ধর্ম–দর্শন

মুসলিম পরিবার গঠনে নারী যেভাবে ভূমিকা রাখে

একটি সুস্থ, সুশৃঙ্খল ও নৈতিক সমাজব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় পরিবারের অভ্যন্তরে। আর সেই পরিবারের আত্মিক কেন্দ্রবিন্দু হলো নারী। ইসলামে নারীর মর্যাদা ও অধিকারকে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যে পবিত্র কোরআনে একটি স্বতন্ত্র সুরার নামকরণ করা হয়েছে ‘সুরা নিসা’ (নারী)।

মানবজাতির সৃষ্টি পরম্পরা ও দাম্পত্য সম্পর্কের গভীর তাৎপর্য তুলে ধরে আল্লাহ–তাআলা পৃথিবীর বুকে নর–নারীর সৃষ্টিকে তাঁর কুদরতের অন্যতম বড় নিদর্শন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে অন্যতম হলো—তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করতে পারো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা রুম, আয়াত: ২১)

দাম্পত্যের মূল ভিত্তি

প্রশান্তি, ভালোবাসা ও সহানুভূতি স্বামী–স্ত্রীর পারস্পরিক আস্থা, গভীর মমত্ব ও সহযোগিতার ভিত্তিতেই একটি আদর্শ পরিবার গড়ে ওঠে। দাম্পত্য সম্পর্কের মূল উদ্দেশ্য শুধু শারীরিক সাহচর্য নয়; বরং তা হলো আত্মিক ও মানসিক আশ্রয়।

পবিত্র কোরআনে স্ত্রীর পরিচয় দিতে গিয়ে ‘সাকিনা’ বা অন্তরের পরম শান্তির কথা বলা হয়েছে, ‘তিনিই তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকেই তার স্ত্রীকে বানিয়েছেন, যাতে সে তার কাছে শান্তি পায়।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৮৯)

তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো। তোমরা যদি তাদের অপছন্দ করো, তবে এমনও হতে পারে যে আল্লাহ যাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন, তোমরা তা–ই অপছন্দ করছ।
সুরা আন–নিসা, আয়াত: ১৯

সংসারজীবন কখনো শতভাগ নিখুঁত হতে পারে না; মান–অভিমান, মতভেদ কিংবা স্বভাবের ভিন্নতা আসতেই পারে। ইসলাম সেখানে পারস্পরিক ক্ষমা, ধৈর্য ও দায়িত্বশীলতার নীতি অনুসরণের নির্দেশ দেয়।

স্ত্রীর কোনো আচরণ পছন্দ না হলেও তার ভালো গুণগুলোর দিকে তাকিয়ে সহনশীল থাকার তাগিদ দিয়ে আল্লাহ–তাআলা স্বামীদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো। তোমরা যদি তাদের অপছন্দ করো, তবে এমনও হতে পারে যে আল্লাহ যাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন, তোমরা তা–ই অপছন্দ করছ।’ (সুরা আন–নিসা, আয়াত: ১৯)

উত্তম স্ত্রীর বৈশিষ্ট্য

পরিবারের সামগ্রিক পরিবেশ শান্তিময় রাখতে স্ত্রীর মননশীলতা ও ইতিবাচক মনোভাবের ভূমিকা অপরিসীম। সারা দিনের কর্মব্যস্ততা ও ক্লান্তি শেষে স্বামী ঘরে ফিরে যখন স্ত্রীর মুখে স্নিগ্ধ হাসি ও উষ্ণ সান্নিধ্য পায়, তখন সব ক্লান্তি নিমেষেই দূর হয়ে যায়।

একবার নবীজিকে জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘কোন নারী সবচেয়ে উত্তম?’ তিনি উত্তরে বললেন, ‘স্বামী যার দিকে তাকালে সে তার মন প্রফুল্ল করে দেয়, কোনো বৈধ নির্দেশ দিলে তা সানন্দে পালন করে এবং নিজের সততা ও স্বামীর সম্পদের ব্যাপারে এমন কোনো আচরণ করে না, যা স্বামীর কাছে অপছন্দনীয়।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৩২৩১)

পার্থিব মোহ ও বিভ্রান্তির পথ পরিহার পরিবারে নারীর ভূমিকা শুধু সুখের নয়, নৈতিক দিকনির্দেশনারও। কোনো স্ত্রী যদি স্বামীকে হালাল আয়ে সন্তুষ্ট থাকার অনুপ্রেরণা না জুগিয়ে অতিরিক্ত ভোগবিলাসের চাপে হারাম উপার্জনের দিকে ঠেলে দেয়, তবে সে পরিবার নৈতিকভাবে ধ্বংস হয়ে যায়।

প্রয়োজন স্বামী–স্ত্রীর মধ্যকার গভীর বিশ্বাস, পারস্পরিক হক আদায় ও ত্যাগ স্বীকার। পরিবারে যদি সংঘাত ও অশান্তি বিরাজ করে, তবে তার বিষবাষ্প ধীরে ধীরে সন্তান ও সামগ্রিক সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।

ইসলামে এমন অসৎ প্ররোচনা ও অতিরিক্ত পার্থিব চাহিদাকে মারাত্মক সতর্কতার সঙ্গে দেখা হয়েছে।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা মুমিনদের সতর্ক করে বলেন, ‘হে মুমিনগণ, নিশ্চয়ই তোমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু (অর্থাৎ তাদের অতিরিক্ত মোহ তোমাদের আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারে)। সুতরাং তাদের ব্যাপারে সতর্ক থেকো। তবে তোমরা যদি তাদের মার্জনা করো, এড়িয়ে চলো এবং ক্ষমা করে দাও, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা আত–তাগাবুন, আয়াত: ১৪)

এখানে শত্রুর অর্থ হলো এমন মোহ বা প্ররোচনা, যা মানুষকে তার ইমান ও হালাল উপার্জনের পথ থেকে বিচ্যুত করে ফেলে। এমন পরিস্থিতিতে একজন স্বামীর দায়িত্ব হলো প্রজ্ঞার সঙ্গে স্ত্রীকে নসিহত করা এবং সংশোধনের চেষ্টা অব্যাহত রাখা।

সুস্থ পরিবার থেকেই সুস্থ সমাজ একটি পরিবারের সুখ–শান্তি কোনো কৃত্রিমতা বা লোকদেখানো আচার দিয়ে স্থায়ী হতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন স্বামী–স্ত্রীর মধ্যকার গভীর বিশ্বাস, পারস্পরিক হক আদায় ও ত্যাগ স্বীকার। পরিবারে যদি সংঘাত ও অশান্তি বিরাজ করে, তবে তার বিষবাষ্প ধীরে ধীরে সন্তান ও সামগ্রিক সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।

সমাজ রূপান্তরের সবচেয়ে প্রাথমিক ও মৌলিক দুর্গ হলো পরিবার। আর সেই পরিবারের প্রশান্তির চাবিকাঠি রয়েছে নারীর স্নেহ, প্রজ্ঞা ও নৈতিক দৃঢ়তার হাতে। ঘর ঠিক থাকলে তবেই একটি পরিশুদ্ধ ও নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

  • মাহমুদ হাসান ফাহিম: আলেম ও লেখক