ক্ষমা মানুষের সর্বোচ্চ নৈতিক গুণ, যা অন্তরের সংকীর্ণতা ও প্রতিশোধপরায়ণতা দূর করে প্রশান্তি আনে। প্রতিশোধ নেওয়া মানবীয় স্বভাব হলেও তা জয় করে ক্ষমা করাই প্রকৃত মহত্ত্ব।
রাসুল (সা.) শত্রুকেও নিঃশর্তভাবে ক্ষমা করা ও তার জন্য কল্যাণ কামনা করার যে অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তার তুলনা নেই। ক্ষমা শুধু তাঁর জীবনের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্যই ছিল না, বরং কোরআনের নির্দেশনা অনুসরণে তাঁর সমগ্র জীবনদর্শনের মূল ভিত্তি ছিল।
আল্লাহ–তাআলা মহানবী (সা.)-কে ক্ষমার নীতি অবলম্বন করার নির্দেশ দিয়ে পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেন, ‘আপনি ক্ষমার নীতি অবলম্বন করুন, সৎকাজের আদেশ করুন এবং অজ্ঞদের এড়িয়ে চলুন।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৯৯)
অন্যত্র নবীজির কোমল হৃদয় ও মার্জিত আচরণের প্রশংসা করে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছিলেন; যদি আপনি কঠোর ও পাষাণ হৃদয় হতেন, তবে তারা আপনার নিকট থেকে সরে যেত। অতএব আপনি তাদের মার্জনা করুন এবং তাদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করুন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)
আপনি ক্ষমার নীতি অবলম্বন করুন, সৎকাজের আদেশ করুন এবং অজ্ঞদের এড়িয়ে চলুন।সুরা আরাফ, আয়াত: ১৯৯
এই আসমানি নির্দেশের পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেছিল নবীজির জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে। উম্মুল মুমিনীন আয়েশাকে যখন রাসুলের চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি বলেছিলেন, ‘পবিত্র কোরআনই ছিল তাঁর চরিত্র।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২৫৮১৩)
নবুয়তের দশম বর্ষে মক্কায় কোরাইশদের নির্যাতন যখন চরম আকার ধারণ করে, তখন মহানবী (সা.) ইসলামের দাওয়াত নিয়ে তায়েফে গমন করেন। কিন্তু তায়েফের সরদাররা তাঁর বার্তা প্রত্যাখ্যান করে শহরের বখাটে ছেলেদের তাঁর পেছনে লাগিয়ে দেয়।
তারা তাঁকে গালমন্দ করে এবং পাথর ছুড়ে রক্তাক্ত করে। রক্তে তাঁর জুতা জোড়া পা দুটির সঙ্গে লেপ্টে গিয়েছিল।
এমন চরম নির্যাতন ও অপমানের মুখে জিবরাইল (আ.) পাহাড়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতাকে নিয়ে রাসুলের দরবারে উপস্থিত হন এবং বলেন, আল্লাহ আপনার প্রতি আপনার সম্প্রদায়ের উক্তি এবং আপনার বিরুদ্ধে তাদের উত্তরও শুনেছেন, তিনি আপনার নিকট পাহাড়ের ফেরেশতাকে পাঠিয়েছেন, যেন আপনার সম্প্রদায়ের ব্যাপারে যা ইচ্ছা তাকে আদেশ করেন।
তখন পাহাড়ের ফেরেশতাও বললেন, ‘হে মুহাম্মাদ (সা.), আপনার প্রতি আপনার সম্প্রদায়ের লোকজনের উক্তি আল্লাহ–তাআলা শুনেছেন, আর আমি পাহাড়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা। আপনার রব আপনার কাছে আমাকে এ জন্য পাঠিয়েছেন যেন আপনি আপনার চাহিদামাফিক আমাকে নির্দেশ দেন। আপনি বললে আমি এই দুই পাহাড় তাদের ওপর চাপা দিয়ে দেব।’
কিন্তু তিনি চরমতম নিপীড়কদের জন্যও কোনো প্রতিশোধ বা ধ্বংস কামনা করেননি। তিনি উত্তর দিলেন, ‘না, বরং আমি আশা করছি, আল্লাহ–তাআলা হয়তো এদের বংশধর থেকেই এমন মানুষ জন্ম দেবেন, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২৩১)
নিজের রক্তে ভেজা শরীরে শত্রু ধ্বংসের সুযোগ পেয়েও ক্ষমা ও কল্যাণের এই আকুতি মানবজাতির ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
যে মক্কায় তিনি নির্যাতিত ও নিগৃহীত হয়েছিলেন, সেই মক্কায় এক ফোঁটা রক্তও না ঝরিয়ে তিনি মক্কাবাসীকে ক্ষমা করে দিলেন। বিজয়ী রাষ্ট্রনায়কদের ইতিহাসে মক্কা বিজয়ের এই সাধারণ ক্ষমা এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত।
মহানবী (সা.)-এর ক্ষমাশীলতার সবচেয়ে উজ্জ্বল ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত ছিল অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের দিন। দীর্ঘ দুই দশক ধরে যে মক্কাবাসী তাঁকে ও তাঁর সাহাবিদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছিল, বয়কট করেছিল, মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত করেছিল এবং একের পর এক যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল, সেই বিজিত শত্রুরাই আজ নবীজির সামনে সম্পূর্ণ অসহায় ও অবনতমস্তকে দাঁড়িয়ে।
১০ হাজার মুসলিম সেনাদল নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করে তিনি বিজয়ী রাজাদের মতো প্রতিশোধ বা রক্তপাতের পথ বেছে নেননি।
কাবা প্রাঙ্গণে সমবেত ভীতসন্ত্রস্ত কোরাইশদের উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘হে কুরাইশ সম্প্রদায়, তোমরা আজ আমার কাছ থেকে কেমন ব্যবহার আশা করছ?’ তারা উত্তর দিল, ‘ভালো ব্যবহার আশা করছি। আপনি দয়ালু ভাই এবং দয়ালু ভাইয়ের সন্তান।’
তখন মহানবী (সা.) সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দিয়ে বললেন, ‘যাও, তোমরা সবাই স্বাধীন ও মুক্ত।’ (তাবারি, তারিখে তাবারি, ৩/৬১, দারুল মাআরিফ, মিসর)
সেদিন তিনি আরও বলেছিলেন, ‘যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ। যে ব্যক্তি নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখবে, সে নিরাপদ। আর যে ব্যক্তি মসজিদে (কাবায়) প্রবেশ করবে, সে-ও নিরাপদ।’ (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪/৫৬২, দারু ইবনে কাসির, দামেস্ক, ২০১০)
যে মক্কায় তিনি নির্যাতিত ও নিগৃহীত হয়েছিলেন, সেই মক্কায় এক ফোঁটা রক্তও না ঝরিয়ে তিনি মক্কাবাসীকে ক্ষমা করে দিলেন। বিজয়ী রাষ্ট্রনায়কদের ইতিহাসে মক্কা বিজয়ের এই সাধারণ ক্ষমা এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত।
মহানবী (সা.)-এর ক্ষমা শুধু রাজনৈতিক বা সামাজিক শত্রুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং যারা ব্যক্তিগতভাবে তাঁর ক্ষতিসাধন করেছিল, তাদের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য ছিল।
১. হামজার ঘাতক ও হিন্দা: ওহুদের যুদ্ধে নবীজির প্রিয় চাচা হামজাকে নির্মমভাবে শহীদ করা হয়। ওয়াহশি নামক এক দাস আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতে উতবার প্ররোচনায় ও পূর্ব-প্রতিশ্রুত মুক্তির লোভে বর্শার আঘাতে হামজাকে শহীদ করে। (সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ৪০৭২)
যুদ্ধ শেষে চাচার ক্ষতবিক্ষত দেহ দেখে রাসুল (সা.) তীব্র শোকাহত হয়েছিলেন। বর্ণিত আছে, হিন্দা যুদ্ধক্ষেত্রে হামজার দেহ বিকৃত করেছিল এবং কলিজা বের করে চিবানোর চেষ্টা করেছিল। যদিও তা গিলতে না পেরে ফেলে দেয়। (সিরাতে ইবনে হিশাম, ৩/৫০, বর্ণনা নম্বর ১১৫৫, দারুস সাহাবা, তানতা, মিসর, ১৯৯৫)
মক্কা বিজয়ের পর যখন হামজা (রা.)-এর ঘাতক ওয়াহশি এবং হিন্দা ইসলাম গ্রহণ করতে আসেন, তখন মহানবী (সা.) তাঁদের পূর্ণ ক্ষমা করে দেন।
২. সুরাকা ইবনে মালিক: মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সময় মক্কার কুরাইশরা ঘোষণা করেছিল, যে ব্যক্তি মুহাম্মদ (সা.)-কে জীবিত বা মৃত ধরে আনতে পারবে, তাকে এক শ উট পুরস্কার দেওয়া হবে।
এই লোভে সুরাকা ইবনে মালিক রাসুলকে ধাওয়া করেছিল। কিন্তু অলৌকিকভাবে তার ঘোড়ার পা বালুতে দেবে যায় এবং সে নিজের ভুল বুঝতে পেরে নবীজির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। রাসুল (সা.) তাকে শুধু ক্ষমাই করেননি বরং তাকে পারস্যের সম্রাটের স্বর্ণের বালা পরার সুসংবাদ দিয়েছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯০৬)
৩. বিষপ্রয়োগকারী ইহুদি নারী: খাইবার বিজয়ের পর জয়নব বিনতে হারিস নামক এক ইহুদি নারী রাসুল (সা.)-কে হত্যার উদ্দেশ্যে ভুনা করা ছাগলের গোশতে বিষ মিশিয়ে পরিবেশন করে। প্রথম লোকমা মুখে দিয়েই রাসুল (সা.) বুঝতে পেরে তা ফেলে দেন। কিন্তু তাঁর সাহাবি বিশর ইবনুল বারা (রা.) বিষাক্ত গোশত খেয়ে শাহাদাত বরণ করেন। সেই নারী নিজের অপরাধ স্বীকার করার পরও রাসুল (সা.) তাকে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা করে দেন। (সহিহ বুখারি: ২৬১৭)
‘শক্তিশালী সে নয় যে কুস্তিতে কাউকে হারিয়ে দেয়, বরং প্রকৃত শক্তিশালী সেই, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪
৪. জাদুকর লাবিদ ইবনে আসাম: লাবিদ ইবনে আসাম নামের এক ব্যক্তি মহানবীকে জাদু করেছিল, যার ফলে তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে কষ্ট পেয়েছিলেন। আল্লাহ–তাআলা ওহির মাধ্যমে জাদুকর ও জাদুর উপাদানের স্থান প্রকাশ করে দিলে তা নিষ্ক্রিয় করা হয়। জাদুকরকে চেনা সত্ত্বেও রাসুল (সা.) তার বিরুদ্ধে কোনো আইনি বা ব্যক্তিগত পদক্ষেপ নেননি এবং কাউকে তা প্রকাশ করতেও নিষেধ করেছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৭৬৫)
রাসুল (সা.) কেবল নিজে ক্ষমা করেননি, বরং সাহাবিদের ও সমগ্র উম্মতকে ক্ষমার চর্চা করার জোর নির্দেশ দিয়েছেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দান করলে সম্পদে ঘাটতি হয় না। যে ব্যক্তি ক্ষমা করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। আর কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনীত হলে আল্লাহ তাকে উচ্চ মর্যাদায় আসীন করেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৮)
ক্ষমা কোনো দুর্বলতা নয়, বরং আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নৈতিক শক্তির সবচেয়ে বড় বহিঃপ্রকাশ। রাসুল (সা.) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘শক্তিশালী সে নয় যে কুস্তিতে কাউকে হারিয়ে দেয়, বরং প্রকৃত শক্তিশালী সেই, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪)
আজকের বিশ্বে সামান্য মতভেদে রক্তপাত, রাজনৈতিক বিভাজন ও সামাজিক অসহিষ্ণুতার মধ্যে মহানবী (সা.)-এর ক্ষমার আদর্শই হতে পারে মুক্তির একমাত্র দিশা।
সৈয়দ আবিদুল হক : মুহাদ্দিস, জামিয়া ইসলামিয়া এমদাদুল উলুম, নরসিংদী