পবিত্র কাবা ঘর সম্পর্কে এই ৬ তথ্য কি আপনি জানতেন

পবিত্র কাবা শরিফে প্রতি বছর লাখো মানুষ হজব্রত পালন করতে যান। আমরা দৈনিক ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি কাবার দিকে ফিরে। কাবাকে বলা হয় বাইতুল্লাহ, মানে আল্লাহর ঘর।

আর পৃথিবীতে ৩টি মসজিদকে ‘হারাম’ বা সম্মানিত বলা হয়, যার প্রথমটি হলো কাবা। কাবা প্রতিটি মুসলিমের হৃদয়ের কেন্দ্রভূমি।

আজ আমরা কাবা সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য জানাচ্ছি, যা আমাদের অনেকেরই অজানা।

১. কাবার বিবর্তন ও পুনর্গঠন

অনেকের ধারণা, বর্তমান কাবা শরিফ হুবহু নবী ইব্রাহিম ও ইসমাইল (আ.)-এর আমলের সেই আদি কাঠামো। আসলে তা নয়। বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও যুদ্ধের কারণে কাবা বেশ কয়েকবার পুনর্নির্মিত হয়েছে।

নবীজি (সা.) চেয়েছিলেন কাবাকে নবী ইব্রাহিমের আদি ভিত্তির ওপর পুনর্নির্মাণ করতে, কিন্তু নতুন মুসলিমদের মনে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে ভেবে তিনি তা করেননি।

মহানবীর নবুয়ত প্রাপ্তির আগে কোরাইশরা যখন কাবা পুনর্গঠন করে, তখন অর্থের অভাবে তারা হজরত ইব্রাহিমের মূল ভিত্তির একটি অংশ দেয়ালের বাইরে রেখে দেয়। এই অংশটিই আজ ‘হিজরে ইসমাইল’ বা ‘হাতিম’ নামে পরিচিত।

নবীজি (সা.) নিজেও চেয়েছিলেন কাবাকে নবী ইব্রাহিমের আদি ভিত্তির ওপর পুনর্নির্মাণ করতে, কিন্তু নতুন মুসলিমদের মনে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে ভেবে তিনি তা করেননি। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫৮৩)

পরে আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.) এটি বড় করে নির্মাণ করলেও উমাইয়াদের সময় তা আবার কোরাইশদের নকশায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়। ইমাম মালিক (রহ.)-এর পরামর্শে খলিফা হারুনুর রশিদ একে আর পরিবর্তন করেননি যাতে কাবা শাসকদের হাতের খেলনায় পরিণত না হয়।

২. হাজরে আসওয়াদ চুরি

ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম স্তম্ভিতকর ঘটনা ঘটে ৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে। ‘কারমাতি’ নামক এক চরমপন্থী গোষ্ঠী হজের সময় মক্কায় আক্রমণ চালিয়ে হাজারো হাজিকে হত্যা করে এবং পবিত্র হাজরে আসওয়াদ ছিনতাই করে বাহরাইনে নিয়ে যায়। (ইবনে কাসির, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১১/১৬০, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০৩)

দীর্ঘ ২২ বছর হাজরে আসওয়াদ মক্কায় ছিল না। ৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে এটি পুনরায় মক্কায় ফিরিয়ে আনা হয়। তবে বর্তমানে পাথরটি একটি আস্ত খণ্ড নয়, বরং কয়েকটি ছোট খণ্ডের সমষ্টি যা রূপালি ফ্রেমে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে।

তিনি ঘোষণা করেন, জালেম ছাড়া কেউ তাদের কাছ থেকে এই চাবি কেড়ে নেবে না। আজও সেই বংশের উত্তরসূরিরাই কাবার চাবি সংরক্ষণ করেন।

৩. ১ লাখ গুণ সওয়াব

কাবার চত্বরে বা মসজিদে হারামে ইবাদতের সওয়াব অন্য যেকোনো মসজিদের চেয়ে বহুগুণ বেশি। নবীজি (সা.) বলেছেন, “মসজিদে হারামে এক ওয়াক্ত নামাজ পড়া অন্য সব মসজিদের চেয়ে এক লক্ষ গুণ বেশি সওয়াব।” (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৪০৬)

গাণিতিক হিসাবে, এখানে এক ওয়াক্ত নামাজ পড়া অন্য জায়গায় প্রায় ৫৫ বছর নামাজ পড়ার সমান। এটি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মহানবীর উম্মতের জন্য এক বিশাল রহমত।

কারণ মানুষের জীবন সীমিত, আর এই এক একটি আমল সেই সীমিত জীবনকে হাজার বছরের ইবাদতে পূর্ণ করার সুযোগ দেয়।

৪. কাবার চাবির উত্তরাধিকরা

মক্কা বিজয়ের পর মহানবী (সা.) কাবার চাবি ওসমান ইবনে তালহার বংশধরদের হাতে ফিরিয়ে দেন। তিনি ঘোষণা করেন, জালেম ছাড়া কেউ তাদের কাছ থেকে এই চাবি কেড়ে নেবে না। আজও সেই বংশের উত্তরসূরিরাই কাবার চাবি সংরক্ষণ করেন।

তিনি বলেছিলেন, “হে বনু তালহা, এটি গ্রহণ করো চিরস্থায়ীভাবে...।” (ইবনে হাজার, আল-ইসাবাহ ফি তাময়িযিস সাহাবাহ, ৪/৪৪৭, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৪১৫ হি.)

৫. কাবার গিলাফ পরিবর্তন

কাবার গিলাফকে বলা হয় ‘কিসওয়া’। কাবার গিলাফ সবসময় কালো ছিল না। বিভিন্ন সময় এটি সাদা, সবুজ এমনকি লাল রঙেরও পরানো হয়েছে। আব্বাসীয় খলিফাদের সময় থেকে কালো গিলাফ ব্যবহারের প্রথা স্থায়িত্ব পায়।

কাবা শরিফের ঠিক ওপরে সপ্তম আসমানে ফেরেশতাদের একটি পবিত্র ইবাদতগাহ আছে, যার নাম বাইতুল মামুর। একে বলা হয় ফেরেশতাদের কাবা

বর্তমানে প্রতি বছর হজের সময় অত্যন্ত দামি রেশমি কাপড় ও স্বর্ণের সুতা দিয়ে তৈরি নতুন গিলাফ পরানো হয়। (আজ-জরাকাশি, আখবারু মাক্কাহ, ১/২৫২, মাকতাবাতুস সাকাফাহ, মক্কা, ১৯৯৬)

৬. ফেরেশতাদের ‘কাবা’

কাবা শরিফের ঠিক ওপরে সপ্তম আসমানে ফেরেশতাদের একটি পবিত্র ইবাদতগাহ আছে, যার নাম বাইতুল মামুর। একে বলা হয় ফেরেশতাদের কাবা, যেখানে প্রতিদিন ৭০,০০০ ফেরেশতা ইবাদতের জন্য প্রবেশ করেন এবং একবার বের হলে আর ফিরে আসেন না।

মিরাজের রাতে নবীজি এখানে নবী ইব্রাহিম (আ.)–কে দেখেছিলেন। সুরা তুরের ৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ–তাআলা এই ঘরের কসম খেয়েছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২০৭)