ব্যক্তিত্ব

যিনি ইসলামি আইনকে সুসংগঠিত রূপ দিয়েছিলেন

ইতিহাসে যাঁরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাস, চিন্তা ও ধর্মচর্চাকে আলোড়িত ও প্রভাবিত করেছেন, ইমাম আবু হানিফা (রহ.) তেমনই এক মনীষী।

ফিকহশাস্ত্রের বিকাশ, ইজতিহাদের ধারা প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামি আইনকে সুসংগঠিত রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনন্য। তাঁর জীবন শুধু একজন ফকিহের জীবনী নয়; বরং জ্ঞানসাধনা, নৈতিক দৃঢ়তা, স্বাধীনচেতা মনোভাব এবং সত্যের প্রতি আপসহীন অবস্থানের এক অনন্য ইতিহাস।

জন্ম ও পরিচয়

ইমাম আবু হানিফার মূল নাম নু’মান ইবনে সাবিত। তাঁর বংশপরিচয় নিয়ে কিছু ঐতিহাসিক আলোচনা থাকলেও অধিকাংশ নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিকের মতে, তাঁর পূর্বপুরুষ ‘যুত্বা’ ছিলেন বানু তাইমুল্লাহ ইবনে সা’লাবা গোত্রের মুক্ত দাস।

‘আবু হানিফা’ তাঁর আসল নাম নয়। এই উপনামের উৎপত্তি নিয়েও চমৎকার ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ রয়েছে। কুফার আঞ্চলিক ভাষায় লিখনের দোয়াতকে ‘হানিফা’ বলা হতো।

তবে তাঁর নাতি ইসমাইলের বর্ণনানুসারে তাঁদের পরিবারের কেউ কখনো দাসত্বে আবদ্ধ ছিলেন না। দুই বর্ণনার সমন্বয়ে এটি স্পষ্ট যে পূর্বপুরুষ সূত্রে দাসত্বের সম্পর্ক থাকলেও তাঁর পিতা সাবিত কিংবা তিনি নিজে পূর্ণ স্বাধীন ও সম্মানজনক পরিবারের সন্তান ছিলেন। (খতিব বাগদাদি, তারিখে বাগদাদ, ১৫/৫৩, দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, বৈরুত)

‘আবু হানিফা’ তাঁর আসল নাম নয়। এই উপনামের উৎপত্তি নিয়েও চমৎকার ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ রয়েছে। কুফার আঞ্চলিক ভাষায় লিখনের দোয়াতকে ‘হানিফা’ বলা হতো। লেখালেখির প্রতি ব্যাকুল অনুরাগের কারণে তিনি সর্বদা সঙ্গে দোয়াত-কলম রাখতেন বলেই মানুষ তাঁকে ‘আবু হানিফা’ (দোয়াতের মালিক) বলে ডাকতে শুরু করে।

অন্য মতে, একনিষ্ঠ ইসলামি অনুশাসনের প্রতি অকৃত্রিম সমর্পণের (হানিফ) কারণে তিনি এই অভিধায় ভূষিত হন। (ইবনে হাজার হাইতামি, আল-খাইরাতুল হিসান ফি মানাকিবি আবিল হানিফাতান নুমান, পৃষ্ঠা: ৬০)

৮০ হিজরিতে ইরাকের সমৃদ্ধ কুফা নগরীতে তাঁর জন্ম। তাঁর পূর্বপুরুষের আদি নিবাস হিসেবে আফগানিস্তানের কাবুলের নাম সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। (আখবারু আবি হানিফা ওয়া আসহাবিহি, পৃষ্ঠা: ১৬-১৭)

তাবেয়ি হিসেবে বিশেষ মর্যাদা

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও সুরুচিপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। মধ্যম গড়নের সুগঠিত চেহারার এই মহামানব পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবোধে ছিলেন অতুলনীয়। তাঁর আভিজাত্যপূর্ণ পোশাক ও চমৎকার সুবাসিত জীবনের সুখ্যাতি ছিল।

ইতিহাসবিদদের মতে, তিনি এত সুগন্ধি ব্যবহার করতেন যে, তিনি কোনো গলি দিয়ে হেঁটে গেলে মানুষ সুবাস পেয়েই বলে দিত—এ পথ দিয়ে নিশ্চয়ই আবু হানিফা অতিক্রম করেছেন। তিনি প্রয়োজন ছাড়া কথা বলতেন না; তবে কোনো বিষয়ে কথা বললে প্রজ্ঞা ও সুগভীর চিন্তার দ্যুতি ঠিকরে উঠত। (আখবারু আবি হানিফা ওয়া আসহাবিহি, পৃষ্ঠা: ৩৭)

তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক মর্যাদা হলো—তিনি ছিলেন একজন প্রবীণ ‘তাবেয়ি’। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পিতার সঙ্গে পবিত্র হজ পালনকালে তিনি প্রখ্যাত সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে হারেস ইবনে জুজ’ (রা.)-এর সাক্ষাৎ পান এবং হাদিস শ্রবণ করেন।

এছাড়া আনাস ইবনে মালিকসহ একাধিক সাহাবির সাক্ষাৎ ও তাঁদের সান্নিধ্য লাভের ভাগ্য তাঁর হয়েছিল। (তারিখে বাগদাদ, ১৩/৩৩১)

ইসলামি অন্যান্য সব বিদ্যায় অগাধ পাণ্ডিত্য থাকা সত্ত্বেও তিনি ফিকহকেই জীবনের মূল সাধনা হিসেবে গ্রহণ করার কারণ হিসেবে বলতেন—এটি মানুষের পার্থিব জীবন ও পরকালের নাজাত নিশ্চিত করার জন্য সরাসরি কার্যকর শাস্ত্র।

জ্ঞানসাধনা

ইমাম আবু হানিফার শিক্ষাজীবন ছিল ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময়। বর্ণিত রয়েছে, তিনি প্রায় চার হাজার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উস্তাদের কাছে জ্ঞানার্জন করেছেন। প্রারম্ভিক জীবনে তিনি একজন অত্যন্ত সফল কাপড়ের ব্যবসায়ী ছিলেন।

কিন্তু সময়ের মহান ফকিহ ইমাম শাবির তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণে তাঁর অসামান্য বুদ্ধিমত্তা ধরা পড়ে এবং তাঁরই পরামর্শে ইমাম ব্যবসা সামলে পুরোদমে জ্ঞানচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। প্রথমে দর্শনশাস্ত্র (ইলমুল কালাম) ও বিভিন্ন রাজনৈতিক-ধর্মীয় ভ্রান্ত মতবাদের খণ্ডনে দক্ষতা অর্জন করলেও দ্রুতই তিনি অনুধাবন করেন যে, সাহাবি ও তাবেয়িদের প্রধান পথ ছিল বিশুদ্ধ ফিকহ ও সামাজিক সেবা।

তাঁকে ফিকহশাস্ত্রে স্থায়ী করার পেছনে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা রয়েছে। এক নারী তাঁকে তালাক সংক্রান্ত একটি জটিল বিধান জিজ্ঞেস করলে তিনি তৎক্ষণাৎ তা বলতে না পেরে প্রশ্নকর্তাকে ফকিহ হাম্মাদ ইবনে সোলাইমানের দরবারে পাঠান।

পরে সেই মাসআলার উত্তর শুনে তিনি বুঝতে পারেন বাস্তব জীবনে ফিকহচর্চার প্রয়োজনীয়তা কতটা গভীর। এরপর টানা ১০ বছর হাম্মাদের দরসে বসেন এবং নিজেকে ফিকহের অনন্য পণ্ডিত হিসেবে গড়ে তোলেন। (আল-খাইরাতুল হিসান, পৃষ্ঠা: ৭৫)

ইসলামি অন্যান্য সব বিদ্যায় (তাফসির, হাদিস, সাহিত্য) অগাধ পাণ্ডিত্য থাকা সত্ত্বেও তিনি ফিকহকেই জীবনের মূল সাধনা হিসেবে গ্রহণ করার কারণ হিসেবে বলতেন—এটি মানুষের পার্থিব জীবন ও পরকালের নাজাত নিশ্চিত করার জন্য সরাসরি কার্যকর শাস্ত্র। (আল-খাইরাতুল হিসান, পৃষ্ঠা: ৭৬)

কুফার মেধা কেন্দ্রে

উস্তাদ হাম্মাদ ইবনে সোলাইমানের ইন্তেকালের পর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) কুফার প্রধান জ্ঞানপীঠের প্রধান হিসেবে স্থলাভিষিক্ত হন। তাঁর দরস পুরো মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান গবেষণা কেন্দ্রে পরিণত হয়।

তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো, তিনিই ইতিহাসের প্রথম প্রাজ্ঞ আলেম, যিনি ফিকহশাস্ত্রকে সুনির্দিষ্ট অধ্যায়, অনুচ্ছেদ (যেমন: তাহারাত, সালাত, বুয়ু/ব্যবসা-বাণিজ্য) ও বিষয়াভিভাগে বিন্যস্ত করেন। এছাড়া তিনি ‘ফিকহি শুরা’ বা যৌথ গবেষণা পরিষদ গঠন করে সমকালীন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য আইনি জটিলতার যৌক্তিক সমাধান তৈরি করেছিলেন।

তাঁর দরস থেকেই তৈরি হয়েছিলেন মুসলিম সভ্যতার রূপকারেরা। তাঁর ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শায়বানি, ইমাম জুফার, হাসান ইবনে জিয়াদ এবং আবদুল্লাহ ইবনে মোবারকের মতো বিশ্ববরেণ্য পণ্ডিতেরা তাঁর ফিকহি ধারা ও গবেষণা পদ্ধতিকে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে দেন। এর ফলেই কালক্রমে ‘হানাফি ফিকহ’ মুসলিম বিশ্বের সর্বাধিক প্রসারিত আইনি ব্যবস্থায় পরিণত হয়। (তারিখে বাগদাদ, ১৩/৩৩৪)

তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বাগদাদে শোকের ছায়া নেমে আসে। জানাজায় বিপুল মানুষের ঢল নামে এবং পরপর ছয়বার জানাজার নামাজ আদায় করতে হয়েছিল।

সমকালীন মনীষীদের মূল্যায়ন

ইমাম মালেক (রহ.) বলেন, ‘তিনি এমন এক দূরদর্শী পুরুষ ছিলেন, যিনি যদি এই কাঠের স্তম্ভটিকে সোনা বলে দাবি করতেন, তবে যুক্তির প্রামাণ্যতায় তা প্রমাণ করে ছাড়তেন!’

ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বিখ্যাত উক্তি করেন, ‘ফিকহশাস্ত্রে গভীরতা অর্জন করতে চাইলে সমগ্র মানবজাতিকে আবু হানিফার মুখাপেক্ষী হতে হবে।’

অন্যদিকে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) তাঁকে মেধা ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে অনন্য যুগের শ্রেষ্ঠ ইমাম হিসেবে স্মরণ করেছেন (তারিখে বাগদাদ, ১৩/৩৩৫)

নৈতিক দৃঢ়তা ও অমলিন প্রস্থান

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) নিজে বেশ ধনী ব্যবসায়ী ছিলেন। অভাবী আলেম ও শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বৃত্তি দিতেন, কিন্তু শাসক কিংবা কারো ব্যক্তিগত উপঢৌকন বা সরকারি সুবিধা কখনো গ্রহণ করতেন না।

আব্বাসীয় খলিফা আবু জাফর মনসুর তাঁকে রাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতির পদ গ্রহণের চাপ দেন। কিন্তু নিরপেক্ষতা অক্ষুণ্ন রাখা এবং বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার অঙ্গীকার থেকে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ফলশ্রুতিতে তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয় এবং প্রতিদিন চাবুকপেটা করা হয়। নির্যাতন সহ্য করেও তিনি নীতির প্রশ্নে বিন্দুমাত্র আপস করেননি।

বহু ঐতিহাসিক বর্ণনানুসারে, অবশেষে বন্দী অবস্থাতেই তাঁকে বিষপ্রয়োগ করা হয়। ১৫০ হিজরিতে জ্ঞানচর্চার এই মহান সাধক সেজদারত অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বাগদাদে শোকের ছায়া নেমে আসে।

জানাজায় বিপুল মানুষের ঢল নামে এবং পরপর ছয়বার জানাজার নামাজ আদায় করতে হয়েছিল।

  • আহমাদ সাব্বির: আলেম ও লেখক