পাথেয়

তওবা কবুলের মৌলিক ৫ শর্ত

‘তওবা’ একটি আরবি শব্দ, যার অভিধানিক অর্থ প্রত্যাবর্তন করা বা ফিরে আসা। ইসলামের পরিভাষায় তওবা মানে হলো মহান আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজ চিরতরে ছেড়ে দিয়ে তাঁর নির্দেশিত পথ ও ধর্মের দিকে ফিরে আসা।

অনেক সময় মানুষ তওবা করার পরও শয়তানের প্ররোচনায় কিংবা প্রবৃত্তি তাড়িত হয়ে আবার পাপে লিপ্ত হয়ে পড়ে। বারবার তওবা ভেঙে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ার কারণে অনেকে লজ্জা ও হতাশায় তওবা করাই ছেড়ে দেয়।

তাবেয়ি হাসান বসরিকে (রহ.) একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘বান্দা পাপ করে আবার তওবা করে, এরপর আবার পাপ করে আবার তওবা করে—এতে কি তার লজ্জিত হওয়া উচিত নয়?’ তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘শয়তান তো এটাই চায়! তোমরা কখনোই তওবা করা ছাড়বে না।’ (ইবনে রজব আল-হানবালি, জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম, ১/৪১৫, দারুল হাদিস, কায়রো, ২০০১)

একইভাবে অনেক সময় খাঁটি মনে তওবা করার পর মানুষের জীবনে সাময়িক কষ্ট, পরীক্ষা কিংবা রিজিকের অভাব দেখা দিতে পারে।

একজন মুমিন তার পাপকে এত বড় মনে করে যেন সে একটি পাহাড়ের নিচে বসে আছে এবং ভয় পাচ্ছে যে পাহাড়টি যেকোনো মুহূর্তে তার ওপর ভেঙে পড়বে; অন্যদিকে একজন দুরাচারী লোক তার পাপকে মাছির মতো মনে করে, যা তার নাকের ওপর দিয়ে উড়ে যায়।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩০৮

ইবনুল কাইয়িম আল-জাওজিয়্যাহ উল্লেখ করেছেন, তওবার পর সংকট আসা মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে ইমানের এক বিশেষ পরীক্ষা; আল্লাহ দেখতে চান বান্দা বিপদেও তাঁর ওপর অবিচল থাকে নাকি আবার পাপাচারের দিকে ফিরে যায়। (ইবনুল কাইয়িম, আল-ফাওয়াইদ, পৃষ্ঠা ৯৫, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৭৩)

শতবার প্রতিশ্রুতি ভাঙলেও পরম আল্লাহর দরবারে ফিরে আসার পথ সবসময় খোলা থাকে। বান্দার অনুশোচনায় আল্লাহ এতটাই আনন্দিত হন, যা মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়া উট ও রশদ খুঁজে পাওয়ার পর মালিকের আনন্দের চেয়েও অনেক বেশি। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩০৮)

শুধু মুখে স্বীকার নয়

তওবা শুধু মুখের কিছু প্রথাগত শব্দ উচ্চারণ নয়। শুধু ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বা ‘হে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করো’ বলাটাই তওবার মূল কথা নয়, যদি না এর পেছনে অন্তরের গভীর অনুশোচনা থাকে।

পবিত্র কোরআনে ধোঁকাবাজিমুক্ত ও খাঁটি তওবার নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, হে ইমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো—খাঁটি তওবা। (সুরা তাহরিম, আয়াত: ৮)

একজন মুমিন ও একজন দুরাচারী মানুষের মধ্যে পাপকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে মৌলিক পার্থক্য থাকে।

মহানবী (সা.) বলেছেন, একজন মুমিন তার পাপকে এত বড় মনে করে যেন সে একটি পাহাড়ের নিচে বসে আছে এবং ভয় পাচ্ছে যে পাহাড়টি যেকোনো মুহূর্তে তার ওপর ভেঙে পড়বে; অন্যদিকে একজন দুরাচারী লোক তার পাপকে মাছির মতো মনে করে, যা তার নাকের ওপর দিয়ে উড়ে যায়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩০৮)

তওবা কবুলের আবশ্যকীয় ৫ শর্ত

ইসলামের বিধান অনুযায়ী, একজন মানুষের তওবা আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট পাঁচটি শর্ত পূরণ করা আবশ্যক:

১. একনিষ্ঠ তওবা: তওবা হতে হবে শুধুই পরম আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে। কোনো সামাজিক লোকলজ্জা, দুনিয়াবি ক্ষতি এড়ানো কিংবা মানুষের কাছে ধার্মিক হিসেবে প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে তওবা করলে তা কবুল হবে না।

কোরআনে বলা হয়েছে, আর তাদের শুধু এই নির্দেশই দেওয়া হয়েছিল যে তারা যেন একনিষ্ঠ হয়ে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করে। (সুরা বাইয়িনা, আয়াত: ৫)

যদি পাপটি মানুষের অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, যেমন কারও ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করা বা কাউকে গিবত বা অপবাদ দেওয়া ইত্যাদি, তবে মালিকের সম্পদ ফিরিয়ে দিতে হবে কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চেয়ে নিষ্কৃতি পেতে হবে।

২. কৃতকর্মের জন্য অনুতাপ: অতীতের করা অন্যায় ও পাপের জন্য অন্তরে গভীর লজ্জা ও অনুশোচনা থাকতে হবে। আল্লাহর অবাধ্যতা করা এবং তাঁর আদেশ অমান্য করার কারণে নিজের ভেতর যে আত্মগ্লানির জন্ম হয়, সেটাই হলো তওবার মূল আত্মিক রূপ।

৩. পাপ কাজ বর্জন: যে পাপে মানুষ লিপ্ত ছিল, তা তৎক্ষণাৎ ছেড়ে দিতে হবে। যদি পাপটি কোনো ফরজ ইবাদত (যেমন নামাজ বা জাকাত) ছেড়ে দেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তবে তা কাজা বা আদায় করার উদ্যোগ নিতে হবে।

আর যদি পাপটি মানুষের অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, যেমন কারও ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করা বা কাউকে গিবত বা অপবাদ দেওয়া ইত্যাদি, তবে মালিকের সম্পদ ফিরিয়ে দিতে হবে কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চেয়ে নিষ্কৃতি পেতে হবে।

৪. ভবিষ্যতে পাপ না করার দৃঢ় সংকল্প: মনে মনে আবার পাপে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা রেখে মুখে তওবা করা এক ধরনের উপহাস। তওবা কবুল হওয়ার জন্য অন্তরে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা থাকতে হবে যে সুযোগ পেলেও ভবিষ্যতে আর এই পাপে লিপ্ত হওয়া যাবে না।

তবে দৃঢ় সংকল্প থাকা সত্ত্বেও মানবিক দুর্বলতার কারণে পরবর্তীকালে আবার ভুল হয়ে গেলে আগের তওবা বাতিল হবে না; কিন্তু নতুন ভুলের জন্য নতুন করে আবার তওবা করতে হবে।

৫. সময় পার হওয়ার আগেই তওবা করা

তওবার দরজা সবসময় খোলা থাকলেও দুটি বিশেষ সময় পার হয়ে গেলে তওবা আর কবুল হয় না:

১. মৃত্যুর গলার কাছে প্রাণ আসার পূর্বে। মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে নিশ্চিত বিনাশ দেখে তওবা করলে তা কবুল হয় না। কোরআনে বলা হয়েছে, আর তাদের জন্য তওবা নেই, যারা আজীবন মন্দ কাজ করে যায়, অবশেষে যখন তাদের কারও কাছে মৃত্যু এসে উপস্থিত হয়, তখন সে বলে: আমি এখন তওবা করছি। (সুরা নিসা, আয়াত: ১৮)

প্রাচীন মিসরের ফেরাউন সমুদ্রে ডুবে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে ইমান আনার ঘোষণা দিয়েছিল, কিন্তু আল্লাহ তার শেষ মুহূর্তের অনুশোচনা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। (সুরা ইউনুস, আয়াত: ৯০-৯১)

২. পশ্চিম দিকে সূর্য উদয় হওয়ার পূর্বে। কেয়ামতের অন্যতম প্রধান আলামত হিসেবে পশ্চিম আকাশে সূর্য ওঠার পর সমগ্র মানবজাতি ইমান আনলেও সেদিনকার তওবা আর গ্রহণযোগ্য হবে না। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৬৩৬)

সততা, আত্মশুদ্ধি এবং শর্ত সাপেক্ষে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার মাধ্যমেই মানুষ অর্জন করতে পারে পরম প্রতিপালকের ভালোবাসা ও ক্ষমার অফুরন্ত সুসংবাদ।

তওবা মুমিনের সারাজীবনের অভ্যাস

তওবা কোনো সাময়িক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি একজন মুমিনের সারাজীবনের নিত্যদিনের অভ্যাস।

নবীজিও প্রতিদিন আল্লাহর কাছে তওবা ও ইস্তিগফার করতেন। তিনি বলেছেন, হে মানবজাতি, তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো, নিশ্চয়ই আমি দিনে ১০০ বার আল্লাহর কাছে তওবা করি। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭০২)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি দিনে ৭০ বারেরও বেশি ক্ষমাপ্রার্থনা করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩০৭)

পাপ যত বড় বা যত বেশিই হোক না কেন, আল্লাহর রহমতের মহাসমুদ্রের সামনে তা অত্যন্ত তুচ্ছ। সততা, আত্মশুদ্ধি এবং শর্ত সাপেক্ষে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার মাধ্যমেই মানুষ অর্জন করতে পারে পরম প্রতিপালকের ভালোবাসা ও ক্ষমার অফুরন্ত সুসংবাদ।