পবিত্র কাবা শরিফ, মক্কা, সৌদি আরব
পবিত্র কাবা শরিফ, মক্কা, সৌদি আরব

পাথেয়

পবিত্র মক্কার জানা–অজানা ১০ অধ্যায়

মক্কার ইতিহাস কেবল ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রতিটি ধূলিকণা সাক্ষী হয়ে আছে শত শত বছরের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের।

নির্বাসন, বিদ্রোহ, বাণিজ্য আর রূপান্তরের এক দীর্ঘ ইতিহাসের নাম মক্কা। মক্কা শরিফ সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য রয়েছে, যা আমাদের অনেকেরই অজানা। তেমনই কিছু দিক এখানে তুলে ধরা হলো।

১. ইসমাইল (আ.)-এর বংশধরদের মক্কা ত্যাগ

সাধারণত মনে করা হয়, নবী ইসমাইলের বংশধররা প্রাচীনকাল থেকে মহানবী (সা.)-এর সময় পর্যন্ত মক্কায় নিরবচ্ছিন্ন বসবাস করেছেন। কিন্তু ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। ইসমাইল (আ.) ইয়েমেনের জুরহুম গোত্রে বিবাহ করেছিলেন এবং দীর্ঘ সময় এই গোত্রই মক্কা শাসন করে।

কিন্তু এক সময় জুরহুমরা হাজিদের ওপর অনাচার ও কাবার অবমাননা শুরু করলে ইয়েমেনি গোত্র ‘খুজাআ’ তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। এমনকি তারা জুরহুমদের পরাজিত করে মক্কা থেকে বিতাড়িত করে এবং কাবার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। (ইবনে কাসির, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ২/১৮৬, দারু হিজর, কায়রো, ১৯৯৭)

পরবর্তীকালে ৫ম শতকে কোরাইশরা পুনরায় মক্কার নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং ইসমাইল (আ.)-এর বংশধারার কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।

২. জমজম কূপ আবিষ্কার

মক্কা ছাড়ার সময় জুরহুমরা জমজম কূপে মূল্যবান সম্পদ পুঁতে রেখে গিয়েছিল বলে জানা যায়। তখন তারা এই কূপটি ভরাট করে দেয়। দীর্ঘ সময় এটি লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকে।

নবীজি (সা.)-এর দাদা আব্দুল মুত্তালিব স্বপ্নের মাধ্যমে নির্দেশ পেয়ে এটি পুনরায় খনন করেন। (ইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৪৩, মুস্তাফা আল-বাবি, কায়রো, ১৯৫৫)

আজও এই কূপের পানি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের তৃষ্ণা মিটিয়ে যাচ্ছে।

জাদুঘরে সংরিক্ষত জমজম কূপের নকশা

৩. প্রাচীনকাল থেকে নিরাপত্তা

ইসলামের আগমনের বহু আগে থেকেই মক্কা ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এটি দক্ষিণে ইয়েমেন থেকে উত্তরে সিরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত কাফেলাগুলোর জন্য ছিল নিরাপদ বিরতিস্থল।

পবিত্র কোরআনেও এই বাণিজ্য সফরের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে। (সুরা কোরাইশ, আয়াত: ১-২)

মক্কার এই বাণিজ্যিক সফলতার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল এর পবিত্রতা; হারাম শরীফে যুদ্ধ নিষিদ্ধ থাকায় আরবের বিভিন্ন গোত্র এখানে নিরাপদে ব্যবসা-বাণিজ্য ও মধ্যস্থতা করতে পারত।

৪. মক্কার সেই ঐতিহাসিক ‘শান্তি প্রতিজ্ঞা’

মক্কায় আগত বিদেশি ব্যবসায়ীদের ওপর স্থানীয় প্রভাবশালীদের জুলুম বন্ধ করতে এক ঐতিহাসিক জোট গঠিত হয়েছিল, যা ‘হিলফুল ফুজুল’ নামে পরিচিত। নবীজি (সা.) নিজেও যুবক বয়সে এই প্রতিজ্ঞায় শরিক ছিলেন।

নবুয়ত পাওয়ার পর এর প্রশংসা করে বলেছিলেন, “যদি ইসলাম আসার পরেও আমাকে এমন কোনো চুক্তিতে ডাকা হতো, তবে আমি তাতে সাড়া দিতাম।” (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৩৩, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০৯)

এটি প্রমাণ করে যে, ইসলাম পূর্ব মক্কায়ও ন্যায়বিচারের একটি চেষ্টা ছিল।

৫. কোরাইশদের শীত ও গ্রীষ্মকালীন সফর

মক্কার কোরাইশরা বছরে দুবার বড় বাণিজ্য সফরে বের হতো। শীতকালে তারা যেত দক্ষিণে ইয়েমেনের দিকে এবং গ্রীষ্মকালে উত্তরে সিরিয়ার দিকে। এই সফরের মাধ্যমেই মক্কা তৎকালীন বিশ্বের বড় বড় সাম্রাজ্য যেমন রোমান ও পারস্যের সঙ্গে ব্যবসায়িক সংযোগ রক্ষা করত।

পবিত্র কোরআনে এই সফরের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, “কোরাইশদের আসক্তির কারণে—শীত ও গ্রীষ্মকালীন সফরের প্রতি তাদের আসক্তির কারণে।” (সুরা কোরাইশ, আয়াত: ১-২)

এই বাণিজ্যের কারণেই আব্দুল্লাহ ইবনে জাদানের মতো ধনাঢ্য ব্যক্তিরা সিরিয়ার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য হাজারো উটবোঝাই খাবার পাঠাতে পারতেন।

৬. মক্কার ‘হারাম’ সীমানা ঘোষিত

মক্কার চারপাশে একটি নির্দিষ্ট এলাকাকে ‘হারাম’ বা পবিত্র ঘোষণা করা হয়েছে। এই সীমানার ভেতর যুদ্ধ-বিগ্রহ, গাছ কাটা এমনকি বন্যপ্রাণী শিকার করাও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ

নবীজি (সা.) মক্কা বিজয়ের দিন ঘোষণা করেছিলেন, “এই শহরকে আল্লাহ পবিত্র করেছেন... এর কোনো কাঁটাযুক্ত গাছ কাটা যাবে না এবং এর শিকার তাড়িয়ে দেওয়া যাবে না।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮৩৩)

১৮৫০ সালের মক্কার একটি দৃশ্য, যেখানে সাফা–মারওয়া পাহাড়সহ পুরো মক্কাকে দেখা যাচ্ছে

৭. সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের স্মৃতি

হজের অন্যতম অংশ হলো সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার দৌড়ানো। এটি মূলত হজরত হাজেরা (আ.)-এর সেই ঐতিহাসিক কষ্টের স্মৃতি, যখন তিনি শিশু ইসমাইলের পানির জন্য এই দুই পাহাড়ের মাঝে দৌড়াদৌড়ি করেছিলেন।

আল্লাহ–তাআলা এই কাজটিকে কেয়ামত পর্যন্ত ইবাদত হিসেবে কবুল করে নিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৮)

৮. মক্কায় মূর্তিপূজার সূচনা

মক্কা একসময় একত্ববাদের কেন্দ্র ছিল। কিন্তু ‘আমর ইবনে লুহাই’ নামক এক ব্যক্তি সিরিয়া থেকে ‘হুবাল’ নামক একটি মূর্তি নিয়ে এসে কাবার সামনে স্থাপন করে এবং মূর্তিপূজার প্রচলন করে।

ইবনে ইসহাকের বর্ণনা অনুযায়ী, সে-ই প্রথম আরবে মূর্তিপূজার প্রথা শুরু করেছিল। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/৭৬, মুস্তাফা আল-বাবি, কায়রো, ১৯৫৫)

নবীজি (সা.) মক্কা বিজয়ের দিন ৩৬০টি মূর্তিকে কাবার চারপাশ থেকে অপসারণ করেন।

৯. মক্কার আবরাজ আল-বাইত

বর্তমানের মক্কা অতীতের চেয়ে অনেক আধুনিক। মক্কার বিশাল ঘড়ি মিনার বা আবরাজ আল-বাইত কমপ্লেক্স এখন সারা বিশ্বের পর্যটকদের কাছে পরিচিত।

তবে এই আধুনিকায়নের মাঝেও মক্কার সেই আধ্যাত্মিক পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করা হয়। প্রতিদিন কয়েক লক্ষ হাজি এখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ইবাদত করতে পারেন।

১০. মক্কার চিরস্থায়ী নিরাপত্তা

মক্কার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর নিরাপত্তা। দাজ্জালের ফেতনা থেকেও এই শহর নিরাপদ থাকবে বলে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। নবীজি (সা.) বলেছেন, “মক্কা ও মদিনা ছাড়া এমন কোনো শহর নেই যা দাজ্জাল পদদলিত করবে না...।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮৮১)।

এই নিরাপত্তা কেবল জাগতিক নয়, বরং এটি খোদ আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুত।

মক্কার বিশাল ঘড়ি মিনার বা আবরাজ আল-বাইত কমপ্লেক্স এখন সারা বিশ্বের পর্যটকদের কাছে পরিচিত