ইসলাম পিতা-মাতার অধিকার ও মর্যাদাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছে। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন সুরায় পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে পিতা-মাতার প্রধান ৮টি অধিকার সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত কোরো না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৩)
এই আয়াতে আল্লাহ–তাআলা পিতা-মাতার আদব, সম্মান ও তাঁদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করাকে নিজের ইবাদতের সঙ্গে একত্র করে ফরজ করেছেন। এতে প্রমাণিত হয় যে আল্লাহ–তাআলার ইবাদতের পর পিতা-মাতার আনুগত্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।
এক ব্যক্তি নবীজিকে প্রশ্ন করল, আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় কাজ কোনটি? তিনি বললেন, ‘সময় হলে নামাজ পড়া।’ সে আবার প্রশ্ন করল, এরপর কোন কাজটি সর্বাধিক প্রিয়? তিনি বললেন, ‘পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৭০)
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘পিতা-মাতার কোনো একজন কিংবা উভয়ে যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাঁদেরকে উফ পর্যন্ত বলো না।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৩)
এখানে ‘উফ’ শব্দটি দ্বারা এমন সব শব্দ বোঝানো হয়েছে, যা দ্বারা সামান্যতম বিরক্তি বা অসন্তোষ প্রকাশ পায়; এমনকি তাঁদের কথা শুনে বিরক্তিবোধক দীর্ঘশ্বাস ফেলাও এর অন্তর্ভুক্ত।
সুতরাং তাঁদের প্রতি কোনো ধরনের বিরক্তি প্রকাশ করা যাবে না। বার্ধক্যের কারণে তাঁরা কোনো কথা বারবার বললে বা কোনো আবদার করলে সহনশীলতার সঙ্গে তার জবাব দিতে হবে।
পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, ‘তাঁদেরকে ধমক দিও না।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৩)
আল্লাহ–তাআলা ‘উফ’ শব্দ উচ্চারণ করাকেও নিষিদ্ধ করেছেন, যা বিরক্তির সর্বনিম্ন প্রকাশ। যখন এতটুকু কষ্ট দেওয়াও হারাম, তখন উচ্চ স্বরে কথা বলা, ধমক দেওয়া, অপমান করা, গালিগালাজ করা কিংবা রাগ প্রদর্শন করা যে কত বড় অপরাধ, তা সহজেই অনুমেয়।
হাদিস শরিফে এসেছে, এক ব্যক্তি মহানবীকে জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রাসুল! আমার সদ্ব্যবহার পাওয়ার কে সবচেয়ে বেশি হকদার? তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ সে আবার জিজ্ঞাসা করল, তারপর কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ সে পুনরায় জিজ্ঞাসা করল, তারপর কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ সে আবার জিজ্ঞাসা করল, তারপর কে? তিনি বললেন, ‘তোমার বাবা।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৪৮)
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৩)
পূর্বের নির্দেশগুলো ছিল নিষেধমূলক, যেখানে পিতা-মাতার সামান্যতম কষ্টের কারণ হতে পারে এমন আচরণ থেকে বিরত থাকার আদেশ দেওয়া হয়েছে। আর এই নির্দেশে ইতিবাচকভাবে তাঁদের সঙ্গে কথা বলার ঐশী শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ পিতা-মাতার সঙ্গে সর্বদা ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও নম্র কণ্ঠে কথা বলতে হবে। এ প্রসঙ্গে তাবেয়ি সাইদ ইবনে মুসাইয়্যিব বলেন, ‘সন্তান তার পিতা-মাতার সঙ্গে এমন বিনয় ও নম্রতার সঙ্গে কথা বলবে, যেমন একজন অনুগত দাস তার কঠোর স্বভাবের প্রভুর সঙ্গে কথা বলে।’
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘পিতা-মাতার প্রতি মমতাবশত বিনয়ের পাখা অবনত করে দাও।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৪)
অর্থাৎ সন্তান যেন ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও বিনয়ের প্রতীক হিসেবে পিতা-মাতার সামনে নিজেকে বিনম্র ও অনুগত হিসেবে উপস্থাপন করে। তবে পিতা-মাতার প্রতি এই নম্রতা যেন কেবল বাহ্যিক বা লোকদেখানো আচরণ না হয়; বরং তা হতে হবে অন্তরের গভীর ভালোবাসা ও মমতার ভিত্তিতে।
প্রকৃতপক্ষে পিতা-মাতার সামনে নিজেকে নত করা কোনো হীনতা নয়, বরং তা দুনিয়া ও আখেরাতে সত্যিকার মর্যাদা লাভের অন্যতম মাধ্যম।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ সন্তানদের দোয়ার নিয়ম শিখিয়ে বলেছেন, ‘দোয়া করো, হে আমার প্রতিপালক! তারা যেভাবে আমার শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছে, তেমনি আপনিও তাদের প্রতি রহমতের আচরণ করুন।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৪)
পিতা-মাতার ষোলো আনা সুখ-শান্তি বিধান করা মানুষের সাধ্যাতীত। কাজেই সাধ্যানুযায়ী চেষ্টার পাশাপাশি তাঁদের জন্য আল্লাহ–তাআলার কাছে প্রতিনিয়ত দোয়া করতে হবে।
প্রত্যেক সন্তানের উচিত পিতা-মাতার জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর সর্বদা এই দোয়ার মাধ্যমে তাঁদের আত্মিক খেদমত করা।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তুমি শোকর আদায় করো আমার এবং তোমার পিতা-মাতার।’ (সুরা লুকমান, আয়াত: ১৪)
এই আয়াতে আল্লাহ–তাআলা মানুষের ওপর নিজের কৃতজ্ঞতার পাশাপাশি পিতা-মাতার শুকরিয়া আদায় করাকে আবশ্যক করে দিয়েছেন। বিশেষ করে মা গর্ভধারণ ও লালন-পালনের ক্ষেত্রে কষ্ট সহ্য করেন এবং বাবা সন্তানের ভরণ-পোষণ ও নিরাপত্তার জন্য নিরলস পরিশ্রম করেন।
আল্লাহর অনুগ্রহের পর মানবজীবনে পিতা-মাতার অবদানই সর্বাধিক। হাদিস শরিফে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে মানুষের কৃতজ্ঞতা আদায় করে না, সে আল্লাহরও কৃতজ্ঞতা আদায় করে না।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১১২৮০)
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তবে দুনিয়াতে তাঁদের সঙ্গে বসবাস করবে সদ্ভাবে।’ (সুরা লুকমান, আয়াত: ১৫)
এই আয়াত নাজিল হওয়ার প্রেক্ষাপট থেকে বোঝা যায় যে পিতা-মাতা যদি অন্য আদর্শ বা বিশ্বাসের (কাফির কিংবা মুশরিক) অনুসারীও হন, তবু এই পার্থিব জগতে তাঁদের সঙ্গে সদাচরণ করতে হবে, তাঁদের সেবা-যত্ন ও আর্থিক সাহায্য করতে হবে।
তবে তাঁরা যদি সন্তানদেরকে স্রষ্টার অবাধ্য বা কুফরি মতবাদ অবলম্বন করতে বলে, তবে উত্তম পন্থায় কেবল সেই নির্দেশটি প্রত্যাখ্যান করতে হবে। কারণ, হাদিসে এসেছে, ‘সৃষ্টিকর্তার নাফরমানির কাজে কোনো সৃষ্টিজীবের আনুগত্য জায়েজ নয়।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২০৬৫৬)
মুফতি ইউসুফ এমদাদী : শিক্ষক, মারকাযু ফয়জিল কোরআন আল ইসলামী, ঢাকা