‘আল্লাহ বোধহয় আমাকে আর ক্ষমা করবেন না’, ‘আমার দ্বারা ভালো কিছু সম্ভব নয়’ কিংবা ‘আমার জীবনে আর কোনোদিন সাফল্য আসবে না’—জীবনের কঠিন সময়ে এমন হতাশা আমাদের অনেকের মনেই ভর করে।
নিজের ভুলত্রুটি ও পাপের ভারে মানুষ যখন ভেঙে পড়ে, তখন আল্লাহর কাছে ফিরে আসার পরিবর্তে অনেকে উল্টো নিরাশ হয়ে দূরে সরে যায়। অথচ ইসলামি জীবনদর্শনের সত্য হলো, বান্দা আল্লাহর ব্যাপারে যেমন আশা ও ধারণা পোষণ করবে, আল্লাহর পক্ষ থেকে সে ঠিক তেমনই প্রতিদান লাভ করবে।
হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন, ‘আমার বান্দা আমার প্রতি যেমন ধারণা পোষণ করে, আমি তার সঙ্গে তেমনই আচরণ করি; এবং সে যখন আমাকে স্মরণ করে, আমি তার সঙ্গেই থাকি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৪০৫)
ইসলামে এই মনোভাবকে বলা হয় ‘হুসন উজ-জান্নি বিল্লাহ’—তথা আল্লাহর রহমত ও প্রজ্ঞার ওপর সদা সুধারণা ও ইতিবাচক বিশ্বাস রাখা।
চেষ্টা করার পরও কাজে ব্যর্থ হলে হতাশ হয়ে পড়া যাবে না। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, রাসুল (সা.) মদিনায় হিজরতের আগে মক্কার চরম সংকটের দিনে হজের মৌসুমে বিভিন্ন গোত্রের দ্বারে দ্বারে গিয়েছিলেন।
তিনি একে একে ছাব্বিশ গোত্রের কাছে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে যান এবং প্রত্যেকেই তাঁকে ফিরিয়ে দেয়, এমনকি অনেকে কটূক্তিও করে। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ, ৪/৩২২-৩৪০, দারু হিজর, কায়রো, ১৯৯৮)।
আমার বান্দা আমার প্রতি যেমন ধারণা পোষণ করে, আমি তার সঙ্গে তেমনই আচরণ করি; এবং সে যখন আমাকে স্মরণ করে, আমি তার সঙ্গেই থাকি।হাদিসে কুদসি, সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৪০৫
পরপর এতবার প্রত্যাখ্যাত হয়েও নবীজি (সা.) নিরাশ হননি। আল্লাহর ওপর তাঁর অটল ভরসা ছিল বলেই পরবর্তীকালে মদিনার তরুণদের মাধ্যমে ইসলামের ঐতিহাসিক বিজয়ের সূচনা হয়।
তাই কোনো চাকরি না পাওয়া, ব্যবসায় ক্ষতি হওয়া কিংবা বৈবাহিক প্রস্তাব ভেঙে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে সব শেষ হয়ে গেছে। বিশ্বাস রাখতে হবে—আল্লাহ হয়তো কোনো ক্ষতি থেকে রক্ষা করেছেন এবং বান্দার জন্য এর চেয়েও উত্তম কিছু নির্ধারণ করে রেখেছেন।
মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কোনো পাপে বারবার জড়িয়ে পড়লে শয়তান মনে হীনম্মন্যতা ঢুকিয়ে দেয়—‘তোমার আর কোনো ক্ষমা নেই।’ ফলে মানুষ তওবা ছেড়ে দিয়ে আরও বেশি পাপে ডুবে যায়।
অথচ মহান আল্লাহ ‘আল-গাফফার’ (অবিরাম ক্ষমাকারী) ও ‘আল-ওয়াদুদ’ (পরম প্রেমময়)। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘বনি আদমের প্রত্যেক সন্তানই ভুল করে, আর ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো তারা, যারা নিয়মিত তওবা করে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৯৯)
তিনি আরও স্পষ্ট করেছেন, ‘আল্লাহর সুন্দর ইবাদতের অন্যতম নিদর্শন হলো তাঁর প্রতি সুধারণা রাখা’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৮৭১০)
অর্থাৎ, ভুল যত বড়ই হোক, রবের ক্ষমার ওপর আস্থা রেখে ফিরে আসাই মুক্তির পথ।
শয়তান নিজে আল্লাহর রহমত থেকে বিতাড়িত হয়েছিল; তাই সে মানুষকে অপরাধবোধ ও হতাশার অন্ধকারে বন্দি রাখতে চায়। কিন্তু মহান আল্লাহ আশার সুশীতল আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের তওবা কবুল করতে চান...।’
সুধারণার অর্থ এই নয় যে মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে একের পর এক পাপ করে যাবে আর ভাববে ‘আল্লাহ তো মাফ করেই দেবেন!’ এটি সুধারণা নয়, বরং আত্মপ্রবঞ্চনা।
তাবেয়ি ইমাম হাসান বসরি (রহ.) বিষয়টি সহজভাবে বুঝিয়ে বলেছেন, ‘প্রকৃত মুমিন আল্লাহর প্রতি ভালো ধারণা রাখে, যার ফলে সে নেক আমল বা সৎকাজে আত্মনিয়োগ করে। পক্ষান্তরে অবাধ্য পাপাচারী আল্লাহর প্রতি মন্দ ধারণা রাখে, যার কারণে সে খারাপ কাজেই লিপ্ত থাকে।’ (ইবনে আবিদ দুনিয়া, হুসন উজ-জান্নি বিল্লাহ, পৃষ্ঠা: ৩৯, হাদিস: ১৯, দারু ইবনি কাসির, বৈরুত, ১৯৮৭ খ্রি.)
অর্থাৎ, আল্লাহর প্রতি খাঁটি বিশ্বাস মানুষকে পাপ থেকে বিরত রেখে আরও ভালো কাজের দিকে নিয়ে যায়।
শয়তান নিজে আল্লাহর রহমত থেকে বিতাড়িত হয়েছিল; তাই সে মানুষকে অপরাধবোধ ও হতাশার অন্ধকারে বন্দি রাখতে চায়। কিন্তু মহান আল্লাহ আশার সুশীতল আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের তওবা কবুল করতে চান...।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ২৭)
আল্লাহ আরও ঘোষণা করেন যে তিনি সৎকর্মশীলদের পরিশ্রমের প্রতিদান কখনো নষ্ট করেন না। (সুরা কাহফ, আয়াত: ৩০)
জীবনের প্রতিটি দুঃখ-কষ্ট মূলত মানুষকে ধুয়েমুছে তাকে খাঁটি করে তোলে এবং আল্লাহর আরও কাছে নিয়ে আসে।