খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকের শেষভাগে আরবের গোত্রীয় রাজনীতিতে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতটির নাম ‘হারবুল ফিজার’ (পবিত্রতা লঙ্ঘনের যুদ্ধ)। আরবের হাজার বছরের পুরোনো রীতি ছিল, নিষিদ্ধ চার পবিত্র মাসে (জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব) কোনো যুদ্ধ হবে না, আর মক্কার হারাম সীমানার ভেতরে রক্তপাত একেবারেই অকল্পনীয়।
এই দুই রীতিই ভেঙে পড়েছিল বলে সমকালীন আরবরা এই সংঘাতকে ‘ফিজার’ বা ‘পাপাচার’ নামে ডাকতে শুরু করে।
সিরাতের পুরোনো বিবরণে তরুণ মুহাম্মদের বয়স নিয়ে ১৪, ১৫ বা ২০ বছরের যে আপাত-বিরোধ দেখা যায়, তার সমাধান লুকিয়ে আছে একটি সহজ সত্যে—‘ফিজার’ আসলে একটি নয়, ধারাবাহিক চারটি পৃথক সংঘাতের সমষ্টি।
আরব ইতিহাসবিদ আবুল ফারাজ আল-ইসফাহানি ও ইবনে কাসিরের মতে প্রাক-ইসলামি আরবে ‘ফিজার’ নামে মোট চারটি পৃথক সংঘাত ঘটেছিল। (কিতাবুল আগানি, ১৯/৭৫, দারুল কুতুব, কায়রো, ১৯৩৮; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/১১৪, দারু ইহয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৮৮)
আধুনিক পাশ্চাত্য গবেষণাতেও এই চার-পর্বের কাঠামো স্বীকৃত, যদিও বিভিন্ন সূত্রে ঘটনার ক্রম ও বিস্তারিত খুঁটিনাটিতে সামান্য তারতম্য আছে।
সিরাতের বিভিন্ন বর্ণনায় ছড়িয়ে থাকা বয়সের এই আপাত-বিরোধ তাই কোনো অসংগতি নয়; বরং এটি একটানা চার-পাঁচ বছর ধরে চলা এক দীর্ঘ সংঘাতের বিভিন্ন পর্বের স্বাভাবিক প্রতিফলন।
প্রথম সংঘাত বাধে উকাজের মেলায় বনু কিনানা ও বনু হাওয়াজিনের মধ্যে এক অপমানজনক উপহাস ঘিরে। এটা ‘ফিজারুল কিরদ’। বনু কিনানার এক ব্যক্তি উকাজের বাজারে এক ব্যক্তিকে উপহাস করে একটি বানর দেখিয়ে নিজের গোত্রকে শ্রেষ্ঠ দাবি করলে বনু হাওয়াজিন ও কিনানার মধ্যে প্রথম হাতাহাতি ও রক্তাক্ত দাঙ্গা বাধে।
দ্বিতীয়টি ঘটে বনু আমির গোত্রের এক নারীর সম্মানহানির অভিযোগে কোরাইশ-কিনানা বনাম কায়স আইলানের মধ্যে। এটা ‘ফিজারুল মারআহ’। উকাজের মেলায় বনু আমির গোত্রের এক যুবতীর মুখের পর্দা জোরপূর্বক উন্মোচনের চেষ্টাকে কেন্দ্র করে এই রক্তপাত ঘটে।
তৃতীয়টি ছিল এক কোরাইশ বণিকের পাওনা অর্থ নিয়ে বনু নাসরের সঙ্গে ছোট সংঘর্ষ। এটা ফিজারুদ দাইন।
চতুর্থ ও সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাতটি শুরু হয় হিরার রাজা নোমান ইবনে মুনজিরের রাজকীয় কাফেলা লুণ্ঠন আর উরওয়াহ আর-রাহহালের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে, যা চার বছর ধরে গড়ায়। এটা ফিজারুল বাররাদ বা ‘হারব শামতাহ’।
প্রথম দুই-তিনটি ছোট সংঘাতের সময় মুহাম্মদ (সা.)-এর বয়স ছিল চৌদ্দ-পনেরোর কাছাকাছি, আর চূড়ান্ত রক্তক্ষয়ী পর্বে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তাঁর বয়স হয় বিশ বছর। (ইবনে সাইয়্যিদ আন-নাস,উয়ুনুল আসার ফি ফুনুনিল মাগাজি ওয়াশ শামায়িল ওয়াস সিয়ার, ১/৪৭, দারুল কলম, বৈরুত, ১৯৯৩)
সিরাতের বিভিন্ন বর্ণনায় ছড়িয়ে থাকা বয়সের এই আপাত-বিরোধ তাই কোনো অসংগতি নয়; বরং এটি একটানা চার-পাঁচ বছর ধরে চলা এক দীর্ঘ সংঘাতের বিভিন্ন পর্বের স্বাভাবিক প্রতিফলন।
চতুর্থ ও চূড়ান্ত ফিজারের শিকড়ে ছিল বাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণ ঘিরে ভূ-রাজনীতিতে। মেসোপটেমিয়ার হিরা রাজ্যের লাখমিড শাসক নোমান ইবনে মুনজির (৫৮০–৬০২ খ্রি.) প্রতিবছর সুগন্ধি ও রেশমবোঝাই একটি বিশেষ রাজকীয় কাফেলা, যাকে বলে ‘লাতিমাহ’, উকাজের মেলায় পাঠাতেন, যার বিনিময়ে ইয়েমেনি চামড়া ও কাপড় কিনে হিরায় ফেরত নেওয়া হতো।
এই মূল্যবান কাফেলাকে নিরাপদে হেজাজে পৌঁছে দেওয়ার সম্মানজনক দায়িত্ব পান বনু হাওয়াজিনের কায়স-উপগোত্রীয় নেতা উরওয়াহ আর-রাহহাল।
কিন্তু বনু কিনানার নির্বাসিত ডাকাত আল-বাররাদ ইবনে কায়স এই দায়িত্ব নিজে না পেয়ে এটিকে বংশীয় অপমান হিসেবে দেখেন এবং নিষিদ্ধ জিলকদ মাসে তায়েফের উত্তরের ‘ফিদাক’ উপত্যকায় উরওয়াহকে অতর্কিত হত্যা করে কাফেলাটি লুণ্ঠন করেন। (আল-বালাজুরি, আনসাবুল আশরাফ, ১/৫৯, দারুল মাআরিফ, কায়রো, ১৯৫৯)
পবিত্র মাসে এই হত্যাকাণ্ড এবং মক্কার হারাম-সীমানার পবিত্রতা লঙ্ঘনের আশঙ্কা—দুটো মিলিয়েই ঘটনাটি ‘ফিজার’ নাম পায়।
হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে উকাজে অবস্থানরত কোরাইশ নেতা হারব ইবনে উমাইয়া বুঝতে পারেন, উরওয়াহর গোত্র বনু আমির ও কায়স আইলান প্রতিশোধ নিতে তেড়ে আসবে।
উকাজের মেলাস্থল ছিল তায়েফ ও নাখলার মধ্যবর্তী একটি খোলা মালভূমিতে, তায়েফ থেকে প্রায় ৩০-৪০ কিলোমিটার আর মক্কা থেকে মোটামুটি ৮০-১০০ কিলোমিটার দূরত্বে। (ইয়াকুত আল-হামাবি, মুজামুল বুলদান, ৪/১৪২, দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৯৫)
ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক ২১° ২৯′ উত্তর অক্ষাংশ ও ৪০° ২৫′ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ।
তৎকালীন গোত্রীয় সমাজে পরিণত-বয়সী তরুণদের পারিবারিক প্রতিরক্ষায় শামিল হওয়া প্রায় বাধ্যতামূলক ছিল, কিন্তু বিশ বছর বয়সী মুহাম্মদ (সা.) সরাসরি তরবারি বা তির চালাননি; তাঁর ভূমিকা ছিল সুনির্দিষ্ট রসদ-সহায়তামূলক।
কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই কোরাইশ ও কিনানা গোত্র সন্ধ্যার আঁধারে উকাজ ছেড়ে মক্কার দিকে দ্রুত পিছু হটে। কায়স গোত্র খবর পেয়ে অস্ত্রসজ্জিত হয়ে ধাওয়া করে এবং মক্কার হারাম সীমানার ঠিক প্রবেশমুখে, নাখলা উপত্যকায় কোরাইশদের নাগাল পায়।
কিন্তু কোরাইশ-কিনানা জোট ততক্ষণে হারাম সীমানার ভেতরে ঢুকে পড়ে, আর পবিত্র সীমানার ভেতরে যুদ্ধ চালানো তৎকালীন আরব সমাজে এমনই গুরুতর অপরাধ বলে গণ্য হতো যে কায়স বাহিনী সীমানার মুখেই থমকে যায় এবং পরের বছর উকাজেই চূড়ান্ত ফয়সালার ঘোষণা দিয়ে ফিরে যায়। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৮৪, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৯০)
প্রাক-ইসলামি আরবে চান্দ্রবছরকে সৌর ঋতুর সঙ্গে মিলিয়ে রাখতে প্রতি দুই-তিন বছর পরপর একটি অতিরিক্ত মাস যোগ করা হতো, যাকে বলা হতো ‘নাসি’। (আল-বিরুনি, আল-আসারুল বাকিয়া আনিল কুরুনিল খালিয়া, পৃষ্ঠা ৬০, লাইপজিগ, ১৮৭৮)
এই প্রথার কারণেই উকাজের বার্ষিক মেলা মোটামুটি নির্দিষ্ট এক ঋতুতে বসত, যদিও ঠিক কোন গ্রেগরিয়ান মাসে তা পড়ত তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। কেননা, নাসি গণনার সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন ইতিহাসে পুরোপুরি সংরক্ষিত নেই।
তবে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পশ্চাৎ-গণনায় দেখা যায়, আনুমানিক ৫৮৬ থেকে ৫৯০ খ্রিষ্টাব্দের সময়কালে আরবের জিলকদ মাসটি আধুনিক সৌর ক্যালেন্ডারের বসন্তের শেষ বা গ্রীষ্মের প্রারম্ভে (মে-জুন মাস) পড়ত।
ধারণা করা যায়, গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহ শুরুর ঠিক আগে-আগেই এই মেলা বসত, যাতে দূর-দূরান্তের গোত্রগুলো তুলনামূলক সহনীয় আবহাওয়ায় জড়ো হতে পারে। এই মৌসুমি নিয়মিততার কারণেই দুই পক্ষ পরের বছর একই সময়ে, একই স্থানে চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতি দিতে পেরেছিল।
তবে ই ঋতুভিত্তিক ও রাজনৈতিক দিনপঞ্জির কারণেই এক বছরের যুদ্ধবিরতি দিয়ে পরবর্তী বছর নির্দিষ্ট মাসে উভয় পক্ষ আবারও উকাজ ও নাখলার মধ্যবর্তী ‘শামতাহ’ প্রান্তরে বড় ধরনের সংঘাতে লিপ্ত হয়েছিল।
চূড়ান্ত সংঘাতে কোরাইশ-কিনানা জোটের নেতৃত্বে ছিলেন আবু সুফিয়ানের পিতা হারব ইবনে উমাইয়া, আর বনু হাশিমের পক্ষ থেকে সরাসরি লড়াইয়ে অংশ নেন জোবাইর ইবনে আবদুল মুত্তালিব, আবু তালিব ও হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব।
তৎকালীন গোত্রীয় সমাজে পরিণত-বয়সী তরুণদের পারিবারিক প্রতিরক্ষায় শামিল হওয়া প্রায় বাধ্যতামূলক ছিল, কিন্তু বিশ বছর বয়সী মুহাম্মদ (সা.) সরাসরি তরবারি বা তির চালাননি; তাঁর ভূমিকা ছিল সুনির্দিষ্ট রসদ-সহায়তামূলক।
তিনি নিজেই বলেছেন, শত্রুপক্ষের ছোড়া তির কুড়িয়ে তিনি নিজের চাচাদের হাতে তুলে দিতেন। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১৫৭০)
মরুযুদ্ধের রণকৌশলে ছোড়া তির কুড়িয়ে পুনরায় নিজ পক্ষের ধনুর্ধারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া ছিল সম্মুখসারির কাছাকাছি থেকে করা এক ঝুঁকিপূর্ণ অথচ প্রতিরক্ষামূলক কৌশলগত দায়িত্ব।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার কিছুকাল পরই মক্কার প্রবীণেরা আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের গৃহে সমবেত হয়ে গঠন করেন আরব ইতিহাসের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ন্যায়বিচারমূলক চুক্তি—‘হিলফুল ফুজুল’।
চূড়ান্ত সংঘাতে উভয় পক্ষের বহু যোদ্ধা নিহত হওয়ার পর যুদ্ধ এক অচলাবস্থায় পৌঁছায়। হেজাজের গোটা বাণিজ্য-অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় উভয় পক্ষই আপসে আগ্রহী হয়।
হিসাব করে দেখা যায়, কায়স আইলান গোত্রের নিহতের সংখ্যা কোরাইশ-কিনানার চেয়ে বিশ জন বেশি; হারব ইবনে উমাইয়া অতিরিক্ত কুড়িজনের রক্তপণ নিজে বহন করার প্রতিশ্রুতি দিলে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/১১৫, দারু ইহয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৮৮)
দীর্ঘ এই রক্তক্ষয় আরবের গোত্রীয় সমাজে গভীর আত্মজিজ্ঞাসার জন্ম দেয়, পবিত্র মাসের আইন ভঙ্গ আর নিরন্তর প্রতিহিংসার এই চক্র মক্কার সামাজিক মর্যাদাকেই বিপন্ন করে তুলছিল।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার কিছুকাল পরই মক্কার প্রবীণেরা আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের গৃহে সমবেত হয়ে গঠন করেন আরব ইতিহাসের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ন্যায়বিচারমূলক চুক্তি—‘হিলফুল ফুজুল’, যেখানে নিপীড়িতের পক্ষে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার করে একাধিক গোত্র। নবীজি (সা.) নিজে পরবর্তী জীবনে এই চুক্তিকে উচ্চ প্রশংসায় স্মরণ করেছেন।
হারবুল ফিজারের কাহিনি সিরাতের এমন এক অধ্যায়, যেখানে সংঘাত, ভুল আর অনুশোচনার ভেতর দিয়েই আরব সমাজ একটি বড় নৈতিক শিক্ষায় পৌঁছায়।