মুসা আল হাফিজের নিবন্ধ

জ্ঞান ও আমলের সম্পর্ক: ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্রের কর্মতত্ত্ব

ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার দৃষ্টিতে জ্ঞান কখনোই নিজেকে দিয়েই কামিল হয় না। জ্ঞানের স্বাভাবিক নতিজা কর্ম আর কর্মের অন্তর্নিহিত বনিয়াদ জ্ঞান।

উভয়কে বিচ্ছিন্ন করা মানে মানুষের অস্তিত্বকেই খণ্ডিত করা। কারণ, মানুষ এমন কোনো সত্তা নয়, যে শুধু জানার জন্য জানে; আবার এমনও নয় যে না জেনেই যথার্থভাবে কাজ করতে পারে। তার জ্ঞান কর্মের মধ্যে পূর্ণতা লাভ করে, আর কর্ম জ্ঞানের মধ্যে হেদায়েত হাসিল করে। এই পারস্পরিক সম্পর্কই ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্রের কর্মতত্ত্বের ভিত্তি।

আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বের একটি বড় প্রবণতা হলো জ্ঞানকে নিরপেক্ষ বলে কল্পনা করা। যেন জ্ঞানের সঙ্গে মানুষের আখলাকি জিম্মাদারির কোনো রিশতা নেই।

একটি তত্ত্ব সত্য কি না, সেটিই যেন একমাত্র সওয়াল। সেই তত্ত্ব মানুষকে কোথায় নিয়ে যায়, সমাজে কী ধরনের সম্পর্ক সৃষ্টি করে, প্রকৃতির প্রতি কী আচরণ পয়দা করে—এসব যেন জ্ঞানতাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়।

ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্র এই বিচ্ছিন্নতাকে এনকার করে। কারণ, কোনো জ্ঞান যদি মানুষের জীবনে, চরিত্রে এবং সভ্যতায় কোনো ইতিবাচক রূপান্তর কায়েম না করে, তবে সেই জ্ঞান এখনো তার পূর্ণ উদ্দেশ্যে পৌঁছেনি।

এই দর্শনে ইলম একটি আমানত। আমানতের বৈশিষ্ট্য হলো তাকে ধারণ করলেই দায়িত্ব জন্ম নেয়। অতএব, মানুষ যখন কোনো সত্য জানতে পারে, তখন সে শুধু নতুন একটি তথ্য অর্জন করে না, বরং একটি নতুন দায়িত্বও গ্রহণ করে।

যে কৃষক জানেন মাটি কীভাবে উর্বর থাকে, তাঁর ওপর সেই জ্ঞান অনুযায়ী মাটির হেফাজতের জিম্মাদারি বর্তায়। যে শাসক ন্যায়ের নীতি জানেন, তাঁর ওপর ইনসাফ কায়েমের দায়িত্ব বর্তায়।

যে আলেম সত্য জানেন, তাঁর ওপর সেই সত্যের সাক্ষ্য বহনের জিম্মা বর্তায়। ফলে জ্ঞান কখনো খালি অধিকার নয়, জ্ঞান সর্বদা দায়িত্বের সূচনা।

আমল আবার জ্ঞানকে পরিশুদ্ধও করে। মানুষ যখন সত্য অনুযায়ী জীবনযাপন শুরু করে, তখন এমন অনেক বাস্তবতা তার সামনে উন্মোচিত হয়, যা শুধু তাত্ত্বিক চিন্তায় ধরা পড়ে না।

ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্র জ্ঞানকে স্থবির অবস্থা হিসেবে ভাবে না। বরং দেখে একটি চলমান রূপান্তর হিসেবে। সত্য পয়লা দাখিল হয় মানুষের বোধে, তারপর তার বিবেকে, এরপর তার ফয়সালায় এবং সর্বশেষে তার আচরণে। এই ধারাবাহিকতার কোনো একটি স্তর ভেঙে গেলে জ্ঞানের পূর্ণতা নস্যাৎ হয়।

যে জ্ঞান ফয়সালাকে পরিবর্তন করে না, তা এখনো হৃদয়ে প্রবেশ করেনি, আর যে সিদ্ধান্ত আচরণে প্রতিফলিত হয় না, তা এখনো আখলাকে রূপান্তরিত হয়নি। অতএব, আমল জ্ঞানের বহিরাবরণ নয়, তার অস্তিত্বগত নতিজা।

এখানেই ‘জানা’ ও ‘উপলব্ধি করা’র মধ্যে ফারাক স্থাপন করে ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্র। অনেক বিষয় মানুষ জানে, কিন্তু উপলব্ধি করে না। সে জানে অপচয় অন্যায়, কিন্তু তার জীবন অপচয়ে পরিপূর্ণ, সে জানে জুলুম অন্যায়, কিন্তু সুবিধা পেলেই অন্যায়ের অংশ হয়ে যায়; সে জানে প্রকৃতি আমানত, কিন্তু এস্তেমাল করে মালিকের মতো।

এই অবস্থায় জ্ঞান স্মৃতিতে হাজির থাকে, কিন্তু অস্তিত্বে থাকে গরহাজির। প্রকৃত ইলম তখনই জন্ম নেয়, যখন জানাটুকু মানুষের জীবনযাপনের রীতিতে পরিণত হয়।

আমল আবার জ্ঞানকে পরিশুদ্ধও করে। মানুষ যখন সত্য অনুযায়ী জীবনযাপন শুরু করে, তখন এমন অনেক বাস্তবতা তার সামনে উন্মোচিত হয়, যা শুধু তাত্ত্বিক চিন্তায় ধরা পড়ে না।

ন্যায়বিচার নিয়ে শত গ্রন্থ পাঠ করা যায়, কিন্তু ন্যায় প্রতিষ্ঠার বাস্তব সংগ্রাম মানুষকে ন্যায়ের নতুন মাত্রা শিক্ষা দেয়। পরিবেশনীতি নিয়ে গবেষণা করা যায়, কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে দীর্ঘ সহাবস্থান মানুষকে তার সূক্ষ্ম ভারসাম্য অনুভব করতে শেখায়। অর্থাৎ আমল শুধু জ্ঞানের ফল নয়, জ্ঞানের নতুন উৎসও।

একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা, একটি বন সংরক্ষণ করা, একটি ন্যায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা কিংবা একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার সংস্কারও ইলমের বাস্তবায়ন।

এই কারণে ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্রে জ্ঞান ও কর্ম একটি চক্রাকার সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ। জ্ঞান কর্ম সৃষ্টি করে, কর্ম আবার জ্ঞানকে গভীরতর করে।

এই দর্শনে সভ্যতার সংকটও মূলত জ্ঞান ও আমলের বিচ্ছেদ। মানুষ আজ পরিবেশের বিপর্যয় সম্পর্কে জানে, কিন্তু তার অর্থনীতি সেই জ্ঞানের বিপরীতে পরিচালিত হয়। মানবাধিকারের বয়ান জানে, কিন্তু রাজনীতি তার বিপরীত পথে চলে। নৈতিকতার পাঠ দেয়, কিন্তু বাজার তার উল্টো সংস্কৃতি নির্মাণ করে। ফলে সমস্যা তথ্যের নয়, জ্ঞানের সামাজিক অবতারণার।

ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্র মনে করে, কোনো সভ্যতা তখনই প্রাজ্ঞ হয়, যখন তার জ্ঞান তার প্রতিষ্ঠান, আইন, অর্থনীতি, শিক্ষা এবং সংস্কৃতির মধ্যে জীবন্ত রূপ ধারণ করে।

এ জন্য আমল শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত বা নৈতিক আচরণের নাম নয়, সমাজ নির্মাণও আমলের অন্তর্ভুক্ত।

একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা, একটি বন সংরক্ষণ করা, একটি ন্যায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা কিংবা একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার সংস্কারও ইলমের বাস্তবায়ন। কারণ, সত্যের পূর্ণতা মানুষের অন্তরে রূপায়িত হতে চায়, একই সঙ্গে মানুষের সম্মিলিত জীবনেও প্রতিফলিত হতে চায়।

অতএব, ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্রে ইলম ও আমল পৃথক নয়। তারা একই জীবন্ত সত্যের দুটি অবস্থা। ইলম দিকনির্দেশনা দেয়, আমল তাকে বাস্তবে রূপ দেয়, ইলম উদ্দেশ্য উন্মোচন করে, আমল সেই উদ্দেশ্যকে ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত করে।

ফলে জ্ঞানের সর্বোচ্চ সাফল্য এমন মানুষ ও সমাজ নির্মাণ, যেখানে সত্য চিন্তার বিষয় হওয়ার পাশাপাশি জীবনে, প্রতিফলিত হাকিকতে রূপায়িত হয়।

  • মুসা আল হাফিজ: লেখক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। ইসলামিক হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের চেয়ারম্যান