ইসলামি ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে ২২ রমজান দিনটি একদিকে যেমন ইসলামের প্রথম বড় যুদ্ধের (বদর) সফল সমাপ্তি ও নবপ্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ঘোষণার দিন, অন্যদিকে এটি ইতিহাসের বিভিন্ন যুগে মহান ব্যক্তিত্বদের জন্ম ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের সাক্ষী।
মদিনার মিম্বর থেকে কর্ডোভার রাজপ্রাসাদ, আর কায়রোর কারাকক্ষ থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার বিতর্কের মঞ্চ—২২ রমজানের ইতিহাস সর্বত্র বিস্তৃত।
২ হিজরির ২২ রমজান (৬২৪ খ্রিষ্টাব্দ) ছিল ইসলামের ‘দুর্বলতার যুগ’ শেষ হয়ে ‘সার্বভৌমত্বের যুগে’ প্রবেশের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধে বিজয়ের পর এই দিনে আল্লাহর রাসুল (সা.) সদলবলে মদিনায় প্রবেশ করেন। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ২/৬০৬, ১৯৫৫)
এই প্রত্যাবর্তন মদিনার অভ্যন্তরীণ মোনাফেক ও ইহুদিদের লালিত ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’ বা প্রোপাগান্ডাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। যুদ্ধের গনিমত (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) এবং বন্দিদের নিয়ে আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর মদিনায় প্রবেশ আরবের রাজনৈতিক মানচিত্রে মদিনাকে একটি অপরাজেয় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
পবিত্র কোরআনে এই বিজয় সম্পর্কে বলা হয়েছে, “অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের বদরে সাহায্য করেছেন যখন তোমরা ছিলে হীনবল।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১২৩)
২৭৭ হিজরির ২২ রমজান (৮৯১ খ্রিষ্টাব্দ) কর্ডোভায় জন্মগ্রহণ করেন মুসলিম স্পেনের শাসক আব্দুর রহমান আন-নাসির। (ইমাম জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১৫/৩৩০, ১৯৮৫)
তিনি এমন এক সময়ে ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন যখন আন্দালুস গৃহযুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতাবাদে জর্জরিত ছিল।
তিনি তাঁর বিচক্ষণ সামরিক ও প্রশাসনিক মেধা দিয়ে দেশকে ঐক্যবদ্ধ করেন এবং ৩১৬ হিজরিতে ‘উমাইয়া খেলাফত’ পুনরায় ঘোষণা করেন।
তাঁর ৫০ বছরের শাসনামলে কর্ডোভা হয়ে ওঠে বিশ্বের জ্ঞান ও কূটনীতির প্রাণকেন্দ্র। তাঁর নির্মিত ‘মদিনাতুজ জাহরা’ প্রাসাদটি তৎকালীন বিশ্বের বিস্ময় হিসেবে পরিচিত ছিল। (ইবনে আসির, আল-কামিল ফিত তারিখ, ৭/১৬০, ১৯৮৭)
৭০৫ হিজরির ২২ রমজান (১৩০৬ খ্রিষ্টাব্দ) শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া দামেস্ক থেকে মিসরের কায়রোতে পৌঁছান। এটি ছিল মামলুক যুগের উত্তাল সময়। সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁকে কায়রোর কেল্লায় এক বিশেষ আদালতে বিচারের সম্মুখীন হতে হয়। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৪/৩৭, ১৯৮৮)
এই বিচার কেবল ধর্মীয় বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও ফতোয়ার স্বাধীনতার মধ্যকার এক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
যদিও তাঁকে কেল্লার কারাগারে বন্দি করা হয়, কিন্তু তিনি সেই কারাকক্ষকেই এক বিশাল জ্ঞানকেন্দ্রে পরিণত করেন। কারাগারে থাকাকালীন তাঁর রচিত বিপুল জ্ঞানভাণ্ডার আজও মুসলিম বিশ্বের চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করে চলেছে।
আধুনিক ইতিহাসের ১৩৩৬ হিজরির ২২ রমজান (১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দ) দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্মগ্রহণ করেন বিশ্বখ্যাত ইসলাম প্রচারক আহমদ দিদাত। তিনি ইসলামি দাওয়াতের চিরচেনা পদ্ধতি বদলে ‘যৌক্তিক বিতর্কে’র নতুন ধারা প্রবর্তন করেন।
বাইবেল ও অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের ওপর তাঁর গভীর পাণ্ডিত্য এবং অকাট্য যুক্তি তাঁকে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত করে।
তাঁকে বলা হতো ‘দ্য ম্যান হু স্পিকস’, যার প্রতিটি বাক্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের হাজার হাজার মানুষকে সত্যের পথে অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, আধুনিক যুগেও শক্তিশালী যুক্তিই হলো মতাদর্শিক লড়াইয়ের সব থেকে কার্যকর অস্ত্র।