আসক্তি বা ‘অ্যাডিকশন’ বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে একটি জটিল মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক সংকটে পরিণত হয়েছে। মুসলিম উম্মাহ এই সংকটের ঊর্ধ্বে নয়।
সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট যা-ই হোক না কেন, আধুনিক যুগের ভোগবাদী জীবনযাত্রা এবং খুব সহজে নেশাজাতীয় দ্রব্যের প্রাপ্যতা মুসলিম সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এই সমস্যাকে পৌঁছে দিচ্ছে। মাদক, অ্যালকোহল, জুয়া ও পর্নোগ্রাফির মতো আসক্তিগুলো ব্যক্তিজীবন ছাড়িয়ে পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
নিচে মুসলিম সমাজে আসক্তির কারণ এবং ইসলামি ও মনস্তাত্ত্বিক সমাধানের একটি সামগ্রিক রূপরেখা তুলে ধরা হলো।
পরিযায়ী বা ‘ডায়াসপোরা’ মুসলিমরা কেন আসক্তির ঝুঁকিতে বেশি থাকেন, তার পেছনে বেশ কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ কাজ করে:
১. সাংস্কৃতিক সংঘাত: নতুন দেশে নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয় বজায় রাখা এবং পশ্চিমা সমাজের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চাপের মধ্যে পড়ে অনেকে মানসিক অস্থিরতায় ভোগেন, যা তাঁদের মাদকের দিকে ঠেলে দেয়।
২. সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: পরিবার বা আগের সামাজিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে একাকিত্ব কাটাতে অনেকে পর্নোগ্রাফি বা মাদকের আশ্রয় নেন।
৩. মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব: বিষণ্নতা, উদ্বেগ বা পিটিএসডির মতো সমস্যাগুলোকে অনেক সময় কেবল ‘ইমানের অভাব’ বলে অবজ্ঞা করা হয়। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে আসক্তিতে নিমজ্জিত হন।
৪. বৈষম্য ও ইসলামোফোবিয়া: কাঠামোগত বৈষম্য এবং প্রতিনিয়ত বৈরী আচরণের শিকার হওয়া মানুষের মধ্যে মাদকের অপব্যবহারের মাধ্যমে মানসিক শান্তি খোঁজার প্রবণতা বেশি থাকে।
ইসলাম আসক্তিকে কেবল একটি জৈবিক রোগ হিসেবে দেখে না; বরং একে একটি আধ্যাত্মিক ভারসাম্যহীনতা হিসেবেও বিবেচনা করে।
ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহ.) সম্ভবত ইতিহাসের প্রথম পণ্ডিত যিনি আসক্তির মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব এবং ‘নিয়ন্ত্রণ হারানো’র (লস অব কন্ট্রোল) বিষয়টি নিয়ে লিখেছেন। তিনি কেবল মাদক নয়; বরং আচরণের আসক্তি (যেমন পর্নোগ্রাফি বা জুয়া) নিয়েও আলোচনা করেছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, আধ্যাত্মিকতা ও ধর্মীয় বিশ্বাস মুসলিমদের নেশা ছাড়তে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। প্রার্থনা, আত্মিক প্রতিফলন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা আসক্তি নিরাময়ে ‘রেসিলিয়েন্স’ বা মানসিক শক্তি জোগায়।
এক্ষেত্রে আসক্ত ব্যক্তিকে সমাজচ্যুত না করে অসুস্থ হিসেবে বিবেচনা করা এবং তাকে সহানুভূতির সঙ্গে চিকিৎসার পথে ফিরিয়ে আনাই হলো নবিজী (সা.)–এর আদর্শ।
একটি আসক্তিমুক্ত সমাজ গড়তে হলে আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো নিতে হবে:
সামাজিক: আসক্তি নিয়ে লুকোচুরি বন্ধ করে খোলামেলা আলোচনা শুরু করা। আসক্ত ব্যক্তিকে অপরাধী না ভেবে অসুস্থ মনে করে সহমর্মিতা দেখানো।
মসজিদ ও ধর্মীয় কেন্দ্র: ইমাম ও মসজিদ কমিটিগুলোকে আসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোর সাথে সমন্বয় করতে হবে। মসজিদগুলোতে নিরাপদ কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা।
পারিবারিক: সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুর মতো সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর নজর রাখা। সন্তানদের প্রতিভার প্রশংসা ও উৎসাহ প্রদান।
পেশাদারী সহায়তা: কেবল দোয়া নয়, প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও কাউন্সিলরের সাহায্য নেওয়া। প্রয়োজনে ‘মুসলিম মেন্টাল হেলথ’ সংস্থাগুলোর শরণাপন্ন হওয়া।
আসক্তি একটি কঠিন পরীক্ষা, তবে এটি কোনো মরণব্যাধি নয় যা থেকে মুক্তি অসম্ভব। আমাদের সমাজকে এই অভিশাপ থেকে রক্ষা করতে হলে ‘অস্বীকারের সংস্কৃতি’ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দুনিয়াবি কষ্ট লাঘব করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার কষ্ট লাঘব করবেন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৩০)
আসক্ত ব্যক্তির প্রতি ঘৃণা নয়; বরং সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেওয়াই প্রকৃত ইমানি দায়িত্ব।