চারদিক থেকে বিপদ ঘিরে ধরেছে। দুশ্চিন্তায় প্রাণ ওষ্ঠাগত। চাকরিটা চলে গেল। সম্পর্কটা ভেঙে পড়ল। শরীরে রোগ বাসা বাঁধল। যে মানুষটাকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করতেন, সে পিঠে ছুরি মারল।
একাকী বসে বসে ভাবছেন, এই বিপদ থেকে মুক্তি লাভের কোনো পথ কি আছে?
গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ যখন চরম বিপদে পড়ে তখন তার মস্তিষ্ক দুটি পথের একটি বেছে নেয়। হয় সে ভেঙে পড়ে, নয়তো সে এমন একটি উচ্চতর শক্তির কাছে আশ্রয় খোঁজে, যা তার নিজের সামর্থ্যের বাইরে। যাঁরা বিশ্বাসের আশ্রয় নেন, তাঁদের মানসিক প্রশান্তি পুনরুদ্ধারের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। (Pargament, K. I. et al., 2004, American Psychologist, 59/1, আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, ওয়াশিংটন ডিসি)
নবী ইউনুসের কথা ভাবুন। গভীর সমুদ্র, মাছের পেটে দমবন্ধ অবস্থা, তিন স্তরের ঘুটঘুটে অন্ধকার। সমুদ্রের অন্ধকার, রাতের অন্ধকার, মাছের পেটের অন্ধকার। এখান থেকে বের হওয়া মানবীয় দৃষ্টিতে অসম্ভব।
কোরআন দুজন নবীর কথা বলছে যাঁদের বিপদ ছিল আলাদা, কিন্তু মুক্তির পথ ছিল এক। দুজনেই ফিরে এসেছিলেন।
নবী ইব্রাহিম (আ.)-এর কথা ভাবুন। নমরুদ তাঁকে আগুনে ছুড়ে দিল। সেই আগুন এতটাই বিশাল ও ভয়াবহ ছিল যে কাছে যাওয়ার উপায় ছিল না, দূর থেকে উৎক্ষেপণ যন্ত্র দিয়ে নিক্ষেপ করতে হলো। মানবীয় দৃষ্টিতে এখানে বাঁচার কোনো পথ নেই।
কিন্তু আল্লাহ সুরা আম্বিয়ায় বলেন, ‘আমি বললাম, হে আগুন, ইব্রাহিমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৬৯)
এই আয়াতে শব্দ দুটি খেয়াল করুন। ‘বারদান’ মানে শীতল। ‘সালামান’ মানে নিরাপদ। আল্লাহ শুধু আগুনের তাপ কমিয়ে দেননি, আগুনকে পুরোপুরি নিরাপদ করে দিয়েছেন। মানে আল্লাহ শুধু সহজ করেন নি, পরিস্থিতির ধর্মই বদলে দিয়েছেন।
আপনার জীবনে যে আগুন আছে, তার স্বভাবও আল্লাহ বদলে দিতে পারেন।
এবার নবী ইউনুসের কথা ভাবুন। গভীর সমুদ্র, মাছের পেটে দমবন্ধ অবস্থা, তিন স্তরের ঘুটঘুটে অন্ধকার। সমুদ্রের অন্ধকার, রাতের অন্ধকার, মাছের পেটের অন্ধকার। এখান থেকে বের হওয়া মানবীয় দৃষ্টিতে অসম্ভব।
কিন্তু ইউনুস (আ.) সেখানে থেকেও আল্লাহকে স্মরণ করলেন। তিনি দোয়া করলেন। একটা খুবই সুপরিচিত দোয়া পড়লেন, ‘লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জালিমিন’ (তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তুমি পবিত্র, নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম)।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৭)
এই একটি দোয়ায় তিনটি জিনিস আছে।
প্রথমত: এটা তাওহিদের স্বীকৃতি। মাছের পেটেও তিনি ভুলে যাননি যে ক্ষমতার মালিক কে।
দ্বিতীয়ত: ‘সুবহানাকা’ মানে তুমি পবিত্র। এটা আল্লাহর প্রশংসা। বিপদের মাঝেও তিনি অভিযোগ করেননি, প্রশংসা করেছেন।
তৃতীয়ত: ‘আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম’ বলে নিজের ভুল স্বীকার করেছেন। কোনো অজুহাত নেই, কোনো আত্মপক্ষ সমর্থন নেই।
১. দোয়া পড়া: মুক্তি সবার জন্য উন্মুক্ত। আল্লাহ বলেন, ‘তখন আমি তার দোয়া কবুল করলাম এবং তাকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিলাম। আর এভাবেই আমি মুমিনদের মুক্তি দিয়ে থাকি।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৮)
এই আয়াতটি নবী ইউনুস (আ.) সম্পর্কে এসেছে। এখানে তিনি বলছেন, ‘এভাবেই’ তিনি মুমিনদের মুক্তি দেন। মানে এই । আল্লাহ বলছেন এটা শুধু নবী ইউনুসকে যেভাবে মুক্তি দিয়েছেন, সেই একই পদ্ধতিতে।
সুতরাং আপনি যেহেতু মুমিন, তাই সেই পদ্ধতি অবলম্বন করলে হলে এই প্রতিশ্রুতি আপনার জন্যও প্রযোজ্য।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে মুসলিম ব্যক্তি ইউনুসের দোয়া পড়ে আল্লাহর কাছে কিছু চাইবে, আল্লাহ তার দোয়া কবুল করবেন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫০৫)
মুমিনের বিষয়টা আশ্চর্যের! তার জন্য সব অবস্থাই মঙ্গলজনক। সুখে থাকলে শুকরিয়া আদায় করে, এটা তার জন্য কল্যাণকর। বিপদে পড়লে ধৈর্য ধরে, এটাও তার জন্য কল্যাণকর।সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৯
২. ‘হাসবুনাল্লাহ’ বলা: আল্লাহ বলেছেন, ‘যাদের বলা হয়েছিল, তোমাদের বিরুদ্ধে লোকজন একত্র হয়েছে, তাদের ভয় করো। কিন্তু এতে তাদের ইমান আরও বেড়ে গেল এবং তারা বলল, আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম তত্ত্বাবধায়ক।’ (সুরা আলে–ইমরান, আয়াত: ১৭৩)
এখানে একটা অসাধারণ ব্যাপার ঘটেছে। যাদের ভয় দেখানো হলো যাতে তারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়। কিন্তু না, তারা ভয় পেল না উল্টো তাদের ইমান বেড়ে গেল। এটাই মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
তারপর তারা বলল ‘হাসবুনাল্লাহ’ মানে আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। ‘হাসব’ মানে যথেষ্ট, পর্যাপ্ত। যখন আল্লাহ আপনার দায়িত্ব নেন, তখন শত্রু যত বড়ই হোক, সমস্যা যত গভীরই হোক, সমীকরণ বদলে যায়।
৩. আল্লাহ দেখছেন বিশ্বাস রাখা: আল্লাহ বলেছেন, ‘আর তোমার প্রতিপালকের হুকুমের জন্য ধৈর্য ধরো, কারণ তুমি আমার (তোমার রবের) দৃষ্টির সামনেই আছ।' (সুরা তুর, আয়াত: ৪৮)
এখানে আরবিতে ‘বিআ’ইউনিনা’ বলা হয়েছে, যার অর্থ আমার দৃষ্টির সামনে। খেয়াল করুন, আল্লাহর পূর্ণ দৃষ্টি আপনার ওপর আছে। বিপদের সময় যদি মনে হয় আল্লাহ আপনাকে কি দেখছেন না, তাহলে এই আয়াত স্মরণ করুন। তিনি দেখছেন। আপনার কষ্ট তাঁর কাছে অজানা নয়।
৪. ধৈর্য ধরা: বিপদ বান্দার জন্য পরীক্ষা। আল্লাহ বলেন, ‘অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জানমাল ও ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৫)
আল্লাহর ঘোষণা ‘অবশ্যই আমি পরীক্ষা করব’, অর্থাৎ পরীক্ষা আসবেই। কিন্তু এর পরপরই আসছে, ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। মানে সুসংবাদ তাঁদের জন্য যাঁরা বিপদে ধৈর্য ধরেন। ইব্রাহিম (আ.) আগুনে ধৈর্য ধরেছেন। ইউনুস (আ.) মাছের পেটে ধৈর্য ধরেছেন।
দুজনেই সুসংবাদ পেয়েছেন। এটাই আল্লাহর নীতি। পরীক্ষার পরেই সুসংবাদ।
আপনার জীবনে এই মুহূর্তে কোন আগুন জ্বলছে? কোন মাছের পেটে আটকে আছেন আপনি? যুগে যুগে মুক্তিপ্রাপ্ত সকলের পথ ছিল একটাই—আল্লাহর দিকে সম্পূর্ণভাবে ফিরে আসা।
৫. আল্লাহর আনুগত্য করা: আসলে মুক্তির উপায় এই একটিই। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি সৎকর্মশীল হয়ে আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে, সে নিশ্চয়ই এক মজবুত রশি আঁকড়ে ধরেছে।’ (সুরা লুকমান, আয়াত: ২২)
এখানে আরবিতে বলা হয়েছে ‘ওয়াজহ’, এর অর্থ চেহারা, কিন্তু এখানে পুরো সত্তার প্রতীক। নিজের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার সবটুকু আল্লাহর কাছে সমর্পণ করা। তারপর এসেছে মজবুত রশির কথা। আল্লাহর রশি আঁকড়ে ধরলে কেউ বিপথগামী হয় না।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের বিষয়টা আশ্চর্যের! তার জন্য সব অবস্থাই মঙ্গলজনক। সুখে থাকলে শুকরিয়া আদায় করে, এটা তার জন্য কল্যাণকর। বিপদে পড়লে ধৈর্য ধরে, এটাও তার জন্য কল্যাণকর।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৯)
এবার একটু থামুন
আপনার জীবনে এই মুহূর্তে কোন আগুন জ্বলছে? কোন মাছের পেটে আটকে আছেন আপনি? যুগে যুগে মুক্তিপ্রাপ্ত সকলের পথ ছিল একটাই—আল্লাহর দিকে সম্পূর্ণভাবে ফিরে আসা।
এখনই সেই দোয়াটি পড়ুন, যা ইউনুস (আ.) পড়েছিলেন। মন দিয়ে পড়ুন। যিনি নবী ইউনুসকে মাছের পেট থেকে বের করে এনেছিলেন, তিনি আজও একই রকম শক্তিমান, আপনাকেও সব বিপদ থেকে মুক্ত করে দিতে পারেন।
বিপদ মুক্তির প্রতিশ্রুতি আপনার জন্যও।
মুহাম্মাদ মুহসিন মাশকুর : খণ্ডকালীন শিক্ষক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।