ঈদ মানে আনন্দ। ঈদ মানে খুশি। ঈদ মুমিন হৃদয়ে বয়ে আনে অনাবিল হাসি। ঈদ মুসলিম জাতিসত্তায় এক অনন্য উৎসব।
প্রতি বছর আমরা দুটি উৎসব পালন করি—ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। যা একদিকে আনন্দের, অন্যদিকে পারস্পরিক সম্প্রীতি রক্ষার অনন্য মাধ্যম।
১. গোসল ও পরিচ্ছন্নতা: ঈদের দিন সকালে গোসল করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়া সুন্নাত। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) ঈদগাহে যাওয়ার আগে গোসল করতেন (সুনানে বায়হাকি, হাদিস: ৫৯২০)।
২. তাকবির পাঠ: ঈদের দিন বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করা ও তাকবির পাঠ করা সুন্নাত। তাকবিরটি হলো: ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ’।
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) উচ্চৈঃস্বরে তাকবির বলতে বলতে ঈদগাহে যেতেন। (দারাকুতনি, হাদিস: ১৭১৬)
৩. উত্তম পোশাক ও সাজসজ্জা: সামর্থ্য অনুযায়ী ঈদের দিন নতুন পোশাক পরবে, অন্যথায় নিজের পরিষ্কার ও উত্তম পোশাকটি পরিধান করবে। এটি নিছক ফ্যাশন নয়, বরং আল্লাহর নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। মহানবী (সা.) দুই ঈদেই ঈদগাহে যাওয়ার আগে সর্বোত্তম পোশাক পরতেন। (জাদুল মাআদ, খণ্ড-১, পৃ. ৪৪২)
৪. তাকওয়ার পোশাক: সুন্দর পোশাকের চেয়েও জরুরি হলো ‘তাকওয়ার পোশাক’ বা নিজেকে গুনাহমুক্ত রাখা। পরিবার-পরিজনকে গুনাহ থেকে রক্ষা করা এবং পরিশুদ্ধ থাকার দীপ্ত শপথই হোক আসল ঈদের প্রাপ্তি।
৫. ঈদগাহে যাওয়ার আগে খাওয়া: ঈদুল ফিতরে নামাজে যাওয়ার আগে বিজোড়সংখ্যক (১, ৩ বা ৫টি) খেজুর বা অন্য কোনো মিষ্টিজাতীয় খাবার খাওয়া বিশেষ সুন্নাত। এটি মূলত রোজা শেষ হওয়ার ঘোষণার বাস্তব প্রতিফলন।
আনাস (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন বিজোড়সংখ্যক খেজুর না খেয়ে ঘর থেকে বের হতেন না। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৫৩)
৬. ফিতরা আদায়: নামাজের আগেই ফিতরা আদায় করা জরুরি। এর মাধ্যমে রোজার ত্রুটিবিচ্যুতি দূর হয় এবং অভাবী মানুষের মুখে হাসি ফোটে।
নামাজের পরে দিলে তা সাধারণ সদকা হিসেবে গণ্য হবে। (আবু দাউদ, হাদিস: ১৬০৯)
৭. পথ পরিবর্তন ও হেঁটে যাওয়া: এক পথ দিয়ে ঈদগাহে যাওয়া এবং ভিন্ন পথ দিয়ে ফেরা সুন্নাত। এর ফলে অধিক মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় হয় এবং সওয়াবও বাড়ে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৮৬)
সম্ভব হলে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া উত্তম।
৮. প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া: ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া ইসলামের নির্দেশ।
সুরা নিসার ৩৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে সদাচরণের তাগিদ দিয়েছেন। এছাড়া অনাথ-ইয়াতিমদের খাবার খাওয়ানো ও নতুন কাপড়ের ব্যবস্থা করা ইমানদারের বৈশিষ্ট্য।
৯. পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়: ঈদের দিনে হাসিমুখে শুভেচ্ছা বিনিময় করা ইমানের সৌন্দর্য। সাহাবিরা পরস্পরকে বলতেন, ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা’ (আল্লাহ আমাদের ও আপনার নেক কাজগুলো কবুল করুন)।
রমজানের শিক্ষা যেন ঈদের আনন্দ করতে গিয়ে ধূলিসাৎ না হয়ে যায়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
১. অতিরিক্ত নফল নামাজ: ঈদের নামাজের আগে ও পরে ঈদগাহে কোনো নফল নামাজ নেই। ঈদের নামাজের জন্য কোনো আজান বা ইকামতও দিতে হয় না।
২. রোজা রাখা: ঈদের দিনে রোজা রাখা সম্পূর্ণ হারাম। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে মেহমানদারির দিন।
মহানবী (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনে রোজা রাখতে বিশেষভাবে নিষেধ করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৯১)।
৩. ইবাদতে অবহেলা: নতুন পোশাক বা রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ঈদের ওয়াজিব নামাজ কাজা করা বা অবহেলা করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
৪. বিদাআত ও কুসংস্কার: ঈদকে কবর জেয়ারতের বিশেষ দিন মনে করা বা ঈদগাহে কোলাকুলি করাকে আবশ্যক ইবাদত মনে করা ঠিক নয়।
তবে ভালোবাসা প্রকাশের জন্য কোলাকুলি বা মুসাফাহা করায় দোষ নেই, যদি একে ইবাদতের অংশ মনে না করা হয়।
৫. অপচয় ও ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড: ঈদের আনন্দ অবশ্যই শরিয়তের সীমানার মধ্যে হতে হবে। জুয়া বা অপচয় ইসলামে নিষিদ্ধ। মনে রাখতে হবে, ঈদ কেবল উৎসব নয়, বরং আত্মশুদ্ধিরও এক বড় সুযোগ।