পাথেয়

কথা দিলে কথা কি রাখতেই হয়: ইসলাম কী বলে

আরবিতে প্রতিশ্রুতির জন্য দুটি শব্দ চলে—‘আহদুন’ আর ‘ওয়াদুন’। অর্থ মোটামুটি একই—চুক্তি, অঙ্গীকার, শপথ। সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্যে পরস্পরের সঙ্গে যে লিখিত বা মৌখিক বোঝাপড়া হয়, তা-ই প্রতিশ্রুতি। ছোট একটি শব্দ, কিন্তু ইসলামে এর ওজন অনেক ভারী।

প্রতিশ্রুতি রক্ষা মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান শিষ্টাচারগুলোর একটি। আর এর দায়টা শুধু সামাজিক নয়, সরাসরি আল্লাহর কাছে জবাবদিহির বিষয়। কেয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে এই প্রতিশ্রুতি নিয়েই প্রশ্ন হবে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা প্রতিশ্রুতি পালন করো। নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৩৪)

এমনকি আল্লাহও অঙ্গীকার করেন

এই বিষয়টা একটু থমকে ভাবার মতো। আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে মানুষের মর্যাদা সর্বোচ্চ, আর সেই মর্যাদারই একটা প্রকাশ হলো, রুহ সৃষ্টির পর আল্লাহ নিজেই মানুষের কাছ থেকে তাঁকে রব হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন। বিনিময়ে তিনিও মানুষের সঙ্গে অঙ্গীকার করেছেন।

কোরআনের একাধিক জায়গায় এই ওয়াদার কথা এসেছে—‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো, তবে তোমাদের নিয়ামত আরও বাড়িয়ে দেব।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত ৭)

বনি ইসরাইলদের উদ্দেশ করে আরও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ‘তোমরা আমার অঙ্গীকার পূর্ণ করো, তাহলে আমি তোমাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করব।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ৪০)

অর্থাৎ প্রতিশ্রুতি রক্ষা কোনো একতরফা নৈতিক উপদেশ নয়। বরং এটা এমন একটা নীতি, যা স্বয়ং আল্লাহও তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেন। মানুষে-মানুষে বা রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে যখন এই ওয়াদা ভাঙে, তখন সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়, তার শিকড় এই মৌলিক নীতিরই লঙ্ঘনে।

যে তিনটি লক্ষণ মোনাফেক চিনিয়ে দেয়

প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকে ইসলাম নেহাত একটা ভুল হিসেবে দেখে না, এটাকে রাখা হয়েছে মোনাফেকির লক্ষণের তালিকায়। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘মোনাফেকের আলামত তিনটি—কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে, আমানত রাখা হলে খেয়ানত করে।’ (সহিহ বুখারি: ৩৩; সহিহ মুসলিম: ৫৯)

তিনটি লক্ষণের মধ্যে ওয়াদাভঙ্গ ঠিক মাঝখানে বসানো, যেন বোঝানো হচ্ছে, এটা প্রান্তিক কোনো দোষ নয়, বরং চরিত্রের কেন্দ্রীয় একটা পরীক্ষা।

শাস্তিটাও এখানে হালকা নয়। কোরআনে বলা হয়েছে, যারা প্রতিশ্রুতি ও কসম তুচ্ছমূল্যে বিক্রি করে দেয়, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সঙ্গে কথাও বলবেন না, তাকাবেনও না, পবিত্রও করবেন না। তাদের জন্য থাকবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সুরা আলে–ইমরান, আয়াত: ৭৭)

নবীজি (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলিমের সম্পদ আত্মসাতের জন্য মিথ্যা কসমকারী আল্লাহর সাক্ষাৎ পাবে এমন অবস্থায়, যখন আল্লাহ তার ওপর রাগান্বিত থাকবেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৬৬৯)

যেভাবে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা উচিত

তাহলে করণীয়টা কী? মুমিনের কাজ হলো, যে অঙ্গীকার সে করে তার পূর্ণ হেফাজত করা।

এর একটা ব্যবহারিক দিকও আছে: অঙ্গীকার করার আগেই ভেবে নেওয়া উচিত, এটা পূরণ করার সামর্থ্য আসলেই আছে কি না। ভেবেচিন্তে অঙ্গীকার করার পর তার ওপর অটল থাকতে হয়।

আর যদি কোনো কারণে পূরণ করা সম্ভব না হয়, তাহলে চুপ করে থাকা নয়, সরাসরি গিয়ে বলা উচিত, ‘আমি অঙ্গীকার করেছিলাম, কিন্তু কিছু ওজর দেখা দিয়েছে, তাই পূরণ করতে পারছি না।’

এই নীতিটা কতটা সূক্ষ্মভাবে প্রযোজ্য, তার একটা সুন্দর দৃষ্টান্ত আছে হাদিসে। আব্দুল্লাহ ইবনে আমির (রা.) বর্ণনা করেন, একদিন তাঁর মা তাঁকে ডেকে বললেন, ‘এদিকে এসো, তোমাকে কিছু দেব।’ তখন নবীজি (সা.) তাঁদের ঘরে বসা ছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি তাকে কী দেওয়ার ইচ্ছা করেছ?’ মা জবাব দিলেন, ‘কিছু খেজুর দেওয়ার ইচ্ছা ছিল।’ নবীজি (সা.) তখন বললেন, ‘যদি কিছু না দেওয়ার ইচ্ছা থাকত, তাহলে তোমার আমলনামায় একটা মিথ্যা লেখা হয়ে যেত।’ (সুনান আবু দাউদ: ৪৯৯১)

এই ঘটনাটাই বোধ হয় সবচেয়ে ভালোভাবে বুঝিয়ে দেয়, ইসলামে প্রতিশ্রুতির সংজ্ঞা কতটা বিস্তৃত। এটা শুধু বড় চুক্তি বা রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের বিষয় নয়, বরং একটা শিশুকে দেওয়া সামান্য প্রতিশ্রুতিও একই মানদণ্ডে বিচার্য। কথা যদি দিয়েই ফেলা হয়, তা পূরণ করাটাই তখন একমাত্র পথ থাকে।

  • ইলিয়াস মশহুদ : প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক