ইসলামের ইতিহাসে জনমত ও জনরোষ

সাধারণত মনে করা হয়, ‘জনমত’ (পাবলিক অপিনয়ন) বিষয়টি আধুনিক গণতন্ত্রের আবিষ্কার। কিন্তু ইসলামের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, মুসলিম সভ্যতায় ‘জনমত’ বা ‘আমজনতার রায়’ ছিল সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান শক্তি।

ইসলামের স্বর্ণযুগে আমজনতা কেবল নীরব দর্শক ছিল না; বরং ফকিহদের তাত্ত্বিক আলোচনায় তাঁদের দেওয়া হয়েছিল ‘ইসমা’ বা অভ্রান্ততার মর্যাদা, আর বাস্তবে তাঁরা গড়ে তুলেছিলেন এমন সব আন্দোলন, যা প্রতাপশালী সুলতানদেরও পদত্যাগে বাধ্য করেছিল।

আজকের এই নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব কীভাবে ইসলামি ঐতিহ্যে জনমত একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেছে।

ইমাম গাজ্জালি ও ইবনে তাইমিয়ার মতো মনীষীরা মনে করতেন, যে বিষয়ে পুরো উম্মাহ একমত হয়, সেখানে ভুলের কোনো স্থান নেই।

‘উম্মাহর ঐক্য’ বনাম ‘আলেমদের ঐক্য’

ইসলামি আইনশাস্ত্রে (উসুলুল ফিকহ) ‘ইজমা’ বা ঐক্যমত্য একটি মৌলিক দলিল। কিন্তু এই ঐক্যে সাধারণ মানুষের স্থান কোথায়? ইমাম আবু হাসান আমিদি (মৃ. ১২৩৪ খ্রি.) তাঁর ‘আল-ইহকাম’ গ্রন্থে একটি বৈপ্লবিক পার্থক্য তুলে ধরেছেন।

তিনি বলেন, “যদি আমরা সাধারণ মানুষকেও ঐক্যের অন্তর্ভুক্ত করি, তবে তাকে বলা হয় ‘উম্মাহর ইজমা’ (কনসেনসাস অব দ্য উম্মাহ)। আর যদি তাদের বাদ দিই, তবে তাকে বড়জোর ‘আলেমদের ইজমা’ বলা যেতে পারে।”

ইমাম গাজ্জালি ও ইবনে তাইমিয়ার মতো মনীষীরা মনে করতেন, যে বিষয়ে পুরো উম্মাহ একমত হয়, সেখানে ভুলের কোনো স্থান নেই। এই সামাজিক সংহতিই ছিল ইসলামের রক্ষাকবচ। আলেমদের কাজ ছিল সাধারণ মানুষকে যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে শরয়ি বিধানের প্রতি আশ্বস্ত করা, কেবল হুকুম চাপিয়ে দেওয়া নয়।

আলেমদের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণে আমজনতার ভূমিকা

ইতিহাসে দেখা যায়, কোনো আলেম কতটা প্রভাবশালী বা ‘ইমাম’ হবেন, তা নির্ধারণ করত আমজনতার সমর্থন।

  • ইমাম বুখারি (রহ.): তিনি যখন তাঁর শহর বোখারায় ফিরলেন, সাধারণ মানুষ শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত প্যান্ডেল সাজিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানায়। এই বিপুল জনসমর্থন দেখে তৎকালীন শাসক ঈর্ষান্বিত হয়ে তাঁকে শহরছাড়া করতে বাধ্য হন।

  • ইমাম ইবনে হারুন (রহ.): খলিফা আল-মামুন তাঁর শাসনকালে ‘কোরআন সৃষ্টি’ সংক্রান্ত ভ্রান্ত মতবাদ চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ভয় পেতেন ইমাম ইয়াজিদ ইবনে হারুনকে। খলিফা বলতেন, “আমি ভয় পাই, আমি এই ঘোষণা দিলে ইয়াজিদ যদি প্রতিবাদ করে, তবে পুরো জনতা তার পক্ষে চলে যাবে এবং দেশে ফিতনা তৈরি হবে।”

ইসলামি রাজনীতিতে ‘বায়াত’ বা আনুগত্যের শপথ কেবল অভিজাতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। খলিফা নির্বাচনের পর ‘বায়াতুল আম্মাহ’ বা সাধারণ জনগণের শপথ ছিল বাধ্যতামূলক।

রাজনৈতিক পরিবর্তন ও ‘জনতার আদালত’

ইসলামি রাজনীতিতে ‘বায়াত’ বা আনুগত্যের শপথ কেবল অভিজাতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। খলিফা নির্বাচনের পর ‘বায়াতুল আম্মাহ’ বা সাধারণ জনগণের শপথ ছিল বাধ্যতামূলক।

  • খলিফা ওসমানের (রা.) যুগ: ইতিহাসে প্রথম বড় ধরনের গণ-আন্দোলন দেখা যায় খলিফা ওসমানের আমলে। মিশরের একদল প্রতিবাদী জনতা যখন মদিনায় এসে গভর্নরের দুর্নীতির অভিযোগ তোলে, তখন হজরত আয়েশা (রা.) ও আলি (রা.) জনমতের পক্ষে দাঁড়িয়ে খলিফাকে পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন। এটি প্রমাণ করে যে, সাহাবিরাও জনগণের দাবিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন।

  • শাসক অপসারণ: ১৭৭৪ সালে মিশরে সাধারণ মানুষ কোরআন হাতে নিয়ে রাস্তায় নেমে আসে এবং দুর্নীতবাজ প্রশাসক ‘ইবনে আরব’-কে অপসারণের দাবি জানায়। জনরোষের মুখে তৎকালীন আমিররা তাঁকে বরখাস্ত করতে বাধ্য হন।

আধুনিক ‘সোশ্যাল মিডিয়া’ বনাম সেকালের ‘প্রতিবাদ’

বর্তমান যুগে মানুষ যেমন ফেসবুকে বা টুইটারে হ্যাশট্যাগ আন্দোলন করে, মধ্যযুগে মুসলিম উম্মাহর প্রতিবাদের ভাষা ছিল ভিন্ন।

ফাতিমি শাসক হাকেম বি আমরিল্লাহ যখন খোদাদ্রোহী আচরণ শুরু করেন, তখন কায়রোর সাধারণ মানুষ কাগজের তৈরি একটি নারীর মূর্তির হাতে একটি চিঠি ধরিয়ে রাস্তার মাঝখানে রেখে দেয়। সেই চিঠিতে শাসকের অপকর্মের তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছিল।

এটি ছিল সেকালের এক অভিনব ‘সিভিল ডিসওবিডিয়েন্স’।

ইসলামি সভ্যতায় ‘জনমত’ ছিল এমন এক অদৃশ্য শক্তি যা ধর্ম ও রাজনীতিকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখত।

আলেম ও জনতার মৈত্রী: আল-আজহারের ভূমিকা

ইতিহাসবিদ জাবারতি বর্ণনা করেছেন, ওসমানিয়া ও মামলুক শাসনামলে যখনই শাসকরা নিপীড়ন করত, আল-আজহারের আলেমরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়ে ধর্মঘট (স্ট্রাইক) ডাকতেন।

বাজার বন্ধ করে দেওয়া হতো, ক্লাস স্থগিত থাকত এবং হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসত। এই ‘পাবলিক প্রেসার’ বা জনগণের চাপের মুখে শাসকরা নতি স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হতো।

শেষ কথা

ইসলামি সভ্যতায় ‘জনমত’ ছিল এমন এক অদৃশ্য শক্তি যা ধর্ম ও রাজনীতিকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখত। আলেমদের গভীর জ্ঞান আর সাধারণ মানুষের অটল ইমানের সমন্বয়ই ছিল ইতিহাসের বড় বড় বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি।

আজকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও এই ঐতিহাসিক শিক্ষাটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, “জনগণ যখন কোনো ন্যায়ের দাবিতে একতাবদ্ধ হয়, তখন কোনো শক্তিই তাদের দমাতে পারে না।”

সূত্র: আলজাজিরা ডটনেট অবলম্বনে