পাথেয়

নবীজি যেভাবে দরিদ্রদের সদকা করতে শিখিয়েছেন

মদিনায় দরিদ্র সাহাবিদের মনেও পরকালের সওয়াব অর্জনের তীব্র প্রতিযোগিতা ছিল। একবার দরিদ্র মুহাজিরদের দল নবীজির কাছে এসে বললেন, “ধনবান লোকেরা তো সব সওয়াব নিয়ে গেল! আমরা যেভাবে নামাজ–রোজা করি করি, তারাও করে। কিন্তু তারা দান-সদকা করে, দাস মুক্ত করে, হজ–ওমরাহ করে; যার সামর্থ্য আমাদের নেই।”

মহানবী (সা.) বললেন, “আল্লাহ কি তোমাদের এমন অনেক কিছু দেননি যা তোমরা সদকা করতে পারো? প্রতিটি তসবিহ (সুবহানাল্লাহ) বলা একটি সদকা, প্রতিটি তাকবির (আল্লাহু আকবার) বলা একটি সদকা, প্রতিটি তাহমিদ (আলহামদুলিল্লাহ) ও তাহলিল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) বলা একটি সদকা। ভালো কাজের আদেশ দেওয়া ও মন্দ কাজ থেকে বারণ করাও একটি সদকা। এমনকি তোমাদের পারস্পরিক দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যেও রয়েছে সদকার সওয়াব।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০০৬)।

সাহাবিরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, মানুষ নিজের জৈবিক চাহিদা পূরণ করলেও কি সওয়াব পাবে? নবীজি বুঝিয়ে বললেন, অবৈধ উপায়ে চাহিদা মেটালে যেমন পাপ হতো, তেমনি বৈধ উপায়ে মেটানোতে সওয়াব রয়েছে।

অন্য হাদিসে আছে, তিনি তাঁদের নামাজের পর ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ ও আল্লাহু আকবার বলার আমল শিখিয়ে দেন, যা তাঁদের সওয়াবের বিচারে ধনীদের সমকক্ষ করে দেয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৪৩)

তোমার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে সুন্দর করে একটু হাসা একটি সদকা, তোমার বালতি থেকে ভাইয়ের পাত্রে পানি ঢেলে দেওয়াও একটি সদকা।
সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৫৬

‘প্রতিটি সৎকাজই সদকা’

মহানবী (সা.) স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন, “প্রতিটি ভালো ও কল্যাণকর কাজই সদকা।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০২১)

তিনি বলেছেন, “তোমার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে সুন্দর করে একটু হাসা একটি সদকা, তোমার বালতি থেকে ভাইয়ের পাত্রে পানি ঢেলে দেওয়াও একটি সদকা।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৫৬)

এভাবে জীবনের ছোট ছোট সৌজন্যমূলক আচরণকে ইসলামে ইবাদতের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

মহানবী (সা.) বলেন, “মানুষের শরীরের প্রতিটি জোড়ার জন্য প্রতিদিন সদকা দেওয়া আবশ্যক। দুজন মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার ও মীমাংসা করে দেওয়া একটি সদকা; কাউকে সওয়ারিতে উঠতে সাহায্য করা বা তার সামান তুলে দেওয়া একটি সদকা; সুন্দর একটি কথা বলা একটি সদকা; নামাজের দিকে হেঁটে যাওয়া প্রতিটি কদম একটি সদকা; আর রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলাও একটি সদকা।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৯৮৯)

এমনকি পরিবেশ রক্ষা ও জীববৈচিত্র্যের যত্ন নেওয়াকেও সদকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, “কোনো মুসলিম যদি একটি বৃক্ষ রোপণ করে বা ফসল ফলায়, আর তা থেকে কোনো মানুষ, পাখি বা পশুপাখি আহার করে—তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে; এমনকি কেউ যদি তা থেকে কিছু চুরিও করে নেয়, সেটাও তার জন্য সদকা।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩২০)

সদকার এই ধারণা প্রমাণ করে যে পরকালের সওয়াব অর্জন শুধু ধনীদের অধিকার নয়। এতে ধনী-দরিদ্র, সচ্ছল-অসচ্ছল নির্বিশেষে সবার জন্যই সমান সুযোগ খোলা রয়েছে।

সদকার দুই ধরন

নবীজির হাদিসগুলো বিশ্লেষণ করলে সদকাকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:

১. ব্যক্তিগত সদকা: যেসব সৎকাজের সুফল মূলত ব্যক্তির নিজের আত্মিক উন্নতি ও আমলনামায় সীমাবদ্ধ থাকে। যেমন—তসবিহ পাঠ করা, জিকির করা, ভালো কথা বলা কিংবা নিজের জন্য হালাল আহারের ব্যবস্থা করা।

২. জনকল্যাণমুখী সদকা: যেসব কাজের প্রভাব সমাজ, পরিবার ও অন্য মানুষের জীবনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। যেমন—সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করা, পথ থেকে পাথর, কাঁটা বা ময়লা সরানো, অন্যকে পথ দেখানো, দৃষ্টিশক্তি দুর্বল মানুষকে সাহায্য করা এবং মানুষের কলহে সমঝোতা এনে দেওয়া।

পারিবারিক জীবনে অর্থ ব্যয় করাকেও রাসুল (সা.) সবচেয়ে বড় সদকা হিসেবে অভিহিত করেছেন। সাহাবি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসকে তিনি বলেছিলেন, “তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যে খরচই করো না কেন, তার জন্য তোমাকে সওয়াব দেওয়া হবে; এমনকি তোমার স্ত্রীর মুখে যে গ্রাস তুলে দাও, সেটিও একটি সদকা।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬)

অন্য হাদিসে এসেছে, “নিজের জন্য যা আহার জোগাও তা সদকা, তোমার সন্তান, স্ত্রী ও সেবকের জন্য যা আহারের ব্যবস্থা করো—তাও তোমার জন্য সদকা।” (আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৮২)

এমনকি যার ধন-সম্পদ নেই এবং শারীরিক বা সামাজিক কোনো সেবামূলক কাজ করারও সুযোগ পাচ্ছে না, তার জন্য রাসুল (সা.) সদকার সহজ একটি রূপ বাতলে দিয়েে বলেছেন, “কাউকে কষ্ট দেওয়া বা ক্ষতি করা থেকে নিজেকে বিরত রাখা; কারণ এটিও নিজের আত্মার জন্য একটি সদকা।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৪)

সদকার এই ধারণা প্রমাণ করে যে পরকালের সওয়াব অর্জন শুধু ধনীদের অধিকার নয়। এতে ধনী-দরিদ্র, সচ্ছল-অসচ্ছল নির্বিশেষে সবার জন্যই সমান সুযোগ খোলা রয়েছে।

প্রয়োজন শুধু একটি সচেতন হৃদয়, সুন্দর অনুভূতি ও বিশুদ্ধ নিয়ত। মানুষের প্রতিটি দিনই হতে পারে অসংখ্য সদকা অর্জনের পরম সুযোগ। আর এই কল্যাণকর কাজেই তো মানুষের প্রতিযোগিতা করা উচিত।