ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়া মনীষীদের কলম কেবল শব্দ বা বাক্য রচনা করে না; বরং যুগের সামষ্টিক আকিদা, মনস্তত্ত্ব ও জীবনদর্শনকে নির্মাণ করে। জ্ঞানচর্চার দীর্ঘ পথপরিক্রমায় মুসলিম উম্মাহ এমন কিছু ক্ষণজন্মা গবেষকের দেখা পেয়েছে, যাঁদের কাজ শতাব্দী পেরিয়েও সমভাবে প্রাসঙ্গিক।
অষ্টম হিজরির প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ, মুহাদ্দিস ও ফকিহ হাফেজ ইবনে কাসির (রহ.) ছিলেন তেমনই এক মহান ব্যক্তিত্ব। আজ এত বছর পরও ইসলামি চিন্তাজগতে তাঁর প্রতিটি কাজ নির্ভরযোগ্যতা, বুদ্ধিবৃত্তিক সততা ও অনন্য ভারসাম্যের এক জীবন্ত প্রতীক হিসেবে মূল্যায়িত হয়।
হিজরি ৭০১ সনে সিরিয়ার ঐতিহাসিক বসরা নগরীতে ইবনে কাসির জন্মগ্রহণ করেন, যা ছিল সেকালের ইলমি চর্চার এক অনন্য কেন্দ্র। শৈশবের প্রারম্ভেই তিনি পিতৃস্নেহ হারান। ফলে এক কঠিন সামাজিক ও আর্থিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাঁর জীবন শুরু হয়।
পিতার মৃত্যুর পর পরিবারের সঙ্গে তিনি দামেস্কে চলে আসেন। এই স্থান পরিবর্তন তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ অমর কীর্তি হলো ‘তাফসিরে ইবনে কাসির’। এর মূল শক্তি হলো—কোরআনের আয়াত দ্বারা কোরআনের ব্যাখ্যা এবং সহিহ হাদিসের যথাযথ প্রয়োগ।
মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি পবিত্র কোরআনের হিফজ সম্পন্ন করেন এবং তৎকালীন শ্রেষ্ঠ আলেমদের অধীনে তাফসির, হাদিস ও ফিকহের জটিল শাস্ত্রসমূহ অধ্যয়ন করতে শুরু করেন। (আত-তাকমিল ফিল জারহি ওয়াত তাআদিল, ১/৯-১০, মাকতাবাতু ইবনে আব্বাস, সানআ, ২০১১)
সেকালের দামেস্ক ছিল মাদ্রাসা, মসজিদ ও দারুল হাদিসের এক উন্মুক্ত জ্ঞানরাজ্য। এই রাজকীয় পরিবেশে ইবনে কাসির তাঁর প্রখর স্মৃতিশক্তি ও বিশ্লেষণী ক্ষমতার কারণে খুব দ্রুত তৎকালীন পণ্ডিত ও সমাজতাত্ত্বিকদের মনোযোগের কেন্দ্রে চলে আসেন। (আত-তাকমিল, ১/ ১০)
তাঁর নাম ইসমাইল, পিতার নাম ওমর। ‘ইমাদুদ্দিন’ তাঁর উপাধি এবং ‘আবুল ফিদা’ তাঁর উপনাম হলেও জ্ঞানপিপাসু মানুষের কাছে তিনি ‘ইবনে কাসির’ নামেই সমধিক পরিচিত। তাত্ত্বিক ও আইনি বিষয়ে তিনি শাফেয়ি মাজহাবের অনুসারী ছিলেন এবং সে অনুযায়ী ফতোয়া দিতেন।
তবে তাঁর বিচার-বিশ্লেষণ কোনো অন্ধ অনুকরণ বা নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। আইনি বা তাত্ত্বিক কোনো মত পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলিলের নিকটবর্তী মনে হলে, তিনি প্রথাগত দেয়াল ভেঙে অবলীলায় সেটিকেই গ্রহণ করতেন। (জামিউল মাসানিদি ওয়াস সুনানিল হাদি লি আকওয়ামিস সুনান, ১/ ১৭ ও ২২, মাকতাবাতুল আসাদি, মক্কা, ১৪২৫ হিজরি)
ইবনে কাসিরের মেধা ও ব্যক্তিত্ব গঠনে তৎকালীন শ্রেষ্ঠ মনীষীদের অবদান ছিল অপরিসীম। তিনি দীর্ঘ সময় শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে ছিলেন এবং তাঁর সামগ্রিক চিন্তাদর্শন দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন।
সত্য প্রকাশের এই আপসহীন জ্ঞানতাত্ত্বিক সম্পর্কের কারণে সমকালীন কায়েমি স্বার্থবাদী রাজনৈতিক মহলের পক্ষ থেকে তাঁকে কারাবরণসহ নানা অমানবিক যাতনা ও প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
তাঁর অন্য শিক্ষকেরা ছিলেন—রিজালশাস্ত্রের (হাদিস বর্ণনাকারীদের জীবনী ও গ্রহণযোগ্যতা যাচাই) ইমাম হাফেজ আবু হাজ্জাজ মিজ্জি (যিনি ইবনে কাসিরের প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে নিজের কন্যাকে তাঁর সঙ্গে বিবাহ দেন) ও ইতিহাসবিদ হাফেজ শামসুদ্দিন জাহাবি (রহ.)।
এ ছাড়া বুরহান উদ্দিন আল-ফাজারি ও আলামুদ্দিন আল-বিরজালির মতো প্রাজ্ঞ আলেমদের কাছ থেকে তিনি ইলম অর্জন করেন। (আত-তাকমিল, ১/ ১০)
আইনি বা তাত্ত্বিক কোনো মত পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলিলের নিকটবর্তী মনে হলে, তিনি প্রথাগত দেয়াল ভেঙে অবলীলায় সেটিকেই গ্রহণ করতেন।
দামেস্কের প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তাঁর পাঠদান ছিল অত্যন্ত সুসংহত ও যুক্তিগ্রাহ্য। তাঁর সুযোগ্য ছাত্রদের মধ্যে হাফেজ জাইনুদ্দিন আল-ইরাকি ও বিখ্যাত কারি ইবনুল জাজারির মতো ব্যক্তিত্বরা পরবর্তী সময়ে বিশ্বমঞ্চে ইলমের নেতৃত্ব দিয়েছেন। (আত-তাকমিল, ১/ ১১)
ইবনে কাসির শুধু শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক ছিলেন না; বরং শাস্ত্রীয় রচনার মাধ্যমে ইসলামি সভ্যতার ইতিহাসের তিনটি প্রধান শাখায় কালজয়ী বিশ্বকোষ উপহার দিয়েছেন:
তাফসিরশাস্ত্র: তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ অমর কীর্তি হলো তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, যা বিশ্বব্যাপী তাফসিরে ইবনে কাসির নামে সমাদৃত। এই গ্রন্থের মূল শক্তি হলো এর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি—কোরআনের আয়াত দ্বারা কোরআনের ব্যাখ্যা এবং সহিহ হাদিসের যথাযথ প্রয়োগ।
কোনো রকম অতিরঞ্জন, মনগড়া দর্শন বা ‘ইসরায়েলি রেওয়ায়েত’ (প্রাচীন ইহুদি পুরাণের অবৈজ্ঞানিক গল্প) থেকে এই গ্রন্থটি সম্পূর্ণ মুক্ত।
ইতিহাসশাস্ত্র: ইতিহাসকে তিনি কেবল রাজা–বাদশাহদের যুদ্ধবিগ্রহের বর্ণনায় সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে সৃষ্টির সূচনা থেকে নিজের সময় পর্যন্ত সব সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনাকে গভীর সমাজতাত্ত্বিক ও আকিদাগত দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করেছেন।
হাদিসশাস্ত্র: এ শাস্ত্রে তাঁর মূল্যবান পরিকল্পনা হলো জামিউল মাসানিদি ওয়াস সুনান। এতে তিনি বুখারি, মুসলিমসহ প্রধান ১০টি প্রসিদ্ধ গ্রন্থের হাদিস সুবিন্যস্তভাবে একত্রিত করেছেন।
তাঁর সুযোগ্য ছাত্রদের মধ্যে হাফেজ জাইনুদ্দিন আল-ইরাকি ও বিখ্যাত কারি ইবনুল জাজারির মতো ব্যক্তিত্বরা পরবর্তী সময়ে বিশ্বমঞ্চে ইলমের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
ইবনে কাসিরের গভীর পাণ্ডিত্য দেখে আল্লামা শামসুদ্দিন জাহাবি (রহ.) মূল্যায়ন করেছিলেন, ‘তিনি একাধারে একজন অনন্য ইমাম, প্রাজ্ঞ হাদিসবিশারদ ও গভীর জ্ঞানসম্পন্ন মুফতি।’
আল্লামা ইবনুল ইমাদ আল-হানবালি লিখেছেন, ‘তিনি ছিলেন প্রখর মেধাবী, বিস্মৃতিমুক্ত এবং উন্নত বোধসম্পন্ন এক কালজয়ী পণ্ডিত।’ (শাজারাতুজ জাহাব ফি আখবারি মান জাহাব, ৮/ ৩৯৭, দার ইবনে কাসির, বৈরুত, ১৯৯২)
৭৭৪ হিজরির শাবান মাসে দামেস্কে এই মহান ইমাম আপন প্রভুর সান্নিধ্যে প্রত্যাবর্তন করেন। তাঁর শেষ ইচ্ছা বা অসিয়ত অনুযায়ী দামেস্কের ঐতিহাসিক ‘মাকবারাতুস সুফিয়াহ’–তে তাঁর প্রিয় শিক্ষক ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর কবরের পাশেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। (শাজারাতুজ জাহাব, ৮/৩৯৯)
রায়হান আল ইমরান : প্রাবন্ধিক ও গবেষক