলো প্রতিদিনের ছোট ছোট মিথ্যায় মানুষকে অভ্যস্ত করে তোলে।

এটাই প্রথম ও সবচেয়ে হালকা স্তর এবং এখান থেকেই শুরু।

২. সুদ—যেখানে ঝুঁকি আর ব্যক্তিগত নয়

আধুনিক ঋণভিত্তিক লেনদেনের একটি বড় অংশ দাঁড়িয়ে আছে সুদের ওপর। ‘বিনা সুদে ইএমআই’-এর লোভনীয় অফারেও একটা কিস্তি দিতে দেরি হলেই চড়া হারে চক্রবৃদ্ধি সুদ শুরু হয়ে যায়।

এখানে ঝুঁকিটা আর ব্যক্তিগত সীমায় থাকে না। কোরআনে সুদ নিয়ে যে হুঁশিয়ারি এসেছে, তা অন্য কোনো পাপের ক্ষেত্রে আসেনি।

আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা বকেয়া আছে তা বর্জন করো, যদি তোমরা মুমিন হও। আর যদি তোমরা তা না করো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা জেনে নাও।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৮-২৭৯)

কুফরের পর আর কোনো পাপে কোরআনে এত কঠোর ভাষা ব্যবহৃত হয়নি। সামাজিক মাধ্যমে একটু বাহবা পাওয়া বা বন্ধুদের সামনে দামি গ্যাজেট দেখানোর মতো তুচ্ছ কারণে একজন মুমিন নিজের অজান্তেই এই ঘোষণার আওতায় ঢুকে পড়ে।

৩. অপচয়ের হিসাব: যেখানে জবাবদিহি অনিবার্য

ঋণের মাধ্যমে কেনাকাটার একটা মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ আছে, নগদ টাকা হাতে থেকে যাওয়ার যে কষ্ট, সেটা অনুভূত হয় না। ফলে মানুষ প্রয়োজনের অতিরিক্ত জিনিস নির্দ্বিধায় কিনে ফেলে।

কোরআন জীবন যাপনের একটি স্পষ্ট মানদণ্ড দিয়েছে, ‘আর যারা ব্যয় করার সময় অপচয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না, বরং তাদের ব্যয় এর মধ্যবর্তী মাঝামাঝি অবস্থায় থাকে।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৬৭)

‘শখের লাইফস্টাইল’ যাপন করতে গিয়ে সেই মানদণ্ড আর ঠিক রাখা যায় না। অতিরিক্ত ব্যয়ের ফাঁদে পড়ে যায় মানুষ।

আর এই ব্যয়ের প্রতিটি টাকার হিসাব একদিন দিতে হবে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন কোনো বান্দার পদক্ষেপ বিন্দুমাত্র নড়বে না, যতক্ষণ না তাকে জিজ্ঞেস করা হবে, সে তার ধনসম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে এবং কোন খাতে তা ব্যয় করেছে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪১৬)

শখের গ্যাজেট বা বিলাসী ভ্রমণের ঋণ পরিশোধের এই হিসাব আল্লাহর আদালতে দেওয়া সহজ হবে না।

৪. মৃত্যুর পরও ঝুলে থাকা আত্মা

সবচেয়ে ভারী স্তরটা আসে সবার শেষে, যখন আর সংশোধনের সুযোগ থাকে না। ‘এখন এনজয় করি, পরে দেখা যাবে’—এই মানসিকতার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, মৃত্যু কারও অপেক্ষায় থাকে না।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের আত্মা তার ঋণের সঙ্গে ঝুলন্ত থাকে, যতক্ষণ না তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধ করা হয়।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৪১৩)

এই ঋণের ভার এতটাই গুরুতর যে এটা এমনকি শহীদ হওয়ার মর্যাদাকেও পুরোপুরি ছাড় দেয় না। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হওয়া ব্যক্তির সব পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হয়, শুধু ঋণ নয়।’ (সহিহ মুসলিম: ১৮৮৬)

একজন মানুষ যদি সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করে শহীদ হয়েও ঋণের দায় থেকে মুক্তি না পান, তাহলে নিছক লাইফস্টাইল আপগ্রেডের জন্য নেওয়া ঋণ কতটা হালকাভাবে দেখা উচিত, তা ভাবার বিষয়।

চারটা স্তর একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, কার্ড থেকে ঋণ নিয়ে শখ পূরণ করা শুধু একটি সিদ্ধান্ত নয়, এটা একের পর এক ঝুঁকির দরজা খুলে দেয়।

প্রথমে চরিত্রে মিথ্যার প্রবেশ করায়, তারপর আল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধের ঘোষণার আওতায় ঢুকায়, এরপর কেয়ামতের কঠিন জবাবদিহির আওতায় আনে এবং সবশেষে মৃত্যুর পরও আত্মার মুক্তি আটকে থাকে। প্রতিটি স্তর আগেরটার চেয়ে বেশি কঠিন।

তাই ঋণ করে খরচ করে শখ পূরণ সাময়িক সুখ দিতে পারে, কিন্তু আখেরে ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন করতে পারে। সমাধান হলো, নিজের সামর্থ্যের ভেতর সন্তুষ্ট থাকাট এবং ঋণকে লাইফস্টাইলের হাতিয়ার নয়, বরং সত্যিকারের অসহায়ত্বের আপৎকালীন উপায় হিসেবে দেখা।