মহান আল্লাহ মানুষকে ভারসাম্যপূর্ণ এক জাতি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এবং দান করেছেন ইসলামের মতো একটা ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। কোরআনে তিনি অবিশ্বাসী আর অকৃতজ্ঞ মানুষের নিন্দা করেছেন। তেমনি আরও একটা দল আছে, যাদের বলা হয় মুসরিফিন—সীমালঙ্ঘনকারী বা অপব্যয়কারী।
সহজ কথায়, যারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু করে, তাদের কাজকেই বলা হয় ‘ইসরাফ’। শব্দটা শুনতে কিছুটা অপরিচিত মনে হলেও খুব সম্ভবত আমরা প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো ক্ষেত্রে ইসরাফ করি—আবেগে, খাবারে, কেনাকাটায়, বিনোদনে, এমনকি ইবাদতেও।
ইসলাম মানুষকে আবেগহীন হতে বলে না। ভালোবাসা, রাগ, কষ্ট, আনন্দ—এসব স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতি। সমস্যা তখনই হয়, যখন তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
নিয়ন্ত্রণহীন রাগ পরিস্থিতিকে খারাপের দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু উল্টো দিকে, অতিরিক্ত চুপ থাকাও কম ক্ষতিকর নয়। অনেক সময় আমরা ভাবি, অন্যায়ের মুখে চুপ থাকাটাই ধৈর্যের পরীক্ষা—আর এই ভাবনায় চুপ থেকে থেকে অন্যায়কারীর অন্যায় আরও বাড়তে দিই। এটাও একরকম ইসরাফ।
ইসরাফ মানে শুধু খাবার ফেলে দেওয়া নয়, প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার রান্না করা বা গ্রহণ করাও ইসরাফ। পারিবারিক অনুষ্ঠানে প্লেটে বাড়তি খাবার নেওয়াটা আমাদের কাছে একরকম অভ্যাসেই পরিণত হয়েছে।
কোরআন আমাদের শিখিয়েছে, আমরা সর্বোত্তম উম্মত, যাদের দায়িত্ব সৎ কাজের আদেশ দেওয়া আর অন্যায় থেকে নিষেধ করা। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১১০)
তেমনি অতিরিক্ত ভালোবাসা বা আসক্তিও একপর্যায়ে মানুষকে সত্য-মিথ্যার বিচার করার ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করতে পারে। অতিরিক্ত শোক, ভয় বা উদ্বেগও এই একই তালিকায় পড়ে।
ইসরাফ মানে শুধু খাবার ফেলে দেওয়া নয়, প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার রান্না করা বা গ্রহণ করাও ইসরাফ। দাওয়াতে বা পারিবারিক অনুষ্ঠানে প্লেটে বাড়তি খাবার নেওয়াটা আমাদের কাছে একরকম অভ্যাসেই পরিণত হয়েছে।
এমনকি রমজানের সাহ্রি-ইফতারেও—যে মাসটা মূলত আত্মসংযমের মাস; আমরা প্রায়ই ইবাদতের চেয়ে খাবারের আয়োজনেই বেশি মনোযোগী হয়ে পড়ি।
আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় কোরো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১)
নবীজি (সা.) পরিমিত খাওয়ার শিক্ষা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, পাকস্থলীর এক-তৃতীয়াংশ খাদ্যের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য আর এক-তৃতীয়াংশ শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য খালি রাখা উচিত এবং মানুষ তার পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট আর কোনো পাত্র পূর্ণ করে না। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৮০)
সময়ের অপচয় আজকের দিনের একটা বড় সমস্যা। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নেয়ামতের বিষয়ে অধিকাংশ মানুষ ধোঁকায় পড়ে আছে—সুস্থতা ও অবসর।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৪১২)
বিনোদন নিজে হারাম নয়—বিশ্রাম, খেলাধুলা, পরিবারকে সময় দেওয়া বা বৈধ আনন্দ ইসলামে অনুমোদিত। সমস্যাটা তখন হয়, যখন আমরা বিনোদনে এমনভাবে মগ্ন হয়ে যাই যে তা আমাদের ইবাদত, পরিবার আর দায়িত্ব থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
আল্লাহর শপথ, আমি তোমাদের চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভয় করি, আর তাঁকে বেশি জানি। আমি প্রতিদিন রোজা রাখি না, সারা রাত নামাজ পড়ি না, স্ত্রীসঙ্গও গ্রহণ করি। যে আমার পথ অনুসরণ করে না, সে আমার দলভুক্ত নয়।সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৬৩
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানো বা নিরুদ্দেশ আড্ডা দেওয়া—দেখতে বিনোদন মনে হলেও আসলে এগুলো এখন আমাদের সময় অপচয়ের অন্যতম বড় মাধ্যম।
নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটায় ইসলামে কোনো নিষেধ নেই। ইসরাফ তখনই হয়, যখন প্রয়োজন বা সামর্থ্যের সীমা ছাড়িয়ে খরচ করা হয়। অনলাইন শপিংয়ের সহজলভ্যতার কারণে এই প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে—পছন্দ হলেই কিনে ফেলা কিংবা স্রেফ ছাড়ের লোভে অপ্রয়োজনীয় জিনিস জমিয়ে রাখা।
আল্লাহ বলেছেন, ‘নিশ্চয় অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ২৭), আর মুমিনদের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে, ‘যখন তারা ব্যয় করে, তখন অপব্যয় করে না, কৃপণতাও করে না; বরং এই দুয়ের মধ্যবর্তী পথ ধরে।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৬৭)
আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া, অতিথি আপ্যায়ন বা সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়া—এসব ইসলামে উৎসাহিত করা কাজ। কিন্তু সামাজিক মর্যাদা দেখানোর জন্য সামর্থ্যের বাইরে খরচ করা, বিয়ে-অনুষ্ঠানে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় করা বা সামাজিক চাপে ঋণ করে ফেলা—এসবও ইসরাফ।
সামাজিকতা রক্ষা করাটা সমস্যা নয়; সমস্যা হলো তার নামে সীমালঙ্ঘন আর প্রদর্শন। ইসলাম আমাদের শেখায় এমন সামাজিকতা, যা আন্তরিক এবং পরিমিত।
অবাক লাগলেও সত্যি— ইবাদতের ক্ষেত্রেও বাড়াবাড়ি হতে পারে। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘ইসলাম ধর্ম অত্যন্ত সহজ। যে এতে কঠোরতা করতে যাবে, ধর্মই তার ওপর প্রবল হয়ে যাবে। তোমরা মধ্যপন্থা অবলম্বন করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৯)
পরিবারকে সময় না দিয়ে সারা দিন কোরআন পড়াটাও এক রকম ইসরাফ হতে পারে—কারণ, কোরআনই আমাদের শেখায়, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালনও ইবাদতের অংশ।
কোনো নেতিবাচক ঘটনায় অতিরিক্ত মনোযোগ দিয়ে নিজেকে কষ্টে ফেলাটাও ইসরাফ; এমনকি হাসিঠাট্টায় সারাক্ষণ ডুবে থেকে অন্যের অনুভূতি বুঝতে না পারাটাও।
এ বিষয়ে একটা সুন্দর হাদিস আছে। তিন সাহাবি একবার নবীজির স্ত্রীদের কাছে এসে তাঁর ইবাদতের কথা জানতে চাইলেন এবং নিজেরা সিদ্ধান্ত নিলেন—সারা রাত নামাজ পড়বেন, রোজা রাখবেন প্রতিদিন, বিয়েই করবেন না।
এ কথা শুনে নবীজি (সা.) বললেন, ‘আল্লাহর শপথ, আমি তোমাদের চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভয় করি, আর তাঁকে বেশি জানি। আমি প্রতিদিন রোজা রাখি না, সারা রাত নামাজ পড়ি না, স্ত্রীসঙ্গও গ্রহণ করি। যে আমার পথ অনুসরণ করে না, সে আমার দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৬৩)
ইসরাফ ধরা পড়ে তখনই, যখন আমরা নিজের জীবনের দিকে সতর্ক দৃষ্টি দিই—কোথায় বেশি মনোযোগ দিচ্ছি, কোথায় একদমই দিচ্ছি না। কোনো নেতিবাচক ঘটনায় অতিরিক্ত মনোযোগ দিয়ে নিজেকে কষ্টে ফেলাটাও ইসরাফ; এমনকি হাসিঠাট্টায় সারাক্ষণ ডুবে থেকে অন্যের অনুভূতি বুঝতে না পারাটাও।
সন্তান পালনে বা ভালোবাসা প্রকাশেও এই বাড়াবাড়ি হতে পারে। প্রতিটা বাড়াবাড়িই জীবনের গতিপথ একটু একটু করে বদলে দেয়, আর শেষে এসে দাঁড়ায় উদ্বেগ আর মানসিক অশান্তিতে।
কোরআনে অতীতের বিশ্বাসীদের একটা দোয়ার কথা আছে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের পাপ ক্ষমা করো, আমাদের কাজে যে সীমালঙ্ঘন হয়েছে তা ক্ষমা করো, আমাদের দৃঢ়পদ রাখো, আর কাফেরদের মোকাবিলায় আমাদের সাহায্য করো।’ (সুরা আলে-ইমরান, আয়াত ১৪৭)
এই একটা দোয়ার মধ্যেই চারটা ধাপ আছে—গুনাহর ক্ষমা চাওয়া, বাড়াবাড়ির জন্য ক্ষমা চাওয়া, লক্ষ্যে স্থির থাকার দোয়া, আর শেষে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া।
সাদিয়া শারমীন : লেখক ও সংবাদকর্মী