সাহাবিদের কথা

৪ ধনী সাহাবি যেভাবে বদলে দেন মদিনার অর্থনীতি

সাহাবিদের মধ্যে এমন অনেকেই ছিলেন, যাঁরা শুধু সাধারণ ধনাঢ্যই ছিলেন না; বরং যাঁদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নেটওয়ার্ক মক্কা বা মদিনার সীমানা ছাড়িয়ে ইয়েমেন, সিরিয়া, ইরাক ও আবিসিনিয়া (হাবশা) পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

তবে তাঁদের অর্জিত বিপুল ধনসম্পদ কখনো ব্যক্তিগত ভোগবিলাস বা ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যবহৃত হয়নি; বরং তা ব্যবহৃত হয়েছে সমাজকল্যাণ, মানবিক পুনর্বণ্টন এবং রাষ্ট্রীয় সংকট নিরসনে। ইসলামের ইতিহাসের শীর্ষ ধনকুবের চার সাহাবির ব্যবসার ধরন, সম্পদ অর্জনের অনন্য কৌশল এবং তাঁদের সামাজিক অর্থনৈতিক দর্শনের একটি প্রামাণ্য পর্যালোচনা তুলে ধরা হলো।

মদিনার বাজারের বিস্ময়র উদ্যোক্তা

ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম সফল ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)। তাঁর প্রারম্ভিক জীবন যেকোনো ‘স্টার্টআপ’ প্রতিষ্ঠাতার জন্য এক বিস্ময়কর অনুপ্রেরণা। ৫৮০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কার কোরাইশ বংশের জোহরা গোত্রে তাঁর জন্ম।

মক্কায় তিনি ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, যিনি নিয়মিত ইয়েমেনে বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে যেতেন। সেখান থেকেই বাণিজ্যের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও বাজার ব্যবস্থাপনার গভীর বোঝাপড়া তাঁর মধ্যে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু হিজরতের সময় মক্কার সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ফেলে তাঁকে এক কাপড়ে মদিনায় পাড়ি জমাতে হয়।

মদিনায় পৌঁছানোর পর মহানবী (সা.) আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি করে দেন। আবদুর রহমানকে যুক্ত করা হয় মদিনার ধনী সাহাবি সাদ ইবনে রাবির সঙ্গে । সাদ (রা.) তাঁকে তাঁর বিপুল সম্পদের অর্ধেক এবং দুটি বড় ফলের বাগানের একটি দিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করেন।

কিন্তু আবদুর রহমান (রা.) বিনয়ের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করে যে জবাব দেন, তা আত্মনির্ভরশীল ব্যক্তিত্বের এক চিরন্তন আদর্শ। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তোমার পরিবার ও সম্পদে বরকত দিন, আমাকে শুধু বাজারের পথটি দেখিয়ে দাও।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৪৯)

খলিফা ওমর (রা.) তাঁকে প্রশ্ন করেন, “আপনার এত দ্রুত ধনসম্পদ ও ব্যবসায় বরকতের রহস্য কী?” উত্তরে তিনি তিনটি মৌলিক নীতির কথা বলেছিলেন।

মদিনার কাইনুকা বাজারে গিয়ে তিনি পনির, মাখন ও ঘি নিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করেন। তিনি সতর্কতার সঙ্গে বাজারের চাহিদা বিশ্লেষণ করে দেখলেন, দৈনন্দিন ব্যবহার্য খাদ্যের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।

খলিফা ওমর (রা.) তাঁকে প্রশ্ন করেন, “আপনার এত দ্রুত ধনসম্পদ ও ব্যবসায় বরকতের রহস্য কী?” উত্তরে তিনি তিনটি মৌলিক নীতির কথা বলেছিলেন: ১. আমি কখনো বাকিতে পণ্য বিক্রি করিনি, সর্বদা নগদে লেনদেন করেছি, ২. আমি সামান্যতম লাভও ফিরিয়ে দিইনি; অল্প লাভে দ্রুত পণ্য বিক্রি করে দিয়েছি, কৃত্রিম সংকটের অপেক্ষা করিনি, ৩. পণ্যের কোনো দোষ বা ত্রুটি থাকলে তা ক্রেতার কাছে কখনো গোপন করিনি। (ইবনে আসাকির, তারিখু দিমাশক, ৩৫/২৯০-২৯১, দারুল ফিকর, বৈরুত)

অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ঘোড়ার জিন ও ঘোড়া বাণিজ্যে আধিপত্য বিস্তার করেন। তাঁর কোনো কোনো বাণিজ্য কাফেলায় ৭০০টি পর্যন্ত পণ্যবাহী উট থাকত। ঐতিহাসিক বর্ণনানুসারে, তাঁর ইন্তেকালের পর রেখে যাওয়া চার স্ত্রীর প্রত্যেকে উত্তরাধিকারের অংশ হিসেবে ৮৪ হাজার দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) করে পেয়েছিলেন। (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাত আল-কুবরা, ৩/১২০-১২৫, দার সাদির, বৈরুত, ১৯৬৮)

এত সম্পদ সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন। একবার রোজা রেখে ইফতারের সময় সুস্বাদু খাবার সামনে এলে তিনি অঝোরে কাঁদতে শুরু করেন। শহীদ সাহাবি মুসআব ও হামজা (রা.)-এর কথা স্মরণ করে বলেন, ‘তারা আমার চেয়ে উত্তম ছিলেন, কিন্তু তারা পর্যাপ্ত কাফন পান নাই, না জানি আমাদের পরকালের পুণ্য এই দুনিয়াতেই দিয়ে দেওয়া হলো’ এ কথা বলেই তিনি খাবারের পাত্র থেকে হাত গুটিয়ে নেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১২৭৫)

বাণিজ্যের ধনসম্পদ তিনি অকাতরে মানবকল্যাণে বিলিয়ে দিতেন। বিশেষ করে সংকটকালে তিনি স্বর্ণ, ৫০০টি ঘোড়া এবং খাদ্যদ্রব্য বোঝাই ৭০০ উটের পুরো একটি বাণিজ্য কাফেলা একযোগে সদকা করে দেন। আল্লাহর রাসুল তাঁর সম্পদে বরকতের জন্য দোয়া করেছিলেন। আয়েশা (রা.) বলেন, নবীজি বলেছেন, আবদুর রহমান হামাগুড়ি দিয়ে বেহেশতে প্রবেশ করবে। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২৪৬৯৮)

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বরপুত্র

ইসলামের তৃতীয় খলিফা ওসমান ইবনে আফফান (রা.) ছিলেন অভিজাত উমাইয়া গোত্রের সন্তান। তিনি পিতার কাছ থেকেই বিপুল সম্পদ ও ব্যবসার বিস্তীর্ণ নেটওয়ার্ক উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন। তাঁর মেধা ও বদান্যতার কারণে তাঁকে ‘গনি’ বা মহাধনী উপাধি দেওয়া হয়েছিল।

ওসমানে ব্যবসা-কৌশলের মূল ভিত্তি ছিল উচ্চমূল্যের আন্তর্জাতিক পণ্য; যেমন—রেশম, মসলা, সুগন্ধি এবং মূল্যবান ধাতু। সিরিয়া ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রেশম ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাঁর ভালো যোগযোগ ছিল। বিলাসদ্রব্য ও উচ্চমূল্যের পণ্যের চাহিদা নির্দিষ্ট ধনী শ্রেণির কাছে সর্বদা অটুট থাকে—এই বাজার অর্থনীতিকে তিনি নিজের আয়তায় নিয়েছিলেন।

তাঁর সম্পদের সবচেয়ে সুন্দর ব্যবহার দেখা যায় জনকল্যাণমূলক সামাজিক ‘ওয়াকফ’ নীতিতে। মদিনায় মুসলিম মুহাজিরদের সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিলে তিনি ‘বীরে রুমা’ (রুমা নামের কুয়া) ৩৫ হাজার দিরহামের (রৌপ্যমুদ্রা) বিনিময়ে একজন ইহুদির কাছ থেকে কিনে নেন এবং তা মদিনার সব মানুষের জন্য বিনামূল্যে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে ওয়াকফ করে দেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭৭৮)

এটিই বিশ্ব ইতিহাসের প্রথম এবং আজও কার্যকর অন্যতম সামাজিক ওয়াকফ। এছাড়া তাবুক অভিযানের সময় তিনি ১ হাজার স্বর্ণমুদ্রা (দিনার), ১০০টি সুসজ্জিত ঘোড়া এবং ৯০০টি উট এককভাবে প্রদান করেছিলেন (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৭০১)

মৃত্যুর সময় জুবায়েরের কাছে ২২ লাখ দিরহামের বিশাল ঋণের বোঝা ছিল মূলত মানুষের রাখা আমানতের অর্থ। ছেলে আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.) ‘আল-গাবা’ নামক একটি বিশাল কৃষিজমি ১৬ লাখ দিরহামে বিক্রি করে সম্পূর্ণ ঋণ পরিশোধ করেন।

তাঁর শাহাদাতের সময় ব্যক্তিগত কোষাধ্যক্ষে নগদ ৩ কোটি (৩০ মিলিয়ন) দিরহাম এবং দেড় লাখ দিনার গচ্ছিত ছিল (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাত আল-কুবরা, ৩/৭, দার সাদির, বৈরুত, ১৯৬৮)

এত ধনসম্পদ ও ক্ষমতার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি ইবনু আফফান (রা.) অত্যন্ত সাদাসিধে ও বিনয়ী জীবনযাপন করতেন। সম্পদ তাঁর মধ্যে অহংকারের জন্ম দেয়নি। রাতে দাস-দাসীদের বিশ্রাম বিঘ্নিত না করে তিনি নিজেই নিজের ও পশুর পরিচর্যা করতেন এবং গভীর রাতে উঠে নামাজে মগ্ন হতেন। (ইবনে হাজার আসকালানি, আল-ইসাবাহ ফি তাময়িজিস সাহাবাহ, ৪/৩৭৭, দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, বৈরুত)

আধুনিক ব্যাংক ব্যবস্থার আদি রূপকার

জুবায়ের ইবনুল আওয়ামের অর্থনৈতিক প্রোফাইল ছিল একেবারেই ভিন্ন। তিনি প্রচলিত আমদানি-রপ্তানির চেয়ে স্থায়ী সম্পদ বা আবাসন ও জমি খাতে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করেছিলেন। মদিনায় তাঁর ১১টি বাড়ি ছিল; এছাড়া বসরা, কুফা, ফুসতাত (মিসর) এবং আলেকজান্দ্রিয়ায় তাঁর বিশাল সব স্থায়ী সম্পত্তি ছিল।

তিনি তৎকালীন সমাজে এক অভিনব ‘আমানত’ বা ইসলামি ব্যাংকিং মডেলের প্রবর্তন করেন। মানুষ তাঁর সততায় মুগ্ধ হয়ে সঞ্চিত অর্থ আমানত হিসেবে রাখতে আসত। তিনি বলতেন, ‘না, এটি আমানত হিসেবে নয়; বরং আমি তা ঋণ (কর্জে হাসানা) হিসেবে গ্রহণ করছি। কারণ, আমি ভয় পাই যে আমানত গচ্ছিত রাখলে তা নষ্ট বা চুরি হতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩১২৯)

এর ফলে দুটি সুবিধা হতো, প্রথমত, ঋণদাতার অর্থ আইনগতভাবে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকত; দ্বিতীয়ত, জুবায়ের (রা.) সেই অলস অর্থ নিজের ব্যবসায় স্বাধীনভাবে বিনিয়োগ করে লাভবান হতে পারতেন।

মৃত্যুর সময় তাঁর কাছে ২২ লাখ দিরহামের বিশাল ঋণের বোঝা ছিল মূলত মানুষের রাখা সেই আমানতের অর্থ। ছেলে আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.) ‘আল-গাবা’ নামক একটি বিশাল কৃষিজমি ১৬ লাখ দিরহামে বিক্রি করে সম্পূর্ণ ঋণ পরিশোধ করেন।

ঋণ শোধের পর তাঁর চার স্ত্রী ১২ লাখ দিরহাম করে পান এবং নিট বণ্টনের জন্য রেখে যাওয়া মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ কোটি ২ লাখ (৫০.২ মিলিয়ন) দিরহাম। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩১২৯)

মেগা কৃষিখাত ও গতিশীল বিনিয়োগের পথিকৃৎ 

তালহা ইবনে ওবাইদুল্লাহ (রা.) ছিলেন বস্ত্র ব্যবসা ও মেগা কৃষি খাতের পথিকৃৎ। বিশেষ করে তৎকালীন ইরাকে তিনি গম চাষের বিশাল প্রকল্প হাতে নেন, যা থেকে তাঁর দৈনিক প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ স্বর্ণমুদ্রা (দিনার) আয় হতো।

খাইবার থেকে প্রাপ্ত উর্বর জমি তিনি কৌশলগতভাবে পরিবর্তন (ল্যান্ড সোয়াপ) করে ইরাক ও হাদরামাউতে আরও অধিক লাভজনক কৃষিজমিতে রূপান্তর করেছিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর নিট সম্পদের মূল্য ছিল প্রায় ৩ কোটি দিরহাম। তিনি এত বেশি দান করতেন যে মহানবী (সা.) তাঁকে ‘তালহা আল-ফাইয়াজ’ (অবারিত দানশীল তালহা) উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৭৪২)

সাহাবিদের জীবনে সম্পদ ছিল একটি ‘আমানত’ এবং সমাজহিতৈষী মাধ্যম। সাহাবিরা অর্থ উপার্জন করতেন ঠিকই, কিন্তু তা হৃদয়ে স্থান না দিয়ে শুধু হাতে রাখতেন।

ধনী সাহাবিদের মানবিক দর্শন

সে সময় এক দিনারে ৪.৫ গ্রাম স্বর্ণ থাকত এবং এক দিনার দিয়ে একটি বকরি কেনা যেত এবং পরিমাণভেদে ১২ থেকে ২০ দিরহাম সমান ছিল এক দিনার। তাতে অনুমিত হয়, ধনী সাহাবিদের সম্পদের পরিমাণ এ যুগের হিসাবে ছিল বিলিয়ন ডলারের সমান।

সাহাবিদের এই বিপুল সম্পদের প্রামাণ্য বিবরণ একটি প্রশ্ন উত্থাপন করে, ইসলাম কি ধন সঞ্চয়কে উৎসাহিত করে? পবিত্র কোরআনের অর্থনৈতিক দর্শন স্পষ্ট করে যে ইসলামে বৈষম্যহীন উপায়ে সম্পদ অর্জন এবং হালাল পন্থায় সম্পদশালী হওয়া ইবাদত।

আধুনিক পুঁজিবাদে সম্পদ অর্জনের প্রধান লক্ষ্য হলো ব্যক্তিগত ভোগ, বিলাসিতা ও বৈষম্য সৃষ্টি। কিন্তু সাহাবিদের জীবনে সম্পদ ছিল একটি ‘আমানত’ এবং সমাজহিতৈষী মাধ্যম। সাহাবিরা অর্থ উপার্জন করতেন ঠিকই, কিন্তু তা হৃদয়ে স্থান না দিয়ে শুধু হাতে রাখতেন।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যাতে তোমাদের বিত্তশালীদের মধ্যেই শুধু সম্পদ আবর্তন না করে।’ (সুরা হাশর, আয়াত: ৭)

এই নির্দেশেরই বাস্তব প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন সাহাবিরা। জাকাত, সদকা ও ওয়াকফের মাধ্যমে সাহাবিদের বিপুল সম্পদ মদিনার সমাজের সচ্ছলতা নিশ্চিত করেছিল। আধুনিক অর্থনীতি যেখানে সম্পদ মাপে ‘কতটা জমল’ তা দিয়ে, মদিনার এই চার সাহাবির জীবনে সম্পদ মাপা হতো—‘কতটা মানুষের কল্যাণে ব্যয় হলো’ তা দিয়ে।

  • তাশরিফ আহমাদ: আলেম, লেখক ও গবেষক