পবিত্র রমজানের অধিকাংশ দিনগুলো কীভাবে যে পেরিয়ে গেল, তা যেন টেরই পেলাম না। আসলে বরাবরই এমন হয়, রমজান যেন চোখের পলকে শেষ হয়ে যায়। রমজান মানে তো শান্তির এক পশলা বৃষ্টি।
তবে আমাদের কাছে অতি দ্রুতগতিতে চলা এই রমজান এখনো আমাদের জন্য বিশাল এক উপহার নিয়ে অপেক্ষা করছে। আর সেটি হলো, প্রিয় বান্দাদের জন্য মহামহিম রবের এক বিশেষ নিয়ামত, ‘লাইলাতুল কদর’।
এই উপহারটি পেতে হলে আমাদেরকে কোমর বেঁধে নামতে হবে, অর্থাৎ মানসিকভাবে পূর্ণ প্রস্তুতি নিতে হবে। রমজানের ইবাদতকে ধীরে ধীরে বৃদ্ধি করতে হবে।
কিন্তু আমাদের অনেকের ক্ষেত্রেই উল্টোটা ঘটে। আমরা প্রথম দিকে পুরো উদ্যমে দৌড় শুরু করি, তারপর আস্তে আস্তে গতি কমে আসে। শক্তি ও উদ্যমের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর লাভের জন্য।
লাইলাতুল কদর এমন একটি রাত, যার মর্যাদা হাজার মাসের চেয়েও বেশি। অর্থাৎ এক রাতের ইবাদত তিরাশি বছর চার মাসের বেশি সময়ের ইবাদতের সমান।
‘লাইলাতুল কদর’ অর্থ অত্যন্ত সম্মানিত ও মহিমান্বিত একটি রাত। ‘কদর’ শব্দের আরও অর্থ রয়েছে: ভাগ্য, পরিমাণ এবং তাকদির নির্ধারণ করা।
এটি এমন একটি মহিমান্বিত রাত, যে রাতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা পবিত্র কোরআন নাজিল করেছেন। আল্লাহ–তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই আমি এটি নাজিল করেছি এক বরকতময় রাতে।” (সুরা দুখান, আয়াত: ৩)
এবং তিনি আরও বলেন, “সে রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ধারিত হয়।” (সুরা দুখান, আয়াত: ৪)
ওপরোক্ত আয়াত দুটি থেকে বোঝা যায়, কত বড় মর্যাদা ও মাহাত্ম্য লুকিয়ে আছে এই একটি রাতের মধ্যে। মানুষের পূর্ণ জীবনবিধান কোরআন নাজিল হয়েছিল এ রাতে এবং এ রাতেই বান্দার জন্য আগামী এক বছরের বিভিন্ন বিষয় নির্ধারিত হয়।
মানুষের জন্মের আগেই তার তকদির লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। আর লাইলাতুল কদরের রাতে আগামী এক বছরের জন্য রিজিক, জীবন-মৃত্যু ইত্যাদি বিষয় নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতাদের কাছে অর্পণ করা হয়।
এই রাতের মর্যাদা ও গুরুত্ব বোঝানোর জন্য আল্লাহ–তাআলা একটি পূর্ণ সুরা নাজিল করেছেন— সুরা কদর।
আল্লাহ–তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই আমি কোরআন নাজিল করেছি লাইলাতুল কদরে। আর আপনাকে কিসে জানাবে লাইলাতুল কদর কী? লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রূহ (জিবরাঈল আ.) নাজিল হন তাদের রবের অনুমতিতে সকল নির্দেশ নিয়ে। শান্তিময় সে রাত, ফজরের উদয় পর্যন্ত।”
রমজানের শেষ দশ দিন। এই সময়টাই যেন পুরো মাসের সারাংশ। আর এই সময়ের মধ্যেই লুকিয়ে আছে লাইলাতুল কদর। এটি রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান কর।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০১৭)
কিছু বর্ণনায় ২৭তম রাত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলা হয়েছে। তবে আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী এই রাত প্রতি বছর একই তারিখে নাও হতে পারে। এটি ২১, ২৩, ২৫, ২৭ বা ২৯ তারিখেও হতে পারে।
তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান কর।সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০১৭
হাদিসের আলোকে সম্ভাব্য রাতসমূহ:
২৭তম রাত: উবাই ইবনে কাব (রা.) বলেন, নবীজি লাইলাতুল কদরের জন্য রমজানের ২৭তম রাত নির্দেশ করেছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৬২)
সাধারণ নির্দেশনা: রাসুল (সা.) বলেছেন, "আমাকে লাইলাতুল কদর দেখানো হয়েছিল। কিন্তু পরে তা আমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। অতএব তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে তা অনুসন্ধান কর।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০২৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৭)
এই রাতটি সুনির্দিষ্ট না করার পেছনে উম্মতের জন্য বিশেষ কল্যাণ নিহিত আছে। যদি নির্দিষ্ট একটি রাত নির্ধারিত থাকত, তাহলে অনেক মানুষ হয়তো কেবল সেই রাতটিতেই ইবাদত করত।
কিন্তু এখন শেষ দশকের একাধিক রাতে মানুষ ইবাদতে মনোযোগী হয়। ফলে তাদের আমলনামায় আরও বেশি সওয়াব যুক্ত হয়। এভাবেই আল্লাহ–তাআলা তাঁর বান্দাদের জন্য কল্যাণের দরজা আরও প্রশস্ত করে দিয়েছেন।
লাইলাতুল কদর এমন একটি মহিমান্বিত রাত, যার মর্যাদা হাজার মাসের চেয়েও বেশি। অর্থাৎ এ রাতের ইবাদতের মর্যাদা তিরাশি বছর চার মাসের চেয়েও বেশি সময়ের ইবাদতের সমান। আল্লাহ–তাআলা বলেন, “লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।” (সুরা কদর, আয়াত: ৩)
মানুষের গড় আয়ু যেখানে ষাট বা সত্তর বছর, সেখানে আল্লাহ–তাআলা এমন একটি রাত দিয়েছেন, যার এক রাতের ইবাদতই তিরাশি বছরেরও বেশি সময়ের ইবাদতের সমান সওয়াব এনে দিতে পারে।
আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি ইমান ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে নামাজে দাঁড়াবে, তার পূর্বের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯০১; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৬০)
এই রাতের ইবাদতের মর্যাদা এত বেশি যে সম্মানিত ফেরেশতাগণও এ রাতে আল্লাহর অনুমতিতে পৃথিবীতে অবতরণ করেন। হাদিসে এসেছে, “লাইলাতুল কদরের রাতে ফেরেশতারা এত সংখ্যায় অবতরণ করে যে তাদের সংখ্যা পাথরকুচির চেয়েও বেশি।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১০৭৩৫)
যে ব্যক্তি ইমান ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে নামাজে দাঁড়াবে, তার পূর্বের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯০১
হাদিসে এবং সাহাবিদের বর্ণনা অনুসরণ করলে এই রাতের কিছু বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। যেমন:
রাতটি নাতিশীতোষ্ণ হবে (অতিরিক্ত গরম বা শীত থাকবে না)।
গভীর অন্ধকারে ছেয়ে যাবে না।
মৃদুমন্দ বাতাস প্রবাহিত হবে।
ইবাদত করার সময় মানুষ বেশি প্রশান্তি অনুভব করবে।
রাত শেষে সূর্যোদয় হবে পূর্ণিমার চাঁদের মতো নরম আলোসহ (যাতে কিরণ থাকবে না)। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০২১; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৬২)
অনেকেই বৃষ্টার কথা বলেন, তবে বৃষ্টি হওয়া বা না হওয়া লাইলাতুল কদরের সুনির্দিষ্ট আলামত নয়।
এই রাতে নফল নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত এবং বেশি বেশি ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত। আল্লাহর রাসুল (সা.) লাইলাতুল কদরের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউয়ুন, তুহিব্বুল আফওয়া, ফা’ফু আন্নী।
অর্থ: “হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা পছন্দ করেন, তাই আমাকে ক্ষমা করুন।" (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫১৩; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৫৩৮৫)
আমাদের প্রত্যেকের চেষ্টা করা উচিত, যেন কোনোভাবেই এই রাতটি মিস না হয়ে যায়। যার যতটুকু সামর্থ্য আছে, সে অনুযায়ী ইবাদত বৃদ্ধি করার চেষ্টা করতে হবে। কারণ আমরা কেউই জানি না— আগামী বছর আমরা বেঁচে থাকব কি না, বা আবার এই মহিমান্বিত রাত পাওয়ার সৌভাগ্য হবে কি না।
writerismat@gmail.com
ইসমত আরা: শিক্ষক ও লেখক