
একটি তুচ্ছ ভুল বোঝাবুঝি কি আপনার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব বা প্রিয় কোনো সম্পর্ককে ফিকে করে দিচ্ছে? কিংবা শোনা কথার ওপর ভিত্তি করে নেওয়া ভুল সিদ্ধান্তে অশান্তি বাড়ছে চারপাশে? এমন অভিজ্ঞতা আমাদের সবারই কমবেশি আছে।
তবে মজার ব্যাপার হলো, সমস্যা যেমন আছে, ইসলাম আমাদের তেমনি শিখিয়েছে সমাধানের নিখুঁত কৌশল।
কীভাবে আমাদের চিন্তা, কথা ও আচরণের মাধ্যমে এই অনাকাঙ্ক্ষিত দূরত্ব ঘুচিয়ে ফেলা যায়, চলুন জেনে নিই সেই ৬টি কার্যকর উপায়।
ভুল বোঝাবুঝির বীজ বপন হয় তখনই, যখন আমরা শোনা কথাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করি। কেউ কেন বলেছে বা কী প্রেক্ষাপটে বলেছে—তা না ভেবেই আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাই। ইসলাম এখানে আমাদের ‘থামতে’ শেখায়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মুমিনগণ, যদি কোনো ফাসিক (গুনাহগার) ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে দেখো।” (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ০৬)
যাচাই ছাড়া কোনো খবর বিশ্বাস করলে দিনশেষে অনুশোচনা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।
যখন তোমার কাছে দুই ব্যক্তি কোনো মোকদ্দমা নিয়ে আসে, তখন দ্বিতীয় ব্যক্তির কথা শোনা ছাড়া প্রথম ব্যক্তির পক্ষে রায় দেবে না।সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৩৩১
সন্দেহ হলো সম্পর্কের নীরব ঘাতক। এটি এমন এক মানসিক অবস্থা যা মানুষকে সত্যের চেয়ে মিথ্যার দিকেই বেশি ধাবিত করে। সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত করতে হলে মনে সদ্ভাব লালন করা জরুরি।
আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেন, “হে মুমিনগণ, তোমরা অধিক সন্দেহ থেকে বেঁচে থাকো।” (সুরা হুজুরাত: ১২)
মনকে স্থির রাখা এবং ইতিবাচক চিন্তা করা ভুল বোঝাবুঝির শিকড় উপড়ে ফেলতে সাহায্য করে।
আমরা অনেক সময় ভাবি, “আমি যা বুঝেছি সেটাই ধ্রুব সত্য।” অথচ একটি ঘটনার অনেকগুলো দিক থাকতে পারে। অন্যের ব্যাখ্যা শোনার মানসিকতা থাকা প্রজ্ঞাবান মানুষের পরিচয়।
আল্লাহর রাসুল (সা.) বিচারব্যবস্থার উদাহরণ দিয়ে শিখিয়েছেন, “যখন তোমার কাছে দুই ব্যক্তি কোনো মোকদ্দমা নিয়ে আসে, তখন দ্বিতীয় ব্যক্তির কথা শোনা ছাড়া প্রথম ব্যক্তির পক্ষে রায় দেবে না। কেননা উভয়ের কথা শুনলে তোমার কাছে সঠিক রায় স্পষ্ট হয়ে যাবে।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৩৩১)
পরিবার বা সামাজিক জীবনেও এই নীতি প্রয়োগ করলে অধিকাংশ ঝগড়া মিটে যায়।
মনে মনে কষ্ট চেপে রাখা বা অনুমানের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া দূরত্ব আরও বাড়ায়। কোনো কিছু খটকা লাগলে ভদ্রতা বজায় রেখে সরাসরি কথা বলা উত্তম।
কোরআনের শিক্ষা হলো, “তোমরা মানুষের সঙ্গে উত্তম পদ্ধতিতে কথা বলো।” (সুরা বাকারাহ: ৮৩)
নরম ভাষায় সরাসরি আলাপ অনেক কঠিন সমস্যার সহজ সমাধান করে দেয়।
নবীজি (সা.) দোয়া করতেন, “হে আল্লাহ, আমাদের অন্তরসমূহকে পরস্পরের প্রতি মিলিয়ে দাও।”
সব সময় যুক্তি দিয়ে সম্পর্ক বাঁচে না, মাঝে মাঝে ভালোবাসার জন্য ছাড় দিতে হয়। ইসলাম এই ছাড় দেওয়াকে দুর্বলতা নয়, বরং হৃদয়ের পরিপক্বতা হিসেবে দেখে।
আল্লাহ তাআলা প্রশ্ন করেছেন, “তোমরা কি পছন্দ কর না যে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন?” (সুরা নুর, আয়াত: ২২)
অন্যকে ক্ষমা করলে আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করবেন—এই বিশ্বাস মনে থাকলে ক্ষমা করা সহজ হয়ে যায়।
মানুষের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ, কিন্তু আল্লাহর ক্ষমতা অসীম। যখন সব চেষ্টা ব্যর্থ মনে হয়, তখন মোনাজাতই হতে পারে পরম আশ্রয়।
নবীজি (সা.) দোয়া করতেন, “হে আল্লাহ, আমাদের অন্তরসমূহকে পরস্পরের প্রতি মিলিয়ে দাও।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৯৬৯)
দোয়া মানুষের মনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ দূর করে প্রশান্তি ফিরিয়ে আনে।
মানুষ হিসেবে আমরা ভুলের ঊর্ধ্বে নই। কিন্তু সেই ভুলকে আঁকড়ে না ধরে বরং সংযম, শালীনতা এবং আল্লাহভীতির মাধ্যমে মোকাবিলা করাই হলো প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য। আপনার চারপাশের সম্পর্কগুলো সুন্দর থাকুক, এই কামনায়।
রায়হান আল ইমরান: লেখক ও গবেষক