মানুষ শুধু দৃশ্যমান দেহ নিয়ে বেঁচে থাকে না, তার একটি আত্মাও আছে। দেহের সুস্থতার জন্য যেমন নিয়মিত খাদ্যের প্রয়োজন, তেমনি আত্মার সতেজতার জন্য প্রয়োজন সঠিক পুষ্টির। আর আত্মার সর্বোত্তম পুষ্টি হলো পবিত্র কোরআন।
পবিত্র কোরআন মানুষের অন্তরকে জীবন্ত রাখে, তাকে অনাবিল প্রশান্তি দেয় এবং সঠিক পথের দিশা দেখায়। কোরআনের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যত নিবিড় ও গভীর হয়, তার যাপিত জীবন ততই অর্থবহ, সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময় দুশ্চিন্তা, হতাশা, ভয় কিংবা অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়। তখন সে নানাভাবে মানসিক প্রশান্তি খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু পৃথিবীর কোনো সম্পদ, জাগতিক সম্পর্ক বা বৈষয়িক অর্জনই হৃদয়ের গভীর শূন্যতা স্থায়ীভাবে পূরণ করতে পারে না।
কোরআন মানুষকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে সবকিছুর মালিক একমাত্র আল্লাহ। তিনিই সংকটের রব, তিনিই স্বস্তি দিতে পারেন। তাঁর ইচ্ছা ছাড়া কোনো বিপদ আসে না এবং তাঁর রহমত ছাড়া কোনো দুঃখ স্থায়ী হয় না। এই বিশ্বাসই একজন মুমিনের অন্তরে অটল প্রশান্তি সৃষ্টি করে।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা রা’দ, আয়াত: ২৮)
কোরআন মানুষকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে সবকিছুর মালিক একমাত্র আল্লাহ। তিনিই সংকট দেন, স্বস্তিও তিনিই দিতে পারেন। তাঁর ইচ্ছা ছাড়া কোনো বিপদ আসে না।
জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে মানুষকে নানা সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা, কোন পথে কল্যাণ, আর কোন পথে ধ্বংস—এসব নির্ধারণ করতে গিয়ে মানুষ অনেক সময় বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
পবিত্র কোরআন সেই বিভ্রান্তির অন্ধকারে আলোর প্রদীপ হয়ে পথ দেখায়। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই কোরআন এমন পথ প্রদর্শন করে, যা সর্বাধিক সরল ও সঠিক।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ৯)
যে ব্যক্তি নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত করে এবং এর অর্থ নিয়ে চিন্তা করে, তার বিবেক জাগ্রত হয়। তখন সে স্রেফ আনুষ্ঠানিক ইবাদতের ক্ষেত্রেই নয়, বরং পরিবার, সমাজ ও কর্মজীবনের প্রতিটি জটিল সিদ্ধান্তেও কোরআনের অনুপম দিকনির্দেশনা খুঁজে পায়।
কোরআনের প্রতিটি আয়াতে যেমন রয়েছে জ্ঞান, হেদায়েত ও জীবন পরিচালনার নির্দেশিকা, তেমনি এর প্রতিটি হরফ তেলাওয়াতের মধ্যেও রয়েছে বিপুল পুণ্যের সুসংবাদ।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি অক্ষর পাঠ করে, তার জন্য একটি নেকি লেখা হয়। আর প্রতিটি নেকি ১০ গুণ বৃদ্ধি করা হয়। আমি বলি না যে “আলিফ-লাম-মিম” একটি অক্ষর, বরং আলিফ একটি অক্ষর, লাম একটি অক্ষর এবং মীম একটি অক্ষর।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৯১০)
আপনই হোক না কেন, মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে এসব সম্পর্কের অবসান ঘটে। কিন্তু কোরআনের সঙ্গে যে নিভৃত সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তা মৃত্যুর পরও চিরন্তন কল্যাণ বয়ে আনে।
মানুষ যখন কোরআন থেকে দূরে সরে যায়, তখন তার অন্তর ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে পড়ে। পাপকে তখন আর পাপ বলে মনে হয় না, বরং তা স্বাভাবিক বলে মনে হতে থাকে। একই সঙ্গে ইবাদতের প্রতি আন্তরিক আগ্রহও কমে যায়।
নিয়মিত কোরআন পাঠ এই মৃতপ্রায় অন্তরকে জাগ্রত করে। আল্লাহর বাণী বারবার পাঠ করতে করতে মানুষ নিজের ভুলগুলো উপলব্ধি করতে শেখে এবং পাপ থেকে ফিরে আসার মানসিক শক্তি পায়।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই এই অন্তরগুলোতেও মরিচা ধরে, যেমন লোহার ওপর মরিচা ধরে।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘আল্লাহর রাসুল, এটি পরিষ্কার করার উপায় কী?’ তিনি বললেন, ‘মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করা এবং কোরআন পাঠ করা।’ (বায়হাকি, শুয়াবুল ইমান, হাদিস: ২০১৪)
দুনিয়ার সব সম্পর্কই ক্ষণস্থায়ী। ধনসম্পদ, আত্মীয়স্বজন কিংবা বন্ধুবান্ধব—যত আপনই হোক না কেন, মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে এসব সম্পর্কের অবসান ঘটে।
কিন্তু কোরআনের সঙ্গে যে নিভৃত সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তা মৃত্যুর পরও চিরন্তন কল্যাণ বয়ে আনে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কোরআন পাঠ করো। কেননা কেয়ামত দিবসে এটি তার পাঠকারীদের জন্য সুপারিশকারী হিসেবে উপস্থিত হবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮০৪)
রায়হান আল ইমরান : গবেষক ও প্রাবন্ধিক