ইবাদত

জিকির: অস্থির মনের মহৌষধ

“অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। এই প্রবাদটি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে কতটা সত্য, তা আমরা অনেকেই হাড়হাড় অনুভব করি। যখনই আমাদের হাত বা মন অবসর পায়, তখনই হাজারো অনর্থক চিন্তা, অতীত নিয়ে আফসোস আর ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা আমাদের গ্রাস করতে শুরু করে।

এমনকি অনেক সময় আমরা কাজ করছি ঠিকই, কিন্তু মন পড়ে আছে অন্য কোথাও। এই দ্বিধাগ্রস্ত মন কাজের গতি যেমন কমিয়ে দেয়, তেমনি বাড়ায় মানসিক ক্লান্তি। এই অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় কী?

মন নিয়ন্ত্রণের মূলমন্ত্র

ইমাম শাফেয়ি (রহ.) একটি অসাধারণ কথা বলেছেন, “তুমি যদি তোমার নফসকে হক বা নেক কাজে ব্যস্ত না রাখো, তবে সে তোমাকে বাতিল ও গুনাহের কাজে ব্যস্ত করে দেবে।” (মানাকিবুশ শাফিঈ)

শয়তানের এই প্ররোচনা থেকে বাঁচার সবচেয়ে সহজ এবং শক্তিশালী উপায় হলো—জিকির। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে সবচেয়ে বেশি যে আমলের নির্দেশ দিয়েছেন, সেটি হলো তাঁর জিকির বা স্মরণ।

জিকির কেন করবেন

যিকির কেবল মুখে কিছু শব্দ উচ্চারণ নয়, বরং এটি আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার এক ঐশ্বরিক প্রক্রিয়া। এর উপকারিতা অপরিসীম:

১. অন্তরের প্রশান্তি: আজকের অশান্ত পৃথিবীতে মানসিক শান্তি সবচেয়ে দামি বস্তু। আল্লাহ বলেন, “জেনে রেখো, আল্লাহর জিকির দ্বারাই অন্তরসমূহ শান্তি লাভ করে।” (সুরা রা‘দ, আয়াত: ২৮)

২. আল্লাহর নৈকট্য লাভ: আপনি যখন আল্লাহকে স্মরণ করবেন, বিশ্বজগতের অধিপতিও আপনাকে স্মরণ করবেন। আল্লাহ বলেন, “তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমি তোমাদের স্মরণ করব।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫২)

৩. শয়তানের ঢাল: অন্তর যখন জিকিরশূন্য থাকে, তখন সেটি শয়তানের আস্তানায় পরিণত হয়। ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতে, মানুষ যখন আল্লাহকে স্মরণ করে, শয়তান তখন আত্মগোপন করে। ফলে গিবত, পরনিন্দা ও অর্থহীন কাজ থেকে বেঁচে থাকা সহজ হয়।

৪. সহজ ইবাদত: আল্লাহর রাসুল (সা.) জিকিরকে স্বর্ণ-রুপা দান করা বা জিহাদের ময়দানে লড়াই করার চেয়েও উত্তম কাজ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৩৭৭)

৫. জান্নাতে বৃক্ষরোপণ: আমরা কি জানি? একবার ‘সুবহানাল্লাহিল আযীম ওয়া বিহামদিহি’ পাঠ করলে জান্নাতে একটি করে খেজুর গাছ রোপণ করা হয়। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৪৬৪)

আমলনামা ভারী করার সহজ কিছু জিকির

জিকির এমন এক ইবাদত যা জিহ্বায় হালকা, কিন্তু কিয়ামতের দিন মিজানের পাল্লায় হবে অত্যন্ত ভারী। নিয়মিত এই তাসবিহগুলো আমরা পড়তে পারি:

  • সুবহানাল্লাহ — আল্লাহ অতি পবিত্র।

  • আলহামদুলিল্লাহ — সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর।

  • লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ — আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।

  • আস্তাগফিরুল্লাহ — আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই।

  • সুবহানাল্লাহিল ওয়া বিহামদিহি সুবহানাল্লাহিল আযীম— এই দুটি বাক্য দয়াময় আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়

জিকির করার ব্যবহারিক কৌশল

যাঁরা ব্যস্ততার কারণে আলাদা করে সময় পান না, তাঁরা নিচের সময়গুলোতে জিকির করতে পারেন:

  • অফিসে বা কর্মস্থলে যাওয়ার পথে (বাস, ট্রেন বা হাঁটার সময়)।

  • ঘরের কাজ যেমন—রান্না করা, পরিষ্কার করা বা বাগান করার সময়।

  • ট্রাফিক জ্যামে বসে বিরক্তি প্রকাশ না করে জিকিরে মন দেওয়া।

  • ঘুমানোর আগে বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থায়।

শেষ কথা

হতাশা শয়তানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। আর মুমিন যখন হতাশ হয়, তখনই সে শয়তানের সহজ শিকারে পরিণত হয়। দুনিয়ার জটিলতায় মন বিষণ্ণ হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু সেই বিষণ্ণতাকে কাটিয়ে ওঠার পথ হলো জিকির। এটি যেমন আমাদের মনকে প্রশান্ত রাখে, তেমনি আখিরাতের জন্য সঞ্চয় করে মূল্যবান পাথেয়।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব অবস্থায় তাঁর জিকিরে মশগুল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

writerismat@gmail.com

ইসমত আরা: শিক্ষক ও লেখক