মুসলিম সভ্যতার সুদীর্ঘ ইতিহাসে জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন এবং মুক্তচিন্তার যেমন স্বর্ণযুগ ছিল, তেমনি রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপটে, ধর্মীয় সংকীর্ণতায় কিংবা বৈদেশিক আগ্রাসনে অমূল্য সব বই ও লাইব্রেরি পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়ার বেদনাক্রান্ত অধ্যায়ও কম ছিল না।
তবে এই বই পোড়ানোর অধিকাংশ ঘটনাই ঘটেছে স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী এবং ক্ষমতার রাজনীতির প্রত্যক্ষ মদদে। যেকোনো স্বৈরাচারী ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো মুক্তমতকে ভয় পাওয়া।
কাওয়াকিবি এই ধরনের মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে বলেছেন, “কুটিল অভিভাবক যেমন চান না এতিম শিশুটি প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে নিজের অধিকার বুঝে নিক, ঠিক তেমনি স্বৈরাচারী শাসকও চান না যে তাঁর প্রজারা জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হোক। স্বৈরাচারী শাসক যত নির্বোধ হোন না কেন, তিনি খুব ভালো করেই জানেন—প্রজারা যতক্ষণ অজ্ঞতার অন্ধকার আর অন্ধত্বের গোলকধাঁধায় হাবুডুবু খাবে, ততক্ষণ তাদের ওপর দাসত্ব ও জুলুমের রাজত্ব টিকিয়ে রাখা যাবে।” (আব্দুর রহমান আল-কাওয়াকিবি, তাবাইউল ইস্তিবদাদ, পৃষ্ঠা: ৩৪, দারুল নাফায়েস, বৈরুত, ২০০৬)
শাসকগোষ্ঠী অনেক সময় ধর্মীয় ভাবাবেগকে পুঁজি করে ভিন্নমতাবলম্বী জ্ঞানীদের ‘সমাজ ধ্বংসকারী’ বা ‘ধর্মদ্রোহী’ হিসেবে চিত্রায়িত করে বই পোড়ানোর কাজ পরিচালনা করেছে।
কুটিল অভিভাবক যেমন চান না এতিম শিশুটি প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে নিজের অধিকার বুঝে নিক, ঠিক তেমনি স্বৈরাচারী শাসকও চান না যে তাঁর প্রজারা জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হোক।আব্দুর রহমান আল-কাওয়াকিবি, ইসলামি চিন্তাবিদ
বিশেষ করে কোনো নতুন রাজবংশ প্রতিষ্ঠার শুরুতে, রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলে কিংবা বহিঃশত্রুর আক্রমণের চরম মুহূর্তে এ জাতীয় আগ্রাসন বেশি দেখা গেছে।
সেকালের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র মুসলিম স্পেনও (আন্দালুস) এই রাজনৈতিক নির্মম হাত থেকে রক্ষা পায়নি। কয়েকটি প্রধান ঘটনা ও কারণ আলোচনা করা হলো।
ইসলামের ইতিহাসে রাষ্ট্রীয়ভাবে বই পোড়ানোর অন্যতম প্রাচীন ঘটনা ঘটে উমাইয়া আমলে। মদিনার কাজি আবান ইবনে ওসমান (রা.) (চতুর্থ খলিফা ওসমানের পুত্র) নবীজির সিরাত ও যুদ্ধাভিযানের ওপর একটি চমৎকার ইতিহাস গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।
মদিনায় এলে যুবরাজ সোলাইমান ইবনে আব্দুল মালিক বইটি হাতে নিয়ে পড়েন। কিন্তু বইতে মদিনার আনসার সাহাবিদের বীরত্ব ও ত্যাগের বেশ প্রশংসা দেখে তিনি ঈর্ষান্বিত হন, কারণ উমাইয়াদের সঙ্গে আনসারদের রাজনৈতিক বিরোধ ছিল প্রকাশ্য।
তাঁর নির্দেশে সেই প্রাচীন সিরাত গ্রন্থটি পুড়িয়ে ফেলা হয়, যাতে উমাইয়াদের বাইরের কোনো গোত্রের বীরত্বগাথা সিরিয়াবাসীদের সামনে না পৌঁছায়। (জুবাইর ইবনে বাক্কার, আল-আখবারুল মুওয়াফফাকিয়্যাত, পৃষ্ঠা: ৮৯, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৬)
ইমাম ইবনে হাজাম আন্দালুসি (মৃ. ৪৫৬ হি.) ইসলামি আইনের (ফিক্হ) ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি প্রচলিত মাজহাবের বিপরীতে গিয়ে ‘জাহিরি’ ফিকহি মতবাদ প্রচার শুরু করেন। এতে দরবারী আলেমদের একাংশ, বিশেষ করে আন্দালুসের মালেকি ফকিহরা ক্ষুব্ধ হন।
ইমাম জাহাবি লিখেছেন, ইবনে হাজামের স্পষ্টবাদিতার কারণে তৎকালীন মালেকি ফকিহরা তাঁর বিরুদ্ধে একজোট হন। তাঁরা শাসক মুতাজিদ ইবনে আব্বাদকে কান পড়া দেন এবং রাজশক্তিকে ব্যবহার করে ইবনে হাজামকে শুধু স্বদেশ থেকে বিতাড়িত করেননি, বরং তাঁর লেখা বইপুস্তক প্রকাশ্যে পুড়িয়ে দেওয়ার রাজকীয় ফরমান জারি করান। (শামসুদ্দিন জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১৮/১৯৮, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৮৫)
এই ঘটনার পর ইবনে হাজাম একটি কবিতা রচনা করেন, যা ইতিহাসে খ্যাত, “তোমরা যদি আমার কাগজের পাতাগুলো পুড়িয়েও দাও,/কাগজের ভেতরের জ্ঞানকে তো পোড়াতে পারবে না!/কারণ সেই জ্ঞান রয়েছে আমার বক্ষপঞ্জরে,/আমি যেখানেই যাই, জ্ঞানও আমার সঙ্গে ভ্রমণ করে।/তোমরা কাগজ পুড়িয়েছ বটে, তবে মনে রেখো—/খ্রিষ্টানরা যখন সীমান্ত শহরগুলো দখল করে,/তারাও এভাবে পবিত্র কোরআন পুড়িয়ে দেয়!”
সুলতান রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করেন, সমগ্র রাজ্যে যেখানেই গাজালির ইহইয়া গ্রন্থটি পাওয়া যাবে, তা যেন আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। কেউ এই বই লুকিয়ে রাখলে তার রক্তপাত ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করারও হুমকি দেওয়া হয়।
তাঁর মৃত্যুর প্রায় দেড় শতক পর সুলতান মনসুর ইয়াকুব ইবনে ইউসুফ আল-মুওয়াহহিদি ক্ষমতায় আসেন; যিনি ইবনে হাজামের গুণমুগ্ধ। তিনি সেই অপমানের ‘প্রতিশোধ’ নিতে আন্দালুস ও মরক্কোর সকল মালেকি ফিকহের বইপত্র সংগ্রহ করে উটের পিঠে বয়ে আনেন এবং ফেজ শহরের বিশাল চত্বরে নামিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দেন। (আব্দুল ওয়াহিদ আল-মারাকুশি, আল-মুজিব ফি তালখিস আখবারিল মাগরিব, পৃষ্ঠা: ২১০, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৮)
ইমাম গাজালির (মৃ. ৫০৫ হি.) ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন নিয়েও একই ঘটনা ঘটে। তাঁর এই যুগান্তকারী গ্রন্থ তখন ইসলামি চিন্তাজগতে প্রচণ্ড আলোড়ন তোলে। ফিকহের বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি অন্তরের পরিশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিকতার (তাসাউফ) অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে এই গ্রন্থে।
তৎকালীন মরক্কো ও আন্দালুসের মালেকি ফকিহদের একাংশ বিষয়টি সহজে মেনে নিতে পারেননি। তারা এর ভেতরে ‘বিদআত’ ও ‘ইসলাম পরিপন্থী’ তত্ত্ব আবিষ্কারে মরিয়া হয়ে ওঠেন।
সেকালের মুরাবিতুন রাজবংশের শাসক আলি ইবনে তাশফিন (মৃ. ৫৩৮ হি.) ছিলেন সরলমনা এবং ফকিহদের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। কর্দোবা ও গ্রানাদার প্রধান বিচারক (কাজি) মুহাম্মদ ইবনে আলি ইবনে হামদিনের নেতৃত্বে ফকিহরা ফতোয়া দেন, গাজালির বইয়ে কুফরি ও ধর্মদ্রোহিতা রয়েছে।
যথারীতি সুলতান রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করেন, সমগ্র রাজ্যে যেখানেই গাজালির ইহইয়া পাওয়া যাবে, তা যেন আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। কেউ এই বই লুকিয়ে রাখলে তার রক্তপাত ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করারও হুমকি দেওয়া হয়। (মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ এনান, দাওলাতুল ইসলাম ফিল আন্দালুস, ৩/১২৩, হাইয়াহ আল-মিসরিয়্যাহ আল-আম্মাহ লিল কিতাব, কায়রো, ১৯৮৬)
মুরাবিতুন শাসনামলে দীর্ঘ চার দশক ধরে এই বই পড়া নিষিদ্ধ ছিল। পরে মুওয়াহহিদুন রাজবংশ এলে গাজালির বইটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পুনর্বাসিত হয়।
পাশ্চাত্যে ‘অ্যাভেরোস’ নামে পরিচিত আন্দালুসের দার্শনিক, ফকিহ ও চিকিৎসক ইবনে রুশদ (মৃ. ৫৯৫ হি.) ছিলেন সুলতান মনসুর আল-মুওয়াহহিদির ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কিন্তু স্পেনের খ্রিষ্টান রাজন্যবর্গের সঙ্গে যুদ্ধ ঘনিয়ে এলে সুলতানের জন্য রক্ষণশীল আলেম ও সাধারণ জনগণের রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখা অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
ইবনে রুশদের বিরোধীরা সুযোগটি কাজে লাগায়। তারা সুলতানের সামনে তাঁর বইপত্রের কিছু লাইন তুলে ধরে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে তিনি ‘কুফরি’ দর্শনে বিশ্বাসী।
ক্ষমতার ধরে রাখতে সুলতান তাঁর দীর্ঘদিনের এই বন্ধুকে ত্যাগ করেন। তাঁকে দরবার থেকে অপমানিত করে নির্বাসনে পাঠানো হয় এবং চিকিৎসা ও গণিত সংক্রান্ত বই ছাড়া সমস্ত দার্শনিক ও যুক্তিবিদ্যার বই জনসম্মুখে পুড়িয়ে ফেলার আদেশ দেওয়া হয়। (ইবনে আবু উসাইবিয়াহ, উয়ুনুল আনবা ফি তাবাকাতিল আতিব্বা, পৃষ্ঠা: ৩২০, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৬৫)
৪২০ হিজরিতে সুলতান মাহমুদ গজনভি রায় (ইরান) অঞ্চল জয় করেন। তখন তাঁর সৈন্যরা সেখানকার শিয়া বুয়াইহি রাজাদের বিশাল লাইব্রেরিগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেন।
যেহেতু তারা নিজেদের সুন্নি খলিফার অনুগত হিসেবে প্রমাণ করতে চেয়েছিল, তাই মুতাজিলা (যুক্তিাবাদী) এবং দর্শনের সমস্ত বইকে ‘ধর্মদ্রোহী’ আখ্যা দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়। (ইবনুল আসির, আল-কামিল ফিত-তারিখ, ৯/৩৭৩, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৬৭)
অনেক মুসলিম সাহিত্যিক সমাজের অবহেলা, রাজনৈতিক হয়রানির ভয় কিংবা মানসিক অবসাদে ভুগে নিজ হাতে জীবনের শ্রেষ্ঠ রচনাগুলো পুড়িয়ে বা পানিতে ভাসিয়ে নষ্ট করে ফেলেছেন।
ইতিহাসের আরেকটি অদ্ভুত ও বেদনাদায়ক দিক হলো, অনেক মুসলিম সাহিত্যিক সমাজের অবহেলা, রাজনৈতিক হয়রানির ভয় কিংবা মানসিক অবসাদে ভুগে নিজ হাতে জীবনের শ্রেষ্ঠ রচনাগুলো পুড়িয়ে বা পানিতে ভাসিয়ে নষ্ট করে ফেলেছেন।
আবু হাইয়ান আত-তাওহিদি (মৃ. ৪০০ হি.) জীবনের শেষভাগে এসে তীব্র দারিদ্র্য ও সমাজের অবহেলার শিকার হন। এ সময় তিনি তাঁর সমস্ত বই আগুনে পুড়িয়ে দেন। তাঁর বন্ধু কাজি আবু সাহল এই ঘটনায় খুবই দুঃখ পান।
তখন তিনি তাঁকে এক দীর্ঘ চিঠিতে জবাব দেন, “কেন আমি বইগুলো পুড়িয়েছি, তার কারণ তোমার জানা নেই। বইগুলো লিখেছিলাম মানুষের সম্মানের জন্য, তাদের উপকারের জন্য। কিন্তু বিশ বছর ধরে এই সমাজে থেকেও কোনো সমাদর পাইনি, উল্টো ক্ষুধার জ্বালায় মানুষের দুয়ারে হাত পাততে হয়েছে। আমার কোনো উপযুক্ত সন্তান বা যোগ্য শিষ্য নেই, যে এই সকল বইয়ের যত্ন নেবে। তাই চাইনি যে আমার মৃত্যুর পর একদল মূর্খ লোক এগুলো নিয়ে খেলা করুক কিংবা ভুলত্রুটি বের করে আমাকে গালি দিক!” (ইয়াকুত আল-হামাভি, মু’জামুল উদাবা, ৪/৪১২, দারুল কারব আল-ইসলামি, বৈরুত, ১৯৯৩)
তাওহিদি একা নন, সুফি জীবন বেছে নেওয়ার পর আরবি ব্যাকরণের বিখ্যাত পণ্ডিত আবু আমর ইবনে আল-আলা তাঁর সংগৃহীত সব কবিতার পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। (জামালুদ্দিন আল-কিফতি, ইনবাহুর রুওয়াত আলা আনবাহিন নুহাত, ২/২৫, দারুল ফিকরিল আরাবি, কায়রো, ১৯৫০)
জ্ঞান আজ ঠিকই তার স্বমহিমায় ভাস্বর হয়ে পুরো বিশ্বকে আলোকিত করছে, আর যারা ক্ষমতার লোভে সেই আলোর উৎসকে পুড়িয়ে দিতে চেয়েছিল, ইতিহাসের আদালতে তারা আজ চিরকালের জন্য নিন্দিত অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছে।
সূত্র. আল–জাজিরা ডট নেট