প্রযুক্তির বিস্তৃতি মানুষের সময় ও ব্যয় কমিয়েছে, নাগরিক সেবা সহজ করেছে। তবে প্রযুক্তির এ অগ্রগতির পাশাপাশি বেড়েছে অপব্যবহার। অনলাইনে ব্ল্যাকমেল, পরিচয় জালিয়াতি, ছবি বিকৃতি, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস ইত্যাদির মাধ্যমে সহিংসতার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন অনেকে। বিশেষ করে নারী, শিশু–কিশোরী ও ভিন্ন লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষ প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার (টিএফজিবিভি) বেশি শিকার হচ্ছেন। গতকাল সোমবার বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি) ও প্রথম আলো আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে এ কথাগুলো বলেন বক্তারা।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে ‘প্রযুক্তিসহায়ক জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা: প্রতিরোধ ও করণীয়’ শিরোনামের গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে বক্তারা প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করা, বিচার ও প্রতিকার প্রাপ্তিকে আরও কার্যকর করা, প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ও সেবাদাতা সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করা, ব্যক্তি, পরিবার ও এলাকাভিত্তিক সচেতনতা সৃষ্টির ওপর জোর দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্ট কমাতে জাতীয় পরিচয়পত্র যুক্ত করা ও কান্ট্রি স্পেসিফিক সার্ভিস (কোনো দেশের জন্য সুনির্দিষ্ট সেবা) নেওয়ার উদ্যোগ নিতে সুপারিশ করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কীভাবে নিরাপদে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে নারীদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা।
বৈঠকে ২০২৪ সালে প্রকাশিত পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করেন, এমন নারীদের মধ্যে ৮৯ শতাংশ অন্তত একবার অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ১৮-৩০ বছর বয়সী নারীরা সবচেয়ে বেশি টিএফজিবিভির শিকার হন।
অনুষ্ঠানে বলা হয়, প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার কিছু ধরনের মধ্যে রয়েছে সাইবার স্টকিং, সাইবার বুলিং, ডক্সিং, হ্যাকিং, অনলাইন হয়রানি, ইমেজ বেজড অ্যাবিউজ, চাইল্ড গ্রুমিং, প্রযুক্তির সহায়তায় যৌন নির্যাতন, জেন্ডারভিত্তিক ঘৃণাসূচক মন্তব্য।
বৈঠকে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের মহাপরিচালক (প্রশাসন বিভাগ) মো. মেহেদী–উল–সহিদ জানান, গত বছর সামাজিক মাধ্যমের কনটেন্ট অপসারণের ১৩ হাজার ২৩টি অভিযোগ পেয়েছে বিটিআরসি। ১২ হাজারের বেশি কনটেন্ট অপসারণ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের মধ্যে ৯০ শতাংশই ছিলেন নারী। নারীদের হয়রানির বিরুদ্ধে পরিবার থেকে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ আজিজুল হক বলেন, প্রযুক্তির সহায়তায় জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেশে কয়েকটি আইন রয়েছে। এসব আইন সম্পর্কে জানাতে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে।
অতিরিক্ত উপমহাপুলিশ পরিদর্শক জাহিদুল ইসলাম বলেন, কেউ আইনি সহায়তা না নিলে পুলিশের পক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে যায়। তাই আইনি সহায়তা চাওয়ার বিষয়েও সচেতনতা দরকার।
প্রযুক্তিসহায়ক জেন্ডারভিত্তিক প্রকল্প দ্রুত পাস করার প্রতিশ্রুতি দেন এনজিও–বিষয়ক ব্যুরোর ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক খলিলুর রহমান খান। তিনি আরও বলেন, অনলাইন ব্যবহার করে কী ধরনের সহিংসতা ও প্রতারণার ঘটনা ঘটতে পারে, তা নিয়ে ব্যবহারকারীদের মধ্যে সচেতনতা জরুরি।
আইনি সহায়তা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাসুদা ইয়াসমিন বলেন, প্রতিটি জেলা আদালতে আইনি সহায়তাকেন্দ্র রয়েছে। এসব জায়গায় গিয়ে ও হটলাইন নম্বর ১৬৬৯৯–এ কল করে ধনী–দরিদ্র যে কেউ আইনি সহায়তা ও পরামর্শ নিতে পারবেন।
অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্যে বিএনএনআরসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম বজলুর রহমান বলেন, প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের এ সময়ে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার নতুন ও জটিল রূপগুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবা, আলোচনা করা এবং প্রতিরোধ ও প্রতিকারের বাস্তবসম্মত পথ খুঁজে বের করতে হবে। প্রতিরোধ, সুরক্ষা, দ্রুত প্রতিকার ও ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তা নিশ্চিত করতে এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুমন আহমেদ বলেন, পুলিশের সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের হটলাইন নম্বর ০১৩২০০০০৮৮৮, ফেসবুক পেজ Police Cyber Support for Women-PCSW ও ই–মেইল cybersupport.women@police.gov.bd ব্যবহার করে সহিংসতার শিকার নারীরা অভিযোগ জানাতে পারবেন। তিনি জানান, অনলাইনে সবচেয়ে বেশি ডক্সিংয়ের (বাসার ঠিকানা, ফোন নম্বর ইত্যাদি অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করে হুমকি দেওয়া) শিকার হন নারীরা। এ হার ৪৮ শতাংশ।
বিএনপির স্বনির্ভরবিষয়ক সহসম্পাদক নিলোফার চৌধুরী বলেন, অনলাইনে সহিংসতার শিকার হওয়ার পর একজন নারী মানসিকভাবে যে আঘাতপ্রাপ্ত হন, তা সহজে সারে না। এ ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রশাসনকে আরও জোরালো ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশ উইমেন ইন আইটির সাবেক পরিচালক কানিজ ফাতেমা বলেন, টিএফজিবিভির শিকার নারীরা যেন আইনি সহায়তা নেন, সে পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
ক্যাপাসিটি বিল্ডিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিশেষজ্ঞ মো. নুরুল ইসলাম বলেন, সামাজিক সংস্কারের ভয়ে টিএফজিবিভির শিকার নারীদের ৭৫ শতাংশই অভিযোগ করেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় লুকিয়ে ভুয়া অ্যাকউন্টের মাধ্যমে নারীদের হয়রানি করা হয়। ভুয়া অ্যাকাউন্ট ঠেকাতে অ্যাকাউন্ট খোলার সময় জাতীয় পরিচয়পত্র যুক্ত করার বাধ্যবাধকতা থাকার ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
এ বিষয়ে ভিউস বাংলাদেশের সম্পাদক রাশেদ মেহেদী আরও বলেন, মেটার মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে বাংলাদেশকে উপাত্ত সুরক্ষা আইনের ধারায় সম্পৃক্ত করতে হবে। তাদের কাছ থেকে কান্ট্রি স্পেসিফিক সার্ভিস নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে ভুয়া আইডি বা অ্যাকাউন্ট তৈরি বন্ধ হবে।
চর্চা ডট কমের সম্পাদক সোহরাব হাসান অনলাইনে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা দূর করতে অপরাধ যেন না ঘটে, সেই লক্ষ্যে সমাজে সচেতনতা সৃষ্টির ওপর জোর দেন।
অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের ইয়ুথ অ্যান্ড সোশ্যাল কোহিশন লিড ওয়াসিউর রহমান তন্ময়, মেট্রোনেট বাংলাদেশ লিমিটেডের সিইও সৈয়দ আলমাস কবীর, বাংলাদেশ উইমেন ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরামের চেয়ারপারসন শামীমা আকতার, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শাহনাজ মুন্নী, একাত্তর টিভির বিশেষ প্রতিনিধি শাহনাজ শারমীন, চ্যানেল আইয়ের বিশেষ প্রতিনিধি জান্নাতুল বাকেয়া কেকা, ডেইলি স্টার–এর জেবা মোবাশ্বিরা, বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরামের মহাসচিব মোহাম্মদ আবদুল হক, উন্নয়নকর্মী এস এম মোর্শেদ, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ (বরিশাল) আন্দোলন সম্পাদক শিউলি সাহা, কুষ্টিয়ার মানবাধিকারকর্মী বন্দনা চাকী, ময়মনসিংহের শান্তি মিত্র সমাজকল্যাণ সংস্থার সদস্য সানজানা আফরোজ ও বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির জেন্ডার ফোকাল ফারজানা হক।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।