হাদিস

নবীজির (সা.) উপমায় প্রাণ ও প্রকৃতি: ২

মহানবীর দাওয়াতি কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ ছিল ‘উপমা’। কোনো নির্দিষ্ট গুণের ভিত্তিতে যদি দুটো জিনিস একই রকমের হয়, তখন উপমা খুব দ্রুতই অপরিচিত জিনিসটিকে মানসপটে চিত্রিত করে তোলে। তাঁর উপমা থেকে স্পষ্ট হয় প্রাণ ও প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কত গভীর ছিল।

নবীজি (সা.) নানাবিধ বিষয় সহজভাবে উপস্থাপনের জন্য প্রাণ ও প্রকৃতিকে উপমান হিসেবে ব্যবহার করতেন। তাঁর উপমার ব্যবহার থেকে স্পষ্ট হয় যে তিনি কেবল একজন বাগ্মী ও মিষ্টভাষীই ছিলেন না, বরং প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক ছিল। এমনই কিছু উপমার ব্যবহার দিয়ে নিবন্ধটি সাজানো হয়েছে।

পলায়নরত উট

এক আরব বেদুইন আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর কাছে কোনো বিষয়ে সাহায্য চাইতে এল। খুব সম্ভবত রক্তপণ দেওয়ার জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে। আল্লাহর রাসুল (সা.) তাকে কিছু দিলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি কি আপনার সঙ্গে ভালো আচরণ করিনি?’

বেদুইনটি (অকৃতজ্ঞভাবে) উত্তর দিল, ‘না, আপনি মোটেও ভালো আচরণ করেননি।’

এ কথা শুনে উপস্থিত সাহাবিরা রেগে গেলেন এবং এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো যে তাঁরা তখনই তেড়ে আসবেন। রাসুল (সা.) তাঁদের ইশারা করলেন যেন তাঁরা নিবৃত্ত থাকেন। তিনি উঠে নিজের ঘরে গেলেন, এরপর সেই বেদুইনকেও ভেতরে ডেকে পাঠালেন। সেখানে তাকে আরও কিছু দান করলেন এবং আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘এখন কি আমি আপনার প্রতি ভালো আচরণ করেছি?’

(ভালো) মানুষের উদাহরণ সেই এক শ উটের পালের মতো, যার মধ্যে তুমি হয়তো একটিও আরোহণযোগ্য উট খুঁজে পাবে না।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬,৪৯৮

বেদুইনটি বলল, ‘হ্যাঁ, আল্লাহ আপনাকে আপনার পরিবার ও বংশের পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান দিন।’

তখন রাসুল (সা.) তাকে বললেন, ‘আপনি যখন আমাদের কাছে এসে সাহায্য চাইলেন, তখন আমি আপনাকে (যতটুকু পারি) দিয়েছি, কিন্তু আপনি তখন এমন কিছু কথা বলেছেন যার কারণে আমার সাহাবিদের মনে আপনার প্রতি ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এখন আপনি যদি তাদের সামনেও সে কথাটি বলেন—এইমাত্র আমার সামনে যা বললেন, তাহলে তাদের মনের সেই ক্ষোভ দূর হয়ে যাবে।’

বেদুইন বলল, ‘ঠিক আছে, আমি বলব।’

পরদিন বেদুইন সাহাবিগণের সামনে ঠিক সেভাবেই কথাগুলো বলল। এরপর রাসুল (সা.) একটি চমৎকার উপমা দিয়ে বলেন:

‘আমার এবং এই বেদুইনের উদাহরণ হলো সেই ব্যক্তির মতো, যার একটি উট ছিল এবং সেটি পালিয়ে গিয়েছিল। লোকজন উটটিকে ধরার জন্য পেছনে ছুটল, কিন্তু এতে সে আরও বেশি ভয় পেয়ে দ্রুত ছুটতে লাগল। তখন উটের মালিক লোকদের বলল, তোমরা সরে দাঁড়াও। আমি আমার উটকে ভালোভাবে চিনি, তাকে আমি শান্তভাবে ধরতে পারব। এরপর সে উটটির সামনে গিয়ে মাটি থেকে কিছু ঘাস তুলল, এরপর তাকে ডাকল। উটটি তখন শান্ত হয়ে তার কাছে ফিরে এল। অতঃপর সে উটের পিঠে হাওদা বেঁধে দিল। ঠিক তেমনই, বেদুইন যখন (অশোভন) কথা বলেছিল, তখন যদি আমি তোমাদের কথামতো চলতাম (অর্থাৎ তার প্রতি বিশেষভাবে দয়া না দেখাতাম), তবে সে (কাফের অবস্থায় মারা গিয়ে) জাহান্নামে প্রবেশ করত।’ (মুসনাদুল বাযযার, হাদিস: ৮,৭৯৯, মাজমাউয যাওয়ায়েদ, হাদিস: ১৪,১৯৩)

লাগাম লাগানো উট

নবী করিম (সা.) বলেন, ‘তোমাদের ওপর (শাসকের) আনুগত্য করা আবশ্যক, যদিও সে একজন হাবশি ক্রীতদাস হয়। কেননা একজন মুমিনের উদাহরণ হলো নাকে লাগাম লাগানো সেই উটের মতো—যাকে যেদিকেই টেনে নেওয়া হবে, সেদিকেই সে যেতে বাধ্য।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪৩)

উটের পাল

নবীজি (সা.) বলেন, ‘(ভালো) মানুষের উদাহরণ সেই এক শ উটের পালের মতো, যার মধ্যে তুমি হয়তো একটিও আরোহণযোগ্য উট খুঁজে পাবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬,৪৯৮)

এ কথা বলার উদ্দেশ্য হলো, সব উট যেমন আরোহণের যোগ্য হয় না, তেমনি সব মানুষ সত্যিকারের মানবিকতাবোধসম্পন্ন নয়। মানুষের মধ্য ধীরে ধীরে আমানত রক্ষার মনোভাব একেবারে নাই হয়ে যাচ্ছে, তাই এমন এক সময় আসবে যখন এক শ মানুষের মধ্যে একজনও আমানতদার খুঁজে পাওয়া যাবে না।

মুমিন পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়, সর্বক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে অটল হয়ে থাকে না। অনেক সময় নিজের অপছন্দের একটি বিষয়কেও মেনে নিতে হয়।

মৌমাছি ও স্বর্ণ

রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ অশ্লীলতা ও নির্লজ্জ আচরণ অপছন্দ করেন। সেই সত্তার কসম, যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ—ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না আমানতদারকে খেয়ানতকারী বলা হবে এবং খেয়ানতকারীকে আমানতদার হিসেবে বিশ্বাস করা হবে। এমনকি (সমাজে) প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতা বৃদ্ধি পাবে, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা হবে এবং প্রতিবেশীর সঙ্গে মন্দ আচরণ করা হবে।

‘সেই সত্তার কসম, যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ—নিশ্চয় মুমিনের উদাহরণ হলো স্বর্ণের টুকরার মতো—তার মালিক (আগুনে পুড়িয়ে খাঁটি করার সময়) তাতে ফুঁ দিলে তার কোনো পরিবর্তন হয় না এবং তা ওজনেও কমে না।

‘সেই সত্তার কসম, যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ—নিশ্চয় মুমিনের উদাহরণ হলো মৌমাছির মতো, সে পবিত্র জিনিস খায়, (পেট থেকে) পবিত্র জিনিসই বের করে, আর সে যখন (ফুলের ওপর) বসে, তখন তা ভেঙে ফেলে না কিংবা নষ্টও করে না।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৬,৮৭২)

কোমল শস্য ও শক্ত দেবদারু

নবীজি (সা.) বলেন, ‘মুমিন ব্যক্তির উদাহরণ হলো শস্যক্ষেত্রের নরম চারা গাছের মতো, যাকে বাতাস একবার নোয়ায়, আবার সোজা করে দেয়। আর মোনাফিকের উদাহরণ হলো আরজা গাছের (দেবদারুজাতীয় গাছ) মতো, যাকে কিছুতেই নোয়ানো যায় না। শেষে এক ঝটকায় মূলসহ তা উপড়ে যায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫,৬৪৩)

এর মানে মুমিন পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়, সর্বক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে অটল হয়ে থাকে না। অনেক সময় নিজের অপছন্দের একটি বিষয়কেও মেনে নিতে হয়। তবু তার জীবন থেমে থাকে না। অন্যদিকে মোনাফিক তার সিদ্ধান্তকে ধ্রুব মনে করে, নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারে না। এ কারণে তারা সফলও হতে পারে না।

মুমিন যা করে খুবই সতর্কতার সঙ্গে করে। আরব অঞ্চলে সাধারণত গর্তের ভেতর সাপ লুকিয়ে থাকে, সেখানে পা না ঢোকালে সাপের ছোবল খাওয়ার ভয় নেই।

বহনকারী প্রাণী

নবীজি (সা.) এরশাদ করেন, ‘নিশ্চয় এই দীন অত্যন্ত সুদৃঢ় ও মজবুত। তাই এতে বেশ কোমলতার সঙ্গে প্রবেশ করো। আল্লাহর এবাদতকে নিজের কাছে বিরক্তিকর করে তুলো না। কারণ, যে ব্যক্তি (দ্রুত পৌঁছানোর তাড়নায়) বহনকারী প্রাণীকে অতিরিক্ত চাপ দেয়, সে না পথ অতিক্রম করতে পারে, আর না তার বাহনটিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।’ (শরহুস সুন্নাহ লিল-বাগাবি, ৪/৫১, আল-মাকতাবাতুল ইসলামি, দিমাশক)

অর্থাৎ ইসলাম পালনেও পরিমিতিবোধ রাখা জরুরি। একমাত্র ফরজ বিধান ছাড়া অন্য কোনো ক্ষেত্রেই নিজের ওপর কঠোর হওয়া উচিত নয়।

গর্ত ও সাপ

নবীজি (সা.) এরশাদ করেন, ‘একজন মুমিন একই গর্ত থেকে দুইবার দংশিত হয় না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬,১৩৩)

এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে, মুমিন যা করে খুবই সতর্কতার সঙ্গে করে। আরব অঞ্চলে সাধারণত গর্তের ভেতর সাপ লুকিয়ে থাকে, সেখানে পা না ঢোকালে সাপের ছোবল খাওয়ার ভয় নেই। এ কারণে এমন উপমা ব্যবহার করা হয়েছে।

 mawlawiashraf@gmail.com

মওলবি আশরাফ: আলেম, লেখক ও অনুবাদক