কৃষক ও উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণ, প্রযুক্তি ও অন্যান্য সেবা নিশ্চিত করা গেলে ক্ষুদ্রঋণের অবদান আরও বাড়বে।
আশির দশকে যখন ক্ষুদ্রঋণ শুরু হয়, তখন এটি ছিল দারিদ্র্য বিমোচনের হাতিয়ার। কালের বিবর্তনে সেটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে রূপান্তর হচ্ছে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় শুধু ঋণ সব সমাধান করতে পারবে না। কৃষক ও উদ্যোক্তাদের জন্য সামগ্রিক প্যাকেজ নিয়ে অগ্রসর হতে হবে, যাতে তাঁদের ঝুঁকি হ্রাস করে সুরক্ষা দেওয়া যায়। তাহলেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ক্ষুদ্রঋণ আরও বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে।
‘কৃষক, গ্রামীণ উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের জন্য ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির গুরুত্ব’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন বক্তারা। তাঁরা বলেছেন, অনেক সময় দেখা যায়, কৃষকের যখন প্রয়োজন, তখন ঋণ পান না। যখন ঋণ পান, তখন প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। তাই দ্রুত সময়ে ঋণ দেওয়ার জন্য তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। মাঠপর্যায়ের কৃষক ও উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন অনুসারে ক্ষুদ্রঋণ প্যাকেজ চালু করা দরকার। বর্তমানে ক্ষুদ্রঋণদাতা প্রতিষ্ঠান (এমএফআই) সর্বোচ্চ ২৪ শতাংশ সুদে ক্ষুদ্রঋণ দিচ্ছে। এ হার কমিয়ে আনতে হবে বলেও মত দেন তাঁরা।
ইউসিবি ব্যাংক পিএলসির সহযোগিতায় গতকাল বৃহস্পতিবার এই বৈঠকের আয়োজন করে প্রথম আলো। এতে অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, ক্ষুদ্রঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা অংশ নেন। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। এটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতিতে অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগ তৈরি হচ্ছে। তাই ক্ষুদ্রঋণকে রূপান্তর করতে হবে। যদিও নীতিপ্রণেতাদের মানসিকতা বাস্তবতার পেছনে আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি অর্থবছরে ৬০ হাজার কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। এই তহবিলের বড় অংশ ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। যদিও বিশ্বের সবচেয়ে বেশি খেলাপি এখন বাংলাদেশ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বেসরকারি ব্যাংকের মুনাফাও বেশি।
দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে শুধু অর্থায়ন ও সুদহারের পাশাপাশি প্রক্রিয়াগত জটিলতা বা হয়রানি বন্ধ, নীতি ঘাটতি দূর এবং উদ্ভাবনে জোর দেওয়ার কথা বলেন হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, ঋণসহায়তার পাশাপাশি স্থানীয় অবকাঠামো উন্নত করতে হবে। তবেই প্রান্তিক উদ্যোক্তারা দ্রুত এগিয়ে যেতে পারবেন।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, গ্রামীণ কৃষি ও উদ্যোক্তাদের বিকাশে ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে এমএফআই। অনেক চেষ্টা করেও ব্যাংক সেই জায়গায় যেতে পারেনি। তবে আগামী দিনে ক্ষুদ্রঋণকে কার্যকর করতে হলে পরিবর্তন আনতে হবে। তিনি আরও বলেন, কৃষক আগের চেয়ে বেশি উৎপাদন করছেন। প্রযুক্তি ব্যবহারও করছেন। তারপরও বড় ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। তাই কৃষকের জন্য ক্ষুদ্রঋণের সঙ্গে বিভিন্ন সেবা নিয়ে আসতে হবে। একইভাবে উদ্যোক্তাদের শুধু ঋণ দিলে হবে না। তাঁদের প্রয়োজনীয় অন্যান্য সেবাও দিতে হবে। আবার ছোট উদ্যোক্তাদের ব্যবসা বড় করতে বিনিয়োগ লাগবে। ব্যাংকের সঙ্গে তাঁদের সংযোগ ঘটিয়ে দিতে হবে।
ইউসিবি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ বলেন, ‘কৃষিঋণের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো সময়মতো অর্থায়ন না হলে ঋণের কার্যকারিতা অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়। সে জন্য আমরা মৌসুমের শুরুতেই সংশ্লিষ্ট ফসলের জন্য কৃষিঋণ বিতরণ, আবেদনপ্রক্রিয়া সহজ করা এবং দ্রুততম সময়ে ঋণ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। বর্তমানে আমরা এক দিনে কৃষিঋণ বিতরণ করছি। কৃষিঋণ বাড়াতে ক্লাস্টার ধরে ঋণ দেওয়ায় জোর দিচ্ছি আমরা।’
বর্তমানে খুব কম কৃষক তাঁর সন্তানকে কৃষক বানাতে চান। কৃষিকাজে মুনাফা বাড়েনি। তার কারণ, খরচ বেড়েছে। কয়েকটি ছাড়া অধিকাংশ শস্যে গড়ে ৬ শতাংশ মুনাফা হয়। এমন তথ্য দিয়ে পল্লী কর্ম–সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল কাদের বলেন, এ ক্ষেত্রে এমএফআইয়ের ২৪ শতাংশ সুদহার কার্যকর নয়। যখন তাঁদের টাকা লাগে, তখন পান না। সে জন্য তাঁরা একাধিক এমএফআইয়ে যান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্টের পরিচালক (এসএমইএসপিডি) নওশাদ মোস্তফা বলেন, ‘অনেক গ্রামীণ উদ্যোক্তার কাছে সুদের হারের চেয়ে কবে পাচ্ছেন, সেটি বেশি দরকার। যদিও আমরা পিকেএসএফের মাধ্যমে ১৭ শতাংশ সুদেও ক্ষুদ্রঋণ দিয়েছি।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষিঋণ বিভাগের যুগ্ম পরিচালক ফয়সাল খন্দকার বলেন, ‘আমরা প্রতিবছর কৃষি নীতিমালা করার আগে অংশীজনের সঙ্গে মতবিনিময় করে থাকি। চলতি অর্থবছর কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ৩৯ হাজার কোটি থেকে বাড়িয়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা করেছি।’ তিনি বলেন, এমএফআইগুলো কৃষিঋণে ২৪ শতাংশ সুদ নেয়। আর ব্যাংক দেয় ১৩-১৪ শতাংশ সুদে। জামানতবিহীন ঋণ দেওয়ার কারণে এমএফআইয়ের সুদের হার বেশি হয়। তবে তাদের সপ্তাহে কিস্তি পরিশোধের সুবিধা আছে।
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের হেড অব মাইক্রো ইনস্যুরেন্স অ্যান্ড মাইক্রোফাইন্যান্স মো. সাইদুল হক বলেন, ‘কৃষকদের জন্য ১২ মাস মেয়াদি কৃষিঋণ যুক্তিযুক্ত নয়। সে জন্য আমরা মৌসুমি ও স্বাধীন ঋণ কর্মসূচি চালু করেছি। কৃষকের আয় কীভাবে বাড়ানো যায়, সে জন্য ইকোসিস্টেম উন্নয়নের চেষ্টা করছি আমরা।’
ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরামের (সিডিএফ) নির্বাহী পরিচালক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ১ কোটি ৬৮ লাখ কৃষক পরিবারের মধ্যে ১ কোটি ৪০ লাখ পরিবারকে ক্ষুদ্রঋণ দিতে পেরেছে এমএফআই। তাই প্রত্যন্ত এলাকার কৃষকদের কাছে পৌঁছাতে এমএফআইকে আরও বেশি তহবিল দিতে হবে। ব্যাংক খাতকে যেটুকু দেওয়া হচ্ছে, তার পুরোটা কিন্তু কৃষিতে যাচ্ছে না।
কৃষিঋণ প্রকৃত কৃষকদের কাছে যায় না বলে অভিযোগ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক লীলা রশিদ। তিনি বলেন, কৃষিঋণের একটি অংশ নির্দিষ্ট জেলার নির্দিষ্ট মানুষের কাছে যায়। তাঁদের বড় অংশই মধ্যস্বত্বভোগী। প্রকৃত কৃষক ও উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, প্রচলিত ব্যাংকব্যবস্থায় এক-তৃতীয়াংশ ঋণ খেলাপি। ক্ষুদ্রঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের ঋণ ৯৫ শতাংশই ফেরত আসে। ফলে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণের তহবিল পাওয়ার ক্ষেত্রে এমএফআইয়ের অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। এমএফআইয়ের ঋণ নিয়ে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। তবে সুদহার ২৪ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা গেলে ক্ষুদ্রঋণের চাহিদা বেড়ে যাবে। এমএফআই প্রতিষ্ঠানে সুশাসন আনতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সাত সতেরো রেস্তোরাঁর স্বত্বাধিকারী সিতি সালমা খান বলেন, তাঁর রেস্তোরাঁর স্থান পরিবর্তনের পর ট্রেড লাইসেন্স করতে এক বছর সময় লেগেছে। ট্রেড লাইসেন্স করতে গেলে ফায়ার লাইসেন্স চায় সিটি করপোরেশন। আর ফায়ার লাইসেন্স করতে গেলে ট্রেড লাইসেন্স চায়। এখানে দুষ্টচক্র আছে। সেই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
আরেক উদ্যোক্তা প্লাটিনাম প্রিন্ট অ্যান্ড প্যাকের এমডি মীর রায়হান আলী বলেন, ব্যাংকের নীতিমালা প্রণয়নের আগে উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ নেওয়া দরকার। তাহলে সেই নীতিমালা যথাযথ কাজে আসবে।
এসএমই ফাউন্ডেশন বর্তমানে উদ্যোক্তাদের ক্ষুদ্রঋণ বিতরণের পাশাপাশি তাদের বিভিন্ন অভিঘাত থেকে সুরক্ষা দিতে কাজ করছে বলে জানালেন সংস্থাটির উপমহাব্যবস্থাপক সুমন চন্দ্র সাহা। তিনি বলেন, উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ন্যানো ঋণ চালুর উদ্যোগ চলমান রয়েছে।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ বলেন, ক্ষুদ্রঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রাহক পরিচিতি তথ্য (কেওয়াইসি) সহজ করা দরকার। বাড়ি বাড়ি না গিয়ে এআই ব্যবহার করলে জটিলতা কমবে। মৌসুম ও পণ্যভেদে ভিন্ন নীতি নেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়েমা হক বিদিশা বলেন, কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা কী চান, সেটি জানা দরকার। তাঁদের চাহিদা অনুযায়ী ঋণ কর্মসূচি নিতে হবে। ছোট উদ্যোক্তাদের বড় হওয়ার সুযোগ দিতে হবে।