রুশ ও মুসলিম বিশ্বের সম্পর্কের শিকড় এক হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। এই দীর্ঘ পরিক্রমায় যেমন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছে, তেমনি গড়ে উঠেছে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মেলবন্ধনের অনন্য নজির।
বিশেষ করে ককেশাস অঞ্চলের মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে মস্কোর বর্তমান যে সামরিক ও রাজনৈতিক সমীকরণ, যার প্রতিচ্ছবি আমরা ইউক্রেন যুদ্ধে চেচেন যোদ্ধাদের অংশগ্রহণ থেকে দেখতে পাই, তার বীজ নিহিত আছে ইতিহাসের আরও গভীরে।
রুশ-মুসলিম সম্পর্কের সূচনা খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে চতুর্দশ শতকে গোল্ডেন হোর্ড বা ‘কাবিলা জাহাবিয়া’র শাসনকালে। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক থমাস আর্নল্ড তাঁর দ্য প্রিচিং অব ইসলাম গ্রন্থে সুলতান মুহাম্মদ উজবেক খানের (মৃ. ৭৪২ হি./১৩৪১ খ্রি.) একটি ফরমানের কথা উল্লেখ করেছেন।
রাশিয়ার জাতীয় ও ধর্মীয় অস্তিত্ব রক্ষায় মুসলিম শাসকদের ভূমিকা ছিল অনন্য। গোল্ডেন হোর্ডের মুসলিম শাসকেরা রাশিয়ার বড় ক্যাথিড্রালগুলোর মর্যাদা ও স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন।
তৎকালীন মস্কো ও কিয়েভের শাসক সুলতান উজবেক কিয়েভের অর্থোডক্স চার্চ উদ্দেশ করে লিখেছিলেন, ‘সুলতান উজবেকের পক্ষ থেকে আমাদের আমির ও প্রজাদের প্রতি নির্দেশ: সেন্ট পিটারের গির্জা পবিত্র। কেউ এর সেবক বা পাদরিদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। এর কোনো সম্পত্তি বা লোকবল হস্তক্ষেপ করা যাবে না। যদি কেউ এই আদেশ অমান্য করে গির্জার ওপর চড়াও হয়, সে আল্লাহর কাছে পাপী সাব্যস্ত হবে এবং আমাদের পক্ষ থেকে তার শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড!’ (থমাস আর্নল্ড, দ্য প্রিচিং অব ইসলাম, পৃষ্ঠা: ২৪১)
এই ঐতিহাসিক দলিল প্রমাণ করে যে রাশিয়ার জাতীয় ও ধর্মীয় অস্তিত্ব রক্ষায় মুসলিম শাসকদের ভূমিকা ছিল অনন্য। গোল্ডেন হোর্ডের মুসলিম শাসকেরা রাশিয়ার বড় ক্যাথিড্রালগুলোর মর্যাদা ও স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, মুসলিমদের এই উদারতার কারণেই রাশিয়ার অর্থোডক্স খ্রিষ্টধর্ম আজও টিকে আছে।
ইসলামি বিজয়ের ধারা খলিফা ওমর (রা.)-এর সময় থেকেই ককেশাসের দিকে ধাবিত হয়। ঐতিহাসিক বালাজুরি (মৃ. ২৭৯ হি.) উল্লেখ করেছেন, সেনাপতি মুগিরা ইবনে শুবা (রা.) ২২ হিজরিতে (৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দ) আজারবাইজান জয় করেন। (ফুতুহুল বুলদান, ১/৩৯১, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত)
পরে অবশ্য হজরত ওসমান (রা.)-এর আমলে মুসলিম বাহিনী আরও উত্তরে অগ্রসর হয়ে বর্তমান রাশিয়ার দাগেস্তান ও চেচনিয়া অঞ্চলে পৌঁছে যায়।
তৎকালীন ককেশাসের রাজনীতিতে ইহুদি খাজার সাম্রাজ্য ছিল এক বড় শক্তি। ক্যাস্পিয়ান সাগর থেকে শুরু করে কিয়েভ পর্যন্ত বিস্তৃত এই সাম্রাজ্যের সঙ্গে মুসলিমদের দীর্ঘ লড়াই চলে। সপ্তম ও অষ্টম শতকে উমাইয়া খলিফাদের আমলে, বিশেষ করে মুসলিম ইবনে আব্দুল মালিক ও মারওয়ান ইবনে মুহাম্মদের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী বর্তমান রাশিয়ার আস্ট্রাখান পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। (ডগলাস ডানলপ, হিস্ট্রি অব দ্য জিউইশ খাজারস, পৃষ্ঠা: ৬৭, লন্ডন)
দশম শতকে রুশ ও মুসলিমদের সম্পর্ক দ্বিমুখী হয়ে ওঠে। রুশরা ক্যাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী মুসলিম জনপদগুলোতে অতর্কিত হামলা চালিয়ে লুণ্ঠন ও রক্তপাত ঘটাত।
রুশ জাতির পরিচয় ও সংস্কৃতি নিয়ে প্রথম প্রামাণ্য ইতিহাস লিখেছিলেন মুসলিম ভূগোলবিদ ও পর্যটকেরা। নবম শতকে ইবনে খুরদাজবেহ (মৃ. ২৮০ হি.) তাঁর আল-মাসালিক ওয়াল মামালিক গ্রন্থে রুশদের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি তাঁদের ‘সাকালিবা’ বা স্লাভিক জাতির অন্তর্ভুক্ত বলে বর্ণনা করেন, যারা চামড়া ও তরবারির বাণিজ্য নিয়ে বাগদাদ পর্যন্ত যাতায়াত করত।
ইবনে খুরদাজবেহ বলেন, ‘তারা সাকালিবা জাতির একটি অংশ। তারা দূরবর্তী উত্তর থেকে বাইজেন্টাইন ও মুসলিম দেশগুলোতে বাণিজ্য করতে আসে... তারা দাবি করে যে তারা খ্রিষ্টান, ফলে তারা জিজিয়া কর প্রদান করে।’ (আল-মাসালিক ওয়াল মামালিক, পৃষ্ঠা: ১৫৪, দারু সাদির, বৈরুত)
পরবর্তী সময়ে ৩১০ হিজরিতে (৯২২ খ্রিষ্টাব্দ) আব্বাসি খলিফা মুকতাদিরের দূত হিসেবে আহমদ ইবনে ফাদলান স্লাভিকদের দেশে সফর করেন। (রিহলাতু ইবনি ফাদলান, পৃষ্ঠা: ৮০, দারু সাদির, বৈরুত)
তাঁর লিখিত রিহলা বা ভ্রমণকাহিনি আজও রুশ জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আদি দলিল হিসেবে স্বীকৃত।
দশম শতকে রুশ ও মুসলিমদের সম্পর্ক দ্বিমুখী হয়ে ওঠে। একদিকে বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি, অন্যদিকে রাশিয়ার জলদস্যুদের দ্বারা আজারবাইজান ও ককেশাস অঞ্চলে আক্রমণ। ঐতিহাসিক মাসউদি (মৃ. ৩৪৬ হি.) উল্লেখ করেছেন, রুশরা ক্যাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী মুসলিম জনপদগুলোতে অতর্কিত হামলা চালিয়ে লুণ্ঠন ও রক্তপাত ঘটাত। (মুরুজুয যাহাব, ২/১২, দারুল ফিকর, বৈরুত)
একই সময়ে রুশরা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের ভাড়াটে সৈন্য হিসেবেও কাজ শুরু করে। প্রখ্যাত কবি আল-মুতানাব্বি তাঁর কবিতায় উল্লেখ করেছেন, সাইফুদ্দৌলা আল-হামদানির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রোমান (বাইজেন্টাইন) ও রুশরা একসঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছিল। তিনি গেয়েছিলেন, ‘রোমান ও রুশরা কীভাবে দুর্গ ধ্বংসের আশা করে, যখন তোমার বর্শার আঘাতই এর ভিত্তি?’
৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে কিয়েভের প্রিন্স ‘ভ্লাদিমির দ্য গ্রেট’ অর্থোডক্স খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন। এটি ছিল রাশিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মোড়। রুশ সূত্র অনুযায়ী, ভ্লাদিমির ইসলাম, ইহুদি ও খ্রিষ্টধর্ম—এই তিনটির মধ্য থেকে একটি বেছে নিতে চেয়েছিলেন। ইসলামের অনেক কিছু তাঁর পছন্দ হলেও মদ্যপান নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে তিনি শেষ পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি বলেছিলেন, ‘মদ্যপানই রুশদের জীবনের আনন্দ।’
এই ধর্মান্তর পরবর্তী এক হাজার বছর ধরে রাশিয়ার জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে তাদের আদর্শিক সংঘাতের কারণ হয়েছে।
সুলতান মুহাম্মদ উজবেক খানের শাসনামলে গোল্ডেন হোর্ড একটি পূর্ণাঙ্গ মুসলিম রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তাঁর আমলেই ‘উজবেক’ নামটি একটি জাতিসত্তার পরিচয়ে পরিণত হয়।
ত্রয়োদশ শতকে চেঙ্গিস খানের উত্তরসূরিদের আগমনে মানচিত্র পাল্টে যায়। চেঙ্গিস খানের নাতি বারকা খান প্রথম মঙ্গোল শাসক হিসেবে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত ‘গোল্ডেন হোর্ড’ বা সোনালি বাহিনী প্রায় ২৫০ বছর (১২৫১-১৪৮০ খ্রি.) রাশিয়ার ভূখণ্ড শাসন করে। এই সময়েই ককেশাস ও বর্তমান দক্ষিণ রাশিয়ায় ইসলামের শিকড় দৃঢ় হয়।
প্রখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা (মৃ. ৭৭৯ হি.) এই অঞ্চল সফর করে সেখানকার বিচারিক ব্যবস্থা ও আলেমদের প্রভাব দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। (রিহলাতু ইবনি বতুতা, পৃষ্ঠা: ৩৪২, দারু সাদির, বৈরুত)
সুলতান মুহাম্মদ উজবেক খানের শাসনামলে গোল্ডেন হোর্ড একটি পূর্ণাঙ্গ মুসলিম রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তিনি আলেম ও সুফিদের ব্যাপক সম্মান করতেন। তাঁর আমলেই ‘উজবেক’ নামটি একটি জাতিসত্তার পরিচয়ে পরিণত হয়। (মুহাম্মদ খান খাওয়ারিজমি, শাজরাতু তুর্ক, পৃষ্ঠা: ১৮১, কাজান সংস্করণ)
রুশ ও মুসলিম বিশ্বের সম্পর্ক কেবল যুদ্ধের নয়, বরং এটি দীর্ঘস্থায়ী সভ্যতাগত লেনদেনের ইতিহাস। একদিকে যেমন মুসলিম পর্যটকেরা রুশদের পরিচয় বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছেন, অন্যদিকে গোল্ডেন হোর্ডের মুসলিম শাসকেরা অর্থোডক্স চার্চের স্বাধীনতা রক্ষা করে রাশিয়ার ধর্মীয় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করেছেন।
আজ একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে যখন বৈশ্বিক রাজনীতির মেরুকরণ ঘটছে, তখন এই সহস্রাব্দের ইতিহাস পাঠ আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের সমীকরণ বুঝতে সাহায্য করবে।
সূত্র: আল–জাজিরা ডট নেট