মাত্র দুই বছর তিন মাসের সংক্ষিপ্ত শাসনকাল। এই সামান্য সময়ের ভেতরেই আরবের বুকে ছড়িয়ে পড়া স্বধর্মত্যাগ ও গৃহযুদ্ধের উত্তাল আগুন নিভিয়ে এক অখণ্ড রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.)।
অভ্যন্তরীণ সংহতি নিশ্চিত করার পর তিনি রোমান ও পারস্য পরাশক্তির সম্ভাব্য হুমকি রুখতে সিরিয়া ও ইরাকের দিকে বিজয়ের অগ্রযাত্রা শুরু করেছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্র যখন স্থিতিশীলতার মুখ দেখতে শুরু করে, তখনই ঘনিয়ে আসে তাঁর জীবনের শেষ প্রহর।
প্রথম খলিফ আবু বকরের বিদায় ছিল ক্ষমতা, জনমত, পরামর্শ (শুরা) এবং জনগণের আমানতের ব্যাপারে এক অনন্য নৈতিক ও রাজনৈতিক পাঠ। ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়, পরবর্তী খলিফা হিসেবে ওমর (রা.)-এর মনোনয়ন ছিল খোলামেলা ও সর্বজনীন ‘শুরা’ প্রক্রিয়ার ফলাফল।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. আর-রায়িস বিষয়টি ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন যে পরবর্তীকালের রাজতান্ত্রিক উত্তরাধিকার ব্যবস্থার সঙ্গে আবু বকরের এই পদক্ষেপের দূরতম সম্পর্কও ছিল না; বরং এটি ছিল জনমতের ভিত্তিতেই গৃহীত এক সুচিন্তিত পদক্ষেপ। (মুহাম্মদ জিয়াউদ্দিন আর-রায়িস, আন-নাজারিইয়াতুস সিয়াসিয়্যাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ১১২, দারুত তুরাস, কায়রো, ১৯৭৬)
প্রত্যেকের কাছে তিনি জানতে চান ওমর সম্পর্কে তাঁদের নিরপেক্ষ মতামত কী। ছোটখাটো মেজাজের কঠোরতা ছাড়া নেতৃত্ব ও যোগ্যতার প্রশ্নে সবাই ওমরের ব্যাপারে পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেন।
খলিফা আবু বকর (রা.) রোগশয্যায় উপলব্ধি করেছিলেন যে তাঁর সময় ফুরিয়ে আসছে। নেতৃত্ব নিয়ে যাতে মুসলিমদের মাঝে নতুন করে অনৈক্য তৈরি না হয়, সেজন্য তিনি তিনটি ধাপে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরের পথ তৈরি করেন:
১. ক্ষমতা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া: অসুস্থতা গুরুতর রূপ নিলে আবু বকর (রা.) জনগণকে একত্র করেন। তিনি নিজের ওপর অর্পিত বায়াত থেকে সবাইকে মুক্ত ঘোষণা করে বলেন, “তোমরা দেখতে পাচ্ছ আমার কী অবস্থা হয়েছে। আমার মনে হয় বিদায়ের সময় সমাগত। আল্লাহ তোমাদের ওপর থেকে আমার বায়াতের অঙ্গীকার প্রত্যাহার করে নিয়েছেন এবং তোমাদের ক্ষমতা তোমাদের হাতেই ফিরিয়ে দিয়েছেন। অতএব, তোমরা নিজেদের মধ্য থেকে যাকে খুশি নেতা বানিয়ে নাও। আমার জীবদ্দশায় যদি তোমরা এ বিষয়ে একমত হতে পারো, তবে আমার পরে তোমাদের মধ্যে আর কোনো বিভেদ সৃষ্টি হবে না।” (ইবনে আসাকির, তারিখু দিমাশক, ৩০/৪১২, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৫)
২. খলিফাকে দায়িত্ব অর্পণ: খলিফার এই বক্তব্যের পর সাহাবিরা নিজেদের মধ্যে দফায় দফায় আলোচনা করেন। কিন্তু তাঁরা কোনো একক ব্যক্তির ব্যাপারে একমত হওয়ার চেয়ে গৃহবিবাদের আশঙ্কা করেন। ফলে তাঁরা পুনরায় খলিফার কাছে এসে অনুরোধ জানান, ‘আপনিই আমাদের জন্য সিদ্ধান্ত নিন।’
খলিফা তখন তাঁদের জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমি যদি কারও নাম প্রস্তাব করি, তবে কি তোমরা তাতে মতবিরোধ করবে?’ সবাই সমস্বরে বললেন, ‘না।’ আবু বকর (রা.) তখন বললেন, ‘তবে আমাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি, তাঁর ধর্ম ও বান্দাদের কল্যাণের কথা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটু অবকাশ দাও।’
৩. শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ: তিনি তৎকালীন শীর্ষ সাহাবি ও নীতিনির্ধারক (আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ)—যেমন আব্দুর রহমান ইবনে আওফ, ওসমান ইবনে আফফান, উসাইদ ইবনে হুদাইর এবং সাইদ ইবনে জায়েদ (রা.)-সহ আনসার ও মুহাজির নেতাদের সঙ্গে একান্তে কথা বলেন।
প্রত্যেকের কাছে তিনি জানতে চান ওমর সম্পর্কে তাঁদের নিরপেক্ষ মতামত কী। ছোটখাটো মেজাজের কঠোরতা ছাড়া নেতৃত্ব ও যোগ্যতার প্রশ্নে সবাই ওমরের ব্যাপারে পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেন। এরপরই শুধু আবু বকর (রা.) একটি দলিলে ওমরের নাম চূড়ান্ত করেন এবং সমবেত জনতা স্বেচ্ছায় সেই সিদ্ধান্তকে বায়াতের মাধ্যমে গ্রহণ করে।
ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার সময় আবু বকর (রা.) নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন, আল্লাহর দরবারে দাঁড়ানোর আগে যেন তাঁর কাঁধে মুসলিমদের কোনো অন্যায্য সম্পদ অবশিষ্ট না থাকে।
গবেষক ও চিন্তাবিদ আলি আত-তানতাবি এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের তাৎপর্য তুলে ধরে লিখেছেন, “ওমর (রা.)-এর এই মনোনয়ন স্বৈরতান্ত্রিক কোনো ফরমান ছিল না; বরং তা পরিচালিত হয়েছিল শুরার সবচেয়ে বিশুদ্ধ, ইনসাফপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে।” (আলি আত-তানতাবি, আবু বকর আস-সিদ্দিক, পৃষ্ঠা: ২৫০, দারুল মানারা, জেদ্দা, ১৯৮৬)
ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার সময় আবু বকর (রা.) নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন, আল্লাহর দরবারে দাঁড়ানোর আগে যেন তাঁর কাঁধে মুসলিমদের কোনো অন্যায্য সম্পদ অবশিষ্ট না থাকে।
সুস্থ থাকা অবস্থায় তিনি কন্যা আয়েশাকে নিজের ব্যক্তিগত একটি খেজুরবাগান দান করেছিলেন। কিন্তু মৃত্যুশয্যায় এসে কন্যার হাত ধরে বললেন, “মা, আমি তোমাকে যে জমিটুকু দিয়েছিলাম, তা নিয়ে আমার মনে দ্বিধা তৈরি হয়েছে। তুমি যদি তা পরিবারের সকল ওয়ারিশের সাধারণ উত্তরাধিকারের মাঝে ফিরিয়ে দাও, তবে আমি নিশ্চিন্ত হতে পারি।”
আয়েশা (রা.) পরম শ্রদ্ধায় পিতার সেই জমি ফিরিয়ে দেন, যাতে তাঁর মৃত্যুর পর অন্য কোনো সন্তান বা ওয়ারিশ ন্যায্য অংশ থেকে বঞ্চিত না হয়।
আর রাষ্ট্রীয় সম্পদ বা বায়তুল মালের ব্যাপারে তাঁর সতর্কতা ছিল অবিশ্বাস্য। খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি ব্যক্তিগত কোনো বেতন নিতেন না; শুধু রাষ্ট্রীয় কাজ পরিচালনার স্বার্থে বায়তুল মাল থেকে তাঁকে একজন খাদেম, বাগানে সেচ দেওয়ার একটি উট এবং যৎসামান্য খাবারের ব্যবস্থা দেওয়া হয়েছিল।
মৃত্যুর সময় তিনি নির্দেশ দিলেন, এই উট, খাদেম এবং কোষাগারের অবশিষ্ট কয়েক দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) যেন তাঁর মৃত্যুর পর নতুন খলিফা ওমরের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
আয়েশা (রা.) পিতার অন্তিম নির্দেশের কথা স্মরণ করে বলেন, “আবু বকর যখন মৃত্যুর মুখোমুখি হন, তখন বললেন, ‘আমি বায়তুল মালের এক পয়সাও নিজের জন্য অবশিষ্ট রাখিনি; শুধু দুধ পান করার এই উটটি এবং এই তরবারি শান দেওয়ার খাদেমটি ছাড়া, যে মুসলিমদের যুদ্ধাস্ত্র ঠিক করত এবং আমাদের সামান্য সাহায্য করত। আমি মারা গেলে এগুলো ওমরের হাতে তুলে দিয়ো।’
আয়েশা (রা.) যখন এগুলো ওমরের কাছে পৌঁছে দিলেন, তখন ওমর (রা.) অঝোর ধারায় কেঁদে ফেলে বললেন, ‘আল্লাহ আবু বকরের ওপর রহম করুন, তিনি তাঁর পরবর্তী উত্তরসূরিদের অত্যন্ত কঠিন এক পরীক্ষার মুখে ফেলে গেছেন’।” (মুহাম্মদ ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ৩/১৯২, দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৬৮)
ওমর (রা.) তাঁর জানাজার নামাজের ইমামতি করেন। রাতের নিস্তব্ধতায় মদিনার মানুষের চোখের জলে তিনি শায়িত হন নবীজির কবরের পাশে। তাঁর মাথা রাখা হয় নবীজির কাঁধ বরাবর।
আবু বকর (রা.)-এর অসুস্থতার কারণ নিয়ে ইতিহাসে দুটি বর্ণনা পাওয়া যায়। প্রথমটি হলো, হাড়কাঁপানো শীতের এক রাতে তিনি গোসল করার পর তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হন। এই জ্বর টানা পনেরো দিন স্থায়ী হয় এবং তিনি বিছানা থেকে ওঠার শক্তি হারিয়ে ফেলেন; এ সময় তিনি ওমরকে নামাজের ইমামতি করার দায়িত্ব দেন।
দ্বিতীয় বর্ণনাটি হলো বিষক্রিয়ার প্রভাব। তাবেয়ি ইমাম ইবনে শিহাব আজ-জুহরি থেকে বর্ণিত আছে যে এক বছর পূর্বে আবু বকর (রা.) এবং চিকিৎসক আল-হারিস ইবনে কালাদাহকে উপহার হিসেবে পাঠানো একটি বিষাক্ত খাবার খেয়েছিলেন।
হারিস তখন বুঝতে পেরে সতর্ক করেছিলেন যে এটি একটি ধীরগতির বিষ, যার প্রভাব এক বছর পর প্রকাশিত হবে। বাস্তবেও সেই ঘটনার প্রায় এক বছর পর উভয়ে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। (শামসুদ্দিন আজ-জাহাবি, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ২/৩০০, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৮২)
অবশেষে হিজরি ১৩ সনের ২২ জমাদিউস সানি, সোমবারের সন্ধ্যায় নবীজির মতোই ঠিক ৬৩ বছর বয়সে তিনি আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান। তাঁর জীবনের শেষ উচ্চারিত বাণী ছিল কোরআনের আয়াত, “আমাকে মুসলিম হিসেবে মৃত্যু দাও এবং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করো।” (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ১০১)
মৃত্যুর পূর্বে তিনি অসিয়ত করেছিলেন, যেন তাঁর স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস তাঁকে গোসল করান। ওমর (রা.) তাঁর জানাজার নামাজের ইমামতি করেন। রাতের নিস্তব্ধতায় মদিনার মানুষের চোখের জলে তিনি শায়িত হন নবীজির কবরের পাশে। তাঁর মাথা রাখা হয় নবীজির কাঁধ বরাবর।