পরম এক রিজিক রয়েছে, তা হলো ইমান, সুদৃঢ় বিশ্বাস এবং একটি জীবন্ত ও সংবেদনশীল হৃদয়
পরম এক রিজিক রয়েছে, তা হলো ইমান, সুদৃঢ় বিশ্বাস এবং একটি জীবন্ত ও সংবেদনশীল হৃদয়

আত্মশুদ্ধি

জীবন্ত হৃদয়: মুমিনকে আল্লাহর দেওয়া আধ্যাত্মিক রিজিক

বস্তুগত প্রাপ্তির বাইরেও রিজিকের যে এক বিশাল আধ্যাত্মিক জগত রয়েছে, তা আমরা খুব কমই অনুধাবন করি। প্রকৃতপক্ষে রিজিক নানা ধরনের হতে পারে।

এর একটি রূপ দৃশ্যমান ও জাগতিক; যেমন টাকা-পয়সা, জমিজমা, গাড়ি-বাড়ি, সামাজিক মর্যাদা কিংবা উঁচু ডিগ্রি। অপর রূপটি অদৃশ্য ও আধ্যাত্মিক; যেমন জ্ঞান, মনের সন্তুষ্টি, মানসিক শান্তি ও সঠিক উপলব্ধি।

আবার কিছু রিজিক একই সঙ্গে দৃশ্যমান ও অদৃশ্য, যেমন শারীরিক সুস্থতা। তবে এসব কিছুর ওপরে পরম এক রিজিক রয়েছে, তা হলো ইমান, সুদৃঢ় বিশ্বাস এবং একটি জীবন্ত ও সংবেদনশীল হৃদয়।

বৈষয়িক সম্পদ হারানোর চেয়েও বড় ক্ষতি হলো অন্তরের সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলা। পাপাচার ও উদাসীনতা মানুষের অন্তরে অন্ধকার নামিয়ে আনে, আর সৎকাজ অন্তরে এক খোদায়ি আলো তৈরি করে।

মহানবী (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, “মানুষ তার কৃত পাপের কারণেই রিজিক থেকে বঞ্চিত হয়। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪০২২)

অন্তরের এই আলো ও জাগৃতি কোনো স্থায়ী বিষয় নয়; মানুষের কাজের ওপর ভিত্তি করে অন্তরের অনুভূতিতে জোয়ার-ভাটা খেলে।

পার্থিব ধন-দৌলতের চেয়েও অমূল্য রিজিক হলো একটি অনুভূতিশীল অন্তর। অন্যের কষ্ট দেখলে বুকের ভেতরের হৃদয়টা যে কেঁদে ওঠে, তা আল্লাহর দেওয়া এক বিশেষ উপহার।

হৃদয়ই সবচেয়ে বড় উপহার

যেমন করে মানুষে মানুষে ধন-সম্পদের তফাত দেখা যায়, তেমনি অন্তরের অনুভূতি ও অনুকম্পার গভীরতাও একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম। কোরআনে বলা হয়েছে, “আমিই তাদের মধ্যে তাদের পার্থিব জীবনের জীবিকা বণ্টন করি এবং একজনকে অন্যের ওপর মর্যাদায় উন্নত করি।" (সুরা জুখরুফ, আয়াত: ৩২)

পার্থিব ধন-দৌলতের চেয়েও অমূল্য রিজিক হলো একটি অনুভূতিশীল অন্তর। অন্যের কষ্ট দেখলে বুকের ভেতরের হৃদয়টা যে কেঁদে ওঠে, তা আল্লাহর দেওয়া এক বিশেষ উপহার। আল্লাহর বাণী শুনলে যে অন্তরে ভয় ও অনুশোচনায় আলোড়িত হয়—তা কি সবার থাকে?

কোরআনে বলা হয়েছে, “প্রকৃত মুমিন তো তারাই, আল্লাহর জিকির করা হলে যাদের অন্তর কেঁপে ওঠে।” (সুরা আনফাল, আয়াত: ২)। আরও বলা হয়েছে, “এরপর তাদের চামড়া ও অন্তর আল্লাহর জিকিরে নরম হয়।” (সুরা জুমার, আয়াত: ২৩)

ভালো কাজ করার পর মনে যে অনাবিল আনন্দ জাগে, কিংবা ভুল কিছু করলে ভেতরে যে অপরাধবোধ তৈরি হয়, তা একটি জীবন্ত হৃদয়েরই লক্ষণ। বিরল এক আধ্যাত্মিক সম্পদ।

কঠিন হৃদয়: রিজিকবঞ্চিত হওয়ার লক্ষণ

প্রচলিত আছে, সুস্বাস্থ্য হলো এমন এক মুকুট যা শুধু অসুস্থ মানুষই স্পষ্ট দেখতে পায়। তেমনি অন্তরের সংবেদনশীলতার গুরুত্বও শুধু তারাই অনুধাবন করতে পারে, যাদের অন্তর শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।

কোরআনে এমন আত্মিক অন্ধত্বের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, “তবে কি তারা কোরআন নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে না, নাকি তাদের অন্তরে তালা পড়ে গেছে?” (সুরা মুহাম্মদ, আয়াত: ২৪)

তবে কি তারা কোরআন নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে না, নাকি তাদের অন্তরে তালা পড়ে গেছে?
সুরা মুহাম্মদ, আয়াত: ২৪

এক ব্যক্তি নবীজিকে তাঁর ছোট নাতিদের আদর করে চুমু খেতে দেখে অবাক হয়ে বলেছিল, “আমার তো দশটি সন্তান রয়েছে, আমি তো কখনো তাদের কাউকে চুমু দিইনি!” মহানবী (সা.) তখন আক্ষেপ করে বললেন, “আল্লাহ যদি তোমার অন্তর থেকে দয়া-মায়া কেড়ে নিয়ে থাকেন, তবে আমার কী করার আছে? যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৯৭)

যার হৃদয় পাথরের মতো কঠিন, সে আসলে পরম এক রিজিক থেকে বঞ্চিত। কোরআনে এমন মানুষদের প্রতি ধিক্কার জানিয়ে বলা হয়েছে, “তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না।” (সুরা আ’রাফ, আয়াত: ১৭৯)

মানুষ যখন নিজের অন্যায্য ইচ্ছা ও প্রবৃত্তিকেই জীবনের একমাত্র উপাস্য বানিয়ে ফেলে, তখন তার হৃদয়ে মোহর মেরে দেওয়া হয় (সুরা জাসিয়াহ, আয়াত: ২৩)। ফলশ্রুতিতে সেই অন্তর পাথরের চেয়েও শক্ত হয়ে পড়ে। (সুরা বাকারা, আয়াত: ৭৪)

মানুষের হৃদয় জয় করার রিজিক

রিজিক শুধু নিজের অন্তরের অনুভূতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; অন্যের অন্তরে জায়গা করে নেওয়া এবং মানুষের ভালোবাসা পাওয়াও এক মহা উপহার। আল্লাহ–তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দার অন্তরকে ভালোবাসার অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে দেন।

বলা হয়েছে, “তিনি তাদের অন্তরের মধ্যে প্রীতি স্থাপন করেছেন। পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদ ব্যয় করলেও তুমি তাদের অন্তরে এই প্রীতি সৃষ্টি করতে পারতে না, কিন্তু আল্লাহ তাদের মধ্যে প্রীতি স্থাপন করেছেন।” (সুরা আনফাল, আয়াত: ৬৩)

আমরা প্রায়ই দেখি, সমাজের কিছু মানুষ অতি অল্প চেষ্টাতেই মানুষের ভালোবাসা পেয়ে যান; তাঁদের কথা ও আচরণ সহজেই মানুষের অন্তরে গিয়ে পৌঁছায়। অন্যদিকে অনেকের অনেক বিদ্যা-বুদ্ধি বা ধন-সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তাঁরা মানুষের ভালোবাসা পান না। এটি মূলত ‘হৃদয় জয়ের রিজিক’।

কথা যখন শুধু মুখ থেকে বের হয়, তা মানুষের কান পর্যন্ত গিয়েই থেমে যায়; কিন্তু কথা যখন অনুভূতির গভীর থেকে বের হয়, তা সোজা অন্য মানুষের অন্তরে গিয়ে আঘাত করে।

অনন্ত শান্তির উৎস

মানুষ যখন নিজের হৃদয়কে আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত করে, তখন দুনিয়ার কোনো অভাবই তাকে আর ছোট করতে পারে না।

সুফি ইবনে আতাউল্লাহ লিখেছিলেন, “হে আল্লাহ, যে তোমাকে হারিয়েছে সে আর কী-ই বা পেল? আর যে তোমাকে পেয়েছে সে আর কী-ই বা হারাল?” (ইবনে আতাউল্লাহ আল-ইসকান্দারি, আল-হিকাম আল-আতাইয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৮৫, দারুল ফিকর, বৈরুত: ২০০৩)

নির্দয় হৃদয় কখনো সমাজে ভালোবাসার ঝরনাধারা তৈরি করতে পারে না। কথা যখন শুধু মুখ থেকে বের হয়, তা মানুষের কান পর্যন্ত গিয়েই থেমে যায়; কিন্তু কথা যখন অনুভূতির গভীর থেকে বের হয়, তা সোজা অন্য মানুষের অন্তরে গিয়ে আঘাত করে।