প্রাচীন আরবের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে ছিল দূরপাল্লার বাণিজ্য কাফেলার ওপর। রুক্ষ ভূগোলের কারণে কৃষিতে অনগ্রসর কোরাইশদের জীবিকা প্রায় পুরোপুরি নির্ভর করত এই কাফেলা-বাণিজ্যের ওপর। কোরআনেই এই ঐতিহ্যকে ‘শীত ও গ্রীষ্মকালীন সফর’ নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। (সুরা কুরাইশ, আয়াত: ২)
কৈশোরের শুরুতে চাচা আবু তালিবের সঙ্গী হয়ে মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ঘটে এমনই এক শাম সফরে। এই যাত্রার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে সিরাত সাহিত্যের অন্যতম আলোচিত ঘটনা—খ্রিষ্টান সাধু বাহিরার সঙ্গে সাক্ষাৎ।
ঘটনাটির মূল কাঠামো নিয়ে সিরাতের উৎসগুলোর মধ্যে বড় কোনো মতভেদ নেই, তবে দূরত্ব, বয়স আর তারিখের মতো খুঁটিনাটি জায়গায় কতটা নিশ্চিত হওয়া যায়, তা আলাদা করে যাচাই করা দরকার।
তৎকালীন কাফেলার গন্তব্য ছিল শামের সীমান্ত শহর বসরা (বুসরা আল–শাম), আজকের সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে জর্ডান সীমান্তের কাছে অবস্থিত এক ঐতিহাসিক নগরী, যা ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত এবং প্রাচীনকালে রোমান আরবিয়া প্রদেশের রাজধানী ছিল।
মক্কা থেকে বুসরা পর্যন্ত দূরত্বের হিসাবে বিভিন্ন উৎসে কিছুটা তারতম্য দেখা যায়। আকাশপথে সরলরেখার দূরত্ব প্রায় ১,৩০০ কিলোমিটার, আর আধুনিক সড়কপথে তা ১,৫৫০ থেকে ১,৬০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
প্রাচীন কাফেলা-পথ এই দুইয়ের মাঝামাঝি কোথাও ছিল বলে ধরে নিলে প্রায় ১,৩৫০ কিলোমিটার বলা যায়। (ইবনে সাইয়্যিদ আন-নাস, উয়ুনুল আসার ফি ফুনুনিল মাগাজি ওয়াশ শামায়িল ওয়াস সিয়ার, ১/৪৫, দারুল কলম, বৈরুত, ১৯৯৩)
মক্কা থেকে ৩৩ দিনের পথ অতিক্রম করে কাফেলাটি বসরায় পৌঁছায় এপ্রিলের শেষ ভাগে, যা ছিল শামের গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্যের মোক্ষম সময়। শামের সীমান্ত সংলগ্ন বসরার উপকণ্ঠে পৌঁছলে খ্রিষ্টান পাদ্রি বাহিরার সঙ্গে ঐতিহাসিক মোলাকাতের ঘটনা ঘটে।
প্রাচীন আরবে দূরপাল্লার সফরের একক ছিল ‘মারহালাহ’, এক দিন-রাতের স্বাভাবিক যাত্রা, যা ফিকহশাস্ত্রে নামাজ কসর (সংক্ষেপণ) করার আলোচনায় সাধারণত ৪১ থেকে ৪৪.৫ কিলোমিটার ধরা হয়। উটের কাফেলা ঘণ্টায় গড়ে ৪.৫ কিলোমিটার বেগে দৈনিক ৯ থেকে ১০ ঘণ্টা পথ চলত।
এই হিসাবে মক্কা থেকে বসরা পথ ছিল মোটামুটি ৩০ থেকে ৩৬ মারহালাহর পথ, অর্থাৎ বিরতিহীন যাত্রায় একমুখী সফরে সময় লাগত প্রায় এক মাসের মতো। (আলি জুমআ, আল-মাকায়িল ওয়াল মাওয়াজিন আশ-শারইয়্যাহ, পৃষ্ঠা ৬৪, দারুল কুদস, কায়রো, ২০০১)
নবীজির বয়স নিয়ে সিরাতের বর্ণনাগুলোর মধ্যে ভিন্নতা আছে। কিছু বর্ণনায় ৯ বছর, আবার অধিকাংশ বর্ণনায় ১২ বছরের কথা এসেছে; আধুনিক ও প্রাচীন উভয় ধরনের সিরাত-গবেষণাতেই এই দ্বৈততা স্বীকৃত। বারো বছর বয়সের বর্ণনাকেই অধিকাংশ সিরাতকার অগ্রাধিকার দেন।
ইবনে জাওজি বয়সের একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক দিয়ে লিখেছেন—১২ বছর ২ মাস ১০ দিন। (ইবনে জাওজি, তালকিহু ফুহুমি আহলিল আসার ফি উয়ুনিত তারিখ ওয়াস সিয়ার, পৃষ্ঠা ১৪, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৭)
মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাবও তাঁর মুখতাসারুস সিরাহ গ্রন্থে (পৃ ১৫, মাকতাবাতুর রিয়াদ আল-হাদিসাহ, রিয়াদ) এবং সফিউর রহমান মুবারকপুরী তাঁর আর-রাহিকুল মাখতুম গ্রন্থে (পৃ. ৫০, দারুস সালাম, রিয়াদ, ১৯৭৯) ইবনে জাওজির সূত্র উল্লেখ করে বয়সের এই হিসাব সমর্থন করেছেন।
এই অঙ্ককে আগের আলোচনায় প্রতিষ্ঠিত জন্মতারিখ (৯ রবিউল আউয়াল, ৫৭১ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে হিজরি-পূর্ব কাঠামোয় বসালে ১২তম জন্মবার্ষিকী পড়ে ৪১ হিজরি পূর্বে, যা গ্রেগরীয় হিসাবে ৫৮২ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বরের (১১ তারিখ) কাছাকাছি সময়ে আসে—যা মোটামুটি সংগতিপূর্ণ বলা যায়।
তবে এর সঙ্গে ২ মাস ১০ দিন যোগ করলে সফরের সূচনা সময় হয় ১৯ জমাদিউস সানি ৪১ হিজরি পূর্ব, যা গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৫৮৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ মার্চ (শুক্রবার)।
যদিও এই দাবি পুরোপুরি নিশ্চিত মেনে নেওয়া কঠিন। কারণ ইসলামি মাস গণনায় এই যোগফল সামান্য ভিন্ন ফল দিতে পারে ‘নাসি’-জনিত অনিশ্চয়তার কারণে। বরং যাত্রার সময়কাল ‘৫৮৩ খ্রিষ্টাব্দের বসন্তের কাছাকাছি সময়’ বলাই অধিক যুক্তিসংগত।
কেননা, ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, আরবরা প্রচণ্ড গরম শুরু হওয়ার আগেই শামের উদ্দেশে রওনা হতো এবং গ্রীষ্মের পুরো সময়টা শামের বিভিন্ন বাজারে কেনাবেচা করে শরৎকালে মক্কায় ফিরত। সেই হিসাবে মার্চের মাঝামাঝি সময়ে মক্কা থেকে যাত্রা শুরু করা বাস্তবসম্মত; কারণ এটি ছিল আরবের বসন্তকালের শেষ ভাগ।
মক্কা থেকে ৩৩ দিনের পথ অতিক্রম করে কাফেলাটি বসরায় পৌঁছায় এপ্রিলের শেষ ভাগে, যা ছিল শামের গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্যের মোক্ষম সময়।
কাফেলাটি যখন শামের সীমান্ত সংলগ্ন বসরার উপকণ্ঠে পৌঁছায়, তখন সেখানে খ্রিষ্টান পাদ্রি বাহিরার সঙ্গে ঐতিহাসিক মোলাকাতের ঘটনা ঘটে। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৮০, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৯০)
আশ্রমের পাশ দিয়ে যাতায়াত করলেও বাহিরা কখনো তাদের সঙ্গে কথা বলতেন না। কিন্তু এবার তিনি লক্ষ করেন, একটি মেঘখণ্ড শুধু এই কাফেলা ও এক কিশোরের মাথার ওপর ছায়া দিয়ে চলছে।
বাংলা ও উর্দু সিরাতগ্রন্থে এই চরিত্রকে সাধারণত ‘বুহাইরা’ নামে ডাকা হলেও প্রাচীন আরবি পাণ্ডুলিপি ও পাশ্চাত্য গবেষণা উভয় ক্ষেত্রেই বিশুদ্ধতর রূপ হলো ‘বাহিরা’।
এটা কোনো ব্যক্তিনাম নয়; প্রাচীন সুরিয়ানি-আরামাইক ভাষার ‘বহিরা’ শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘পরীক্ষিত’ বা ‘মনোনীত’। (আর্থার জেফরি, দ্য ফরেন ভোকাবুলারি অব দ্য কোরআন, পৃ. ৮১, ওরিয়েন্টাল ইনস্টিটিউট, বরোদা, ১৯৩৭; তুলনীয়: এনসাইক্লোপিডিয়া ডটকমের ‘বাহিরা লিজেন্ড’ নিবন্ধ)
ঐতিহাসিক সূত্রে তাঁর প্রকৃত নাম জারজিস বা জর্জ। পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকদের রচনায় ‘সের্গিউস’ও পাওয়া যায়। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৮০, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৯০)
ঘটনাটি ইবনে সাদ, ইবনে ইসহাক, ইবনে হিশাম এবং তাবারি—এই চার প্রধান আদি ঐতিহাসিকের রচনাতেই আলাদাভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে।
বসরা শহরের বাইরে এক নির্জন সন্ন্যাসাশ্রমে থাকতেন বাহিরা, যিনি তাওরাত ও ইনজিল শাস্ত্রে গভীর পারদর্শী ছিলেন। কোরাইশ কাফেলা নিয়মিত তাঁর আশ্রমের পাশ দিয়ে যাতায়াত করলেও বাহিরা কখনো তাদের সঙ্গে কথা বলতেন না।
কিন্তু এবার তিনি লক্ষ করেন, একটি মেঘখণ্ড শুধু এই কাফেলা ও এক কিশোরের মাথার ওপর ছায়া দিয়ে চলছে। (ইবনে ইসহাক, আস-সিয়ার ওয়াল মাগাজি, পৃ. ৫৩, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৭৮)
তিনি পুরো কাফেলাকে মেহমানদারির আমন্ত্রণ জানান। কিশোর মুহাম্মদ (সা.) বয়সে ছোট হওয়ায় কাফেলার মালপত্র পাহারা দেওয়ার জন্য তাঁবুতে থেকে গিয়েছিলেন। কিন্তু কিশোরকে বিশেষভাবে ডেকে পাঠান বাহিরা, আর তাঁর আচরণ ও দুই কাঁধের মাঝে মোহরে নবুয়ত প্রত্যক্ষ করে আবু তালিবকে সতর্ক করেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৬২০)
বাহিরা আবু তালিবকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, “এই কিশোর আপনার কে হন?” আবু তালিব বলেন, “আমার ছেলে।” বাহিরা বললেন, “না, এঁর পিতা জীবিত থাকার কথা নয়।” আবু তালিব তখন স্পষ্ট করেন যে তিনি তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র এবং তাঁর পিতা জন্মের আগেই মারা গেছেন।
বাহিরা তখন আবু তালিবকে সতর্ক করে বলেন, “আপনার ভাতিজাকে নিয়ে অবিলম্বে মক্কায় ফিরে যান এবং রোমান ও ইহুদিদের দৃষ্টি থেকে তাঁকে রক্ষা করুন। আল্লাহর শপথ, তারা যদি এই লক্ষণগুলো দেখে ফেলে, তবে তাঁর ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। কারণ এই বালক ভবিষ্যতে এক মহান মর্যাদার অধিকারী হবেন।” (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৮২, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৯০)
সতর্কবার্তা শুনে আবু তালিব দ্রুত পণ্য বিক্রি সম্পন্ন করে ভাতিজাকে নিয়ে মক্কার পথে ফিরে আসেন।
সেখানে প্রবেশের মাধ্যমে কোরাইশ কাফেলা প্রথমবারের মতো রোমান দুর্গ, সুবিশাল পাথুরে অ্যাম্ফিথিয়েটার এবং তৎকালীন উন্নত আন্তর্জাতিক নগর কাঠামোর মুখোমুখি হয়।
এই ঐতিহাসিক যাত্রায় কিশোর মুহাম্মদ (সা.) তৎকালীন মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলেন:
১. প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের মধ্য দিয়ে অতিক্রম: কাফেলাটি মদিনা পেরিয়ে খায়বার ও ওয়াদিউল কুরার পথ ধরে প্রাচীন সামুদ জাতির ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদ ‘মাদায়েন সালেহ’ (আল-হিজর) অতিক্রম করে। পরবর্তী কালে এই প্রাচীন অভিশপ্ত এলাকাগুলো তিনি দ্রুত ও আত্মসমালোচনার সঙ্গে পাড়ি দিতে বলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩৮০; ইয়াকুত আল-হামাবি, মুজামুল বুলদান, ২/২২১, দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৯৫)
২. মরু মরূদ্যানের যাত্রাবিরতি: হেজাজ ও উত্তর আরবের রুক্ষ পাহাড়ি উপত্যকা পাড়ি দেওয়ার সময় কাফেলাটিকে দীর্ঘ পথ সচল রাখতে পানি ও রসদের জন্য প্রাচীন তায়মা ও তাবুকের মতো প্রধান মরূদ্যানগুলোতে নিয়মিত বিরতি নিতে হতো। (শাওকি আবু খালিল, আতলাস আল-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ৪৫-৪৮, দারুল ফিকর, দামেস্ক, ২০০৪)
৩. রোমান-বাইজেন্টাইন সভ্যতার সংস্পর্শ: তৎকালীন হেজাজের গ্রামীণ মরুময় পরিবেশের তুলনায় বসরা ছিল রোমান সাম্রাজ্যের ‘প্রভিন্সিয়া আরাবিয়া’র প্রাদেশিক রাজধানী।
সেখানে প্রবেশের মাধ্যমে কোরাইশ কাফেলা প্রথমবারের মতো রোমান দুর্গ, সুবিশাল পাথুরে অ্যাম্ফিথিয়েটার এবং তৎকালীন উন্নত আন্তর্জাতিক নগর কাঠামোর মুখোমুখি হয়। (আকরাম জিয়া আল-উমারি, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ আস-সহিহাহ, ১/১০৬–১০৭, মাকতাবাতুল উলুম ওয়াল হিকাম, মদিনা, ১৯৯৪)