নবীদের কাহিনি

দোলনায় কথা বলা অলৌকিক ৪ শিশু

শিশুর মুখে প্রথম কথা শোনার জন্য মা-বাবাকে অপেক্ষা করতে হয় দীর্ঘ সময়। অথচ আল্লাহ–তাআলা তাঁর অসীম কুদরতে এমন কিছু শিশুকে কথা বলিয়েছেন, যারা তখনো কথা বলার বয়সে উপনীত হয়নি। ইতিহাসে এমন চার শিশুর ঘটনা বিশেষভাবে আলোচিত।

১. মরিয়ম–তনয় ইসার নবুয়তের ঘোষণা

আল্লাহর কুদরতে মরিয়মের গর্ভ থেকে বাবা ছাড়া জন্মগ্রহণ করেন ইসা (আ.)। ছোট্ট শিশু ইসাকে কোলে নিয়ে তিনি লোকালয়ে ফিরে আসেন। তাঁকে ঘিরে তখন নানা অপবাদ ও প্রশ্ন।

লোকেরা মরিয়মকে ভর্ৎসনা করে জানতে চাইল, তিনি কীভাবে বাবা ছাড়া এমন সন্তান জন্ম দিলেন। মরিয়ম (আ.) কোনো জবাব না দিয়ে শিশুটির দিকে ইশারা করলেন। এতে বিস্মিত হয়ে তারা বলে উঠল, ‘দোলনার শিশুর সঙ্গে আমরা কীভাবে কথা বলব?’

কিন্তু আল্লাহর কুদরতে সেই শিশুই কথা বলে উঠলেন। তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং নবী বানিয়েছেন।’

এরপর তিনি নিজের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা তুলে ধরে জানালেন, তিনি যেখানেই থাকুন না কেন, আল্লাহ তাঁকে বরকতময় করেছেন এবং নামাজ আদায় ও জাকাত প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন।

একটি শিশুর মুখে এমন সুস্পষ্ট বক্তব্য উপস্থিত লোকদের জন্য ছিল বিস্ময়কর। যে শিশু কিছুক্ষণ আগে মাত্র জন্ম নিয়েছে, তার বক্তব্য মরিয়মের পবিত্রতার পক্ষে সুস্পষ্ট প্রমাণ হয়ে দাঁড়াল।

যাঁকে ঘিরে অপবাদ ছড়ানো হয়েছিল, আল্লাহ সেই মায়ের নিষ্কলুষতা প্রমাণ করলেন তাঁরই শিশুসন্তানের মাধ্যমে। (সুরা মরিয়ম, আয়াত: ২৯–৩৩)

ইউসুফের জামা যদি সামনের দিক থেকে ছেঁড়া হয়ে থাকে, তাহলে ইউসুফ মিথ্যা বলেছেন। আর জামা পেছন দিক থেকে ছেঁড়া হলে প্রমাণিত হবে, জুলেখা মিথ্যা বলেছেন।

২. নবী ইউসুফের ঘটনার সাক্ষী

নবী ইউসুফের জীবনের কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি ছিল জুলেখার অপবাদ। জুলেখা তাঁকে অসৎ কাজে প্রলুব্ধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইউসুফ (আ.) আল্লাহর ভয়ে তাঁর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন।

একপর্যায়ে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে জুলেখা তাঁর জামা পেছন দিক থেকে টেনে ধরেন। এতে জামাটি পেছন দিক থেকে ছিঁড়ে যায়।

এরপর জুলেখা নবী ইউসুফের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। ঠিক তখনই জুলেখার পরিবারের একজন সাক্ষী এমন একটি যুক্তি তুলে ধরেন, যা সত্য উদ্‌ঘাটনের পথ খুলে দেয়।

তিনি বলেন, ইউসুফের জামা যদি সামনের দিক থেকে ছেঁড়া হয়ে থাকে, তাহলে জুলেখা সত্য বলেছেন এবং ইউসুফ মিথ্যা বলেছেন। আর জামা পেছন দিক থেকে ছেঁড়া হলে প্রমাণিত হবে, জুলেখা মিথ্যা বলেছেন এবং ইউসুফ সত্যবাদী। (সুরা ইউসুফ, আয়াত ২৬-২৭)

দেখা গেল, জামা পেছন দিক থেকে ছেঁড়া। ফলে নবী ইউসুফ নির্দোষ প্রমাণ হলেন এবং জুলেখার অভিযোগের অসারতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তাফসিরের বর্ণনা অনুযায়ী, সাক্ষ্যদানকারী ওই ব্যক্তি ছিলেন একজন শিশু। তার বক্তব্যের মাধ্যমেই আল্লাহর নবীর পবিত্রতা প্রমাণিত হয়েছিল। (ইবনে জারির তাবারি, তাফসির আত–তাবারি, ১৬/৫৩-৫৬, মাকতাবাতু ইবনি তাইমিয়াহ, কায়রো)

৩. জুরাইজকে নির্দোষ প্রমাণকারী শিশু

বনি ইসরাইলের একজন ধার্মিক ব্যক্তি ছিলেন জুরাইজ। তিনি নির্জন স্থানে ইবাদত করতেন। এক নারী তাঁকে পাপাচারে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করলেও তিনি রাজি হননি। পরে ওই নারী এক রাখালের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে একটি সন্তানের জন্ম দেন।

এরপর তিনি অপবাদ দেন, শিশুটির বাবা জুরাইজ।

এ খবর ছড়িয়ে পড়লে লোকজন জুরাইজের ইবাদতখানা ভেঙে ফেলে। জুরাইজ তখন অজু করে নামাজ আদায় করেন। এরপর শিশুটির কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তোমার বাবা কে?’ আল্লাহর কুদরতে শিশুটি উত্তর দেয়, ‘রাখাল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪৩৬)

ঘটনাটি ফেরাউনের কাছে পৌঁছালে সে ওই সেবিকাকে ডেকে ইমান ত্যাগ করতে বলে। কিন্তু তিনি সত্যের ওপর অবিচল থাকেন। ক্ষুব্ধ ফেরাউন তাঁকে ও তাঁর সন্তানদের উত্তপ্ত তামার পাত্রে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেয়।

শিশুটির এই বক্তব্যে জুরাইজ নির্দোষ প্রমাণিত হয়। যে অপবাদে তাঁর সম্মান নষ্ট হতে বসেছিল, আল্লাহ সেই শিশুর মুখ দিয়েই তার জবাব দিলেন। মানুষের চোখে পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল মনে হোক না কেন, আল্লাহর সাহায্য এলে মুহূর্তেই সত্য প্রকাশের পথ খুলে যেতে পারে।

৪. ফেরাউন-কন্যার সেবিকার শিশু সন্তান

ফেরাউনের কন্যার চুল আঁচড়ানোর কাজ করতেন এক ইমানদার নারী। একদিন তাঁর হাত থেকে চুল আঁচড়ানোর সরঞ্জাম পড়ে গেলে তিনি ‘বিসমিল্লাহ’ বলে তা তুলে নেন। ফেরাউনের কন্যা জানতে চায়, তিনি তার বাবার নাম নিচ্ছেন কি না।

সেবিকা স্পষ্ট করে জানান, আল্লাহই তাঁর প্রতিপালক, ফেরাউন নয়।

ঘটনাটি ফেরাউনের কাছে পৌঁছালে সে ওই সেবিকাকে ডেকে ইমান ত্যাগ করতে বলে। কিন্তু তিনি সত্যের ওপর অবিচল থাকেন। ক্ষুব্ধ ফেরাউন তাঁকে ও তাঁর সন্তানদের উত্তপ্ত তামার পাত্রে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেয়।

একে একে সন্তানদের আগুনে নিক্ষেপ করা হচ্ছিল। সর্বশেষে আসে তাঁর দুধের শিশুর পালা। সন্তানের কথা ভেবে মায়ের মনে স্বাভাবিকভাবেই দ্বিধা জাগে। তখন আল্লাহর কুদরতে শিশুটি কথা বলে মাকে সাহস জোগায়। সে বলে, ‘মা, ধৈর্য ধরো। নিশ্চয়ই তুমি সত্যের ওপর আছ।’

শিশুটির এই কথা মায়ের ইমানকে আরও দৃঢ় করে। দুনিয়ার কঠিনতম মুহূর্তেও সত্যের পথ থেকে সরে না দাঁড়ানোর এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে এই ঘটনা। (আল-হাকেম, আল-মুসতাদরাক আলাস-সহিহাইন, হাদিস: ৩৮৮১)

শিক্ষণীয় বিষয়

দোলনায় কথা বলা এই চার শিশুর ঘটনা আমাদের শেখায়, আল্লাহ–তাআলার ক্ষমতা মানুষের স্বাভাবিক ধারণার ঊর্ধ্বে। তিনি চাইলে অসহায় শিশুর মুখ দিয়েও সত্য প্রকাশ করতে পারেন, নির্দোষ ব্যক্তিকে অপবাদ থেকে মুক্ত করতে পারেন এবং বিপদের মুহূর্তে মুমিনের অন্তরে সাহস জোগাতে পারেন।

তাই অন্যায়ের মুখে সত্যের ওপর অবিচল থাকা এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য।

  • নাহিদা সুলতানা: আলেমা ও প্রাবন্ধিক

    nahidasultana753375@gmail.com