হাদিসে এসেছে, রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে—একটি আনন্দ ইফতারের সময়, আর অন্যটি তখন, যখন সে তার রবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৫১)
রোজার সময় মানুষ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করে। অবশেষে মাগরিব হলে সে ইফতার করে।
তখন তার মধ্যে এমন এক তৃপ্তি ও প্রশান্তি আসে, যার কথা হাদিসে এভাবে বলা হয়েছে, ‘পিপাসা দূর হলো, শিরা-উপশিরা সিক্ত হলো, আর ইনশাআল্লাহ প্রতিদানও নিশ্চিত হয়ে গেল।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২৩৫৭)
রমজান মাস শেষ হওয়ার পরপরই ঈদের দিন আসে। এই ক্রমধারা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সবচেয়ে বড় ইফতার হলো ঈদ। রোজা হলো বিধিনিষেধের সময়, আর ঈদ হলো স্বাধীনতার সময়। রোজা হলো পরিশ্রমের সময়, আর ঈদ হলো আনন্দের সময়।
রোজা ও ঈদ—এই দুটো একেবারে ভিন্ন অভিজ্ঞতা। রোজার মাসে ফজর থেকে মাগরিব পর্যন্ত এবং মাগরিব থেকে আবার ফজর পর্যন্ত জীবন নানা বিধিনিষেধে আবদ্ধ থাকে—এটা করো, ওটা করো না; এই সময়ে খাও, সেই সময়ে খেয়ো না; কখন ঘুমাবে, কখন উঠবে—সবকিছুই নিয়মের অধীন।
পরিশ্রম ও সংযমের মাস শেষ হওয়ার পর আসে ঈদ। সেই দিন হঠাৎ সব নিয়মকানুন পাল্টে যায়। আগে যেখানে রোজা রাখা ফরজ ছিল, সেখানে ঈদের দিনে রোজা রাখা হারাম।
পুরো একটি মাস যেন এমনভাবে কাটে—মানুষ এই উপলব্ধি করে যে তার জীবন পুরাপুরি অন্যের নিয়ন্ত্রণে। তাকে নিজের মন-মর্জিতে নয়, বরং অন্যের হুকুম অনুযায়ী চলতে হয়।
এইভাবে রোজা মানুষকে শিক্ষা দেয় যে, দুনিয়ায় তার জীবন এমন হওয়া উচিত যাতে সে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর তত্ত্বাবধানে সোপর্দ করে। তার প্রতিটি কাজে যেন আল্লাহর নির্দেশই প্রধান হয়ে ওঠে।
এই পরিশ্রম ও সংযমের মাস শেষ হওয়ার পর আসে ঈদ। সেই দিন হঠাৎ সব নিয়মকানুন পাল্টে যায়। আগে যেখানে রোজা রাখা ফরজ ছিল, সেখানে ঈদের দিনে রোজা রাখা হারাম।
আগে যেখানে প্রয়োজনীয় বিষয়েও সংযম আরোপিত ছিল, এখন বলা হয়—স্বাধীনভাবে চলাফেরা করো, আনন্দ করো, উৎসব পালন করো।
এমনকি গরিব মানুষদেরও যেন এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হতে হয়, সে জন্য সামর্থ্যবানদের ওপর সদকায়ে ফিতর নির্ধারণ করা হয়েছে। এ যেন আখেরাতের জীবনের একটি প্রতীকী চিত্র।
এটি সেই দিনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যেদিন আল্লাহর সত্যনিষ্ঠ বান্দাদের ওপর থেকে সব ধরনের সীমাবদ্ধতা তুলে নেওয়া হবে। তারা চিরস্থায়ী শান্তি ও আনন্দের জান্নাতে প্রবেশ করবে—যদিও আজ দুনিয়ার মানুষের কাছে তারা দুর্বল বা তুচ্ছ বলে মনে হতে পারে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে রোজা ও ঈদ দুনিয়া ও আখেরাতের প্রতীকস্বরূপ। দুনিয়ায় মানুষ নানা বিধিনিষেধ ও দায়িত্বের মধ্যে আবদ্ধ থাকে; কিন্তু আখেরাতে তাকে মুক্ত করা হবে, যেখানে সে আনন্দ ও নেয়ামতের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকবে।
রোজা আমাদের শেখায় কীভাবে দুনিয়ার জীবন যাপন করতে হবে। আর ঈদ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় আখেরাতে আমাদের জীবনের প্রকৃতি কেমন হবে।
মানুষের উচিত, রমজানের দিনগুলোতে যখন সে রোজা রাখে, তখন এই রোজাকে যেন দুনিয়ার জীবনের এক প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করে।
রোজা অবস্থায় তার মানসিকতা এমন হওয়া উচিত—যেভাবে এখন আমি খাওয়া ও পান করা থেকে নিজেকে বিরত রেখেছি, ঠিক এভাবেই সব সময় আল্লাহর নিষেধ করা সকল কাজ থেকে আমাকে বিরত থাকতে হবে। এই দুনিয়ায় আমাকে সারাজীবন একজন রোজাদারের মতো থাকতে হবে।
এরপর যখন মাগরিবের ওয়াক্ত হয় এবং সে ইফতার করে, তখন তার মনে এমন অনুভূতি জাগা উচিত—সে এখন আখেরাতের জগতে, আর স্বয়ং আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে তাকে মেহমানদারি করা হচ্ছে।
অশ্রুসিক্ত হৃদয়ে সে যেন বলে ওঠে: হে আল্লাহ, আমি আপনার জন্য রোজা রেখেছি, এখন আপনি আমার জন্য ইফতারের জীবন নির্ধারণ করুন। আমি আপনার সন্তুষ্টি রেজামন্দির জন্য রমজান পূর্ণ করেছি—এখন আপনি আমার জন্য চিরন্তন ঈদ আর সীমাহীন নেয়ামতের দরোজা খুলে দিন।
এভাবেই রোজা ও ঈদ আমাদের জীবনের দুটি পর্যায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। রোজা আমাদের শেখায় কীভাবে দুনিয়ার জীবন যাপন করতে হবে। আর ঈদ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় আখেরাতে আমাদের জীবনের প্রকৃতি কেমন হবে।
একটি দুনিয়ার জীবনের প্রতীকী অবস্থা, আর অন্যটি আখেরাতের জীবনের প্রতীকী ধারণা।
mawlawiashraf@gmail.com
মওলবি আশরাফ : আলেম, লেখক ও অনুবাদক