
‘বিশ্ব হার্ট দিবস ২০২৬: প্রতিটি হৃৎস্পন্দনই জীবন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলোর কার্যালয়ে। আয়োজক ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ ও প্রথম আলো। সায়েন্টিফিক পার্টনার ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড
অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন
মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর
অধ্যাপক ডা. খন্দকার আব্দুল আউয়াল রিজভী
সভাপতি, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ
অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম
অধ্যাপক, নিউরো সার্জারি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
অধ্যাপক ডা. ফজিলা-তুন–নেসা মালিক
মহাসচিব, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ
ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ
অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ বদিউজ্জামান
অধ্যাপক ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট কার্ডিওলজি, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট
অধ্যাপক ডা. মেজর (অব.) এম কামরুল ইসলাম তালুকদার
অধ্যাপক ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট কার্ডিয়াক সার্জন
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট
অধ্যাপক ডা. তওফিক শাহরিয়ার হক
অধ্যাপক ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট, পেডিয়াট্রিক অ্যান্ড অ্যাডাল্ট কনজেনিটাল হার্ট ডিজিজ,ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট
ডা. এম সাইফুদ্দিন
সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
সৈয়দা ফারহানা মাহমুদ
নিউট্রিশনিস্ট ও ডায়েটিশিয়ান
আশরাফ উদ্দীন আহমেদ
নির্বাহী পরিচালক, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড
সঞ্চালনা: ফিরোজ চৌধুরী
সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো
অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন
মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর
হৃৎস্পন্দনই জীবনের অন্যতম প্রধান চিহ্ন। মাতৃগর্ভে ছয় সপ্তাহ বয়সে হৃৎস্পন্দন শুরু হয়, মৃত্যুর আগে তা থেমে যায়। তাই ‘প্রতিটি হৃৎস্পন্দনই জীবন’—এ উপলব্ধি থেকেই হৃদ্রোগ সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি। বিশ্বজুড়ে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মৃত্যুর কারণ কার্ডিওভাসকুলার রোগ। বাংলাদেশেও প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ হৃদ্রোগে মারা যান, আর অকালমৃত্যুর ক্ষেত্রে এর ভূমিকা আরও বেশি। এত বড় রোগের বোঝা ও চিকিৎসার ব্যয় বহন করা আমাদের মতো দেশের জন্য কঠিন। তাই হৃদ্রোগ প্রতিরোধকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
এ রোগের চিকিৎসার সুযোগও সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে। এখনো হৃদ্রোগের চিকিৎসা অনেকটাই ঢাকাকেন্দ্রিক। রাজশাহী, চট্টগ্রাম, দিনাজপুর বা ময়মনসিংহের একজন রোগীকে ঢাকায় এসে চিকিৎসা নিতে হলে তাঁর চিকিৎসার পাশাপাশি অর্থনৈতিক বোঝাও বাড়ে। রোগ নির্ণয় থেকে শুরু করে ইনভেসিভ ডায়াগনস্টিক, ইন্টারভেনশন ও সার্জারি—সব ধরনের সেবার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। দেশের বড় একটি অংশ ঢাকার বাইরে বাস করে; তাদের জন্য ঢাকায় আসার বাধ্যবাধকতা কমানো আমাদের দায়িত্ব। তাই সরকারি ও বেসরকারি—দুই উদ্যোগেই সারা দেশে চিকিৎসাব্যবস্থা বিস্তৃত করতে হবে। বিভাগীয় পর্যায়ে হৃদ্রোগের চিকিৎসাকেন্দ্র তৈরির কাজ চলছে। তবে দক্ষ জনবলের সংকট আছে, বিশেষ করে শিশুর হৃদ্রোগ চিকিৎসায়। একই সঙ্গে চিকিৎসকদের ঢাকার বাইরে যাওয়ার অনীহা এবং সেখানে রোগীদের আস্থার ঘাটতিও কাটাতে হবে। চিকিৎসকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।
সবচেয়ে আগে প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। ‘ঢাকাটাই বাংলাদেশ’—এই মনস্তত্ত্ব থেকে আমাদের বের হতে হবে। রোগ প্রতিরোধের উপলব্ধি পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও পৌঁছে দিতে হবে। খেলাধুলার বদলে মুঠোফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার, ঐতিহ্যবাহী খাবারের পরিবর্তে ফাস্ট ফুড—এসব অভ্যাস বদলাতে হবে। সচেতনতা, সরকারি উদ্যোগ, বেসরকারি অংশগ্রহণ ও গণমাধ্যমের সমর্থনের মাধ্যমে আমরা হৃদ্রোগ মোকাবিলায় আরও কার্যকর পরিবেশ তৈরি করতে পারি।
অধ্যাপক ডা. খন্দকার আব্দুল আউয়াল রিজভী
সভাপতি, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ
‘প্রতিটি হৃৎস্পন্দনই জীবন’—বিশ্ব হার্ট দিবসের এই বার্তা আমাদের মনে রাখতে হবে। বাংলাদেশে হৃদ্রোগের পরিস্থিতি ভয়াবহ। দেশে দেড় কোটির বেশি মানুষ হৃদ্রোগে আক্রান্ত। মোট মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশের কারণ হৃদ্রোগ। অথচ এই বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসার জন্য আমাদের সক্ষমতা সীমিত। সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত জায়গা নেই; অনেকে মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বেসরকারি হাসপাতালেও সিট পাওয়া কঠিন। সারা দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে আইসিইউ বেড মাত্র তিন হাজার, যার বেশির ভাগই ঢাকাকেন্দ্রিক। দুই শতাধিক কার্ডিয়াক সার্জনের মধ্যে ঢাকার বাইরে আছেন মাত্র ১৫ থেকে ২০ জন। কার্ডিয়াক নার্স ও টেকনিশিয়ানেরও ঘাটতি রয়েছে।
এ অবস্থায় চিকিৎসাসেবা সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি। শুধু হাসপাতাল ও যন্ত্রপাতি বাড়ালেই হবে না, দক্ষ জনবলও তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে বিভাগীয়, জেলা ও আঞ্চলিক পর্যায়ে কার্ডিয়াক চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। হৃদ্রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল; কার্ডিয়াক সার্জারিতে আড়াই থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে বহন করা কঠিন। তাই চিকিৎসা সাশ্রয়ী করতে সরকারকে আরও এগিয়ে আসতে হবে। চিকিৎসা ও হাসপাতালের ওপর কর কমাতে হবে, বেসরকারি খাতকে প্রণোদনা দিতে হবে এবং গুরুত্ব দিয়ে স্বাস্থ্যবিমা চালু করতে হবে।
তবে শুধু চিকিৎসা দিয়ে এ সংকট মোকাবিলা করা যাবে না, প্রতিরোধে জোর দিতে হবে। হৃদ্রোগের প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিরোধের সুযোগ রয়েছে। সুষম খাবার, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার মতো সহজ অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তরুণদের মধ্যেও হৃদ্রোগ বাড়ছে। তাই প্রতিটি হৃৎস্পন্দনকে জীবন হিসেবে মূল্য দিতে হলে প্রতিরোধ, সচেতনতা ও সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা—তিনটিকেই গুরুত্ব দিতে হবে।
অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম
অধ্যাপক, নিউরোসার্জারি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোককে আমরা অনেক সময় আলাদা দুটি রোগ হিসেবে দেখি। কিন্তু দুটির ঝুঁকির কারণ অনেকটাই একই। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থবির জীবনযাপন, স্থূলতা, উদ্বেগ ও আসক্তির মতো বিষয়গুলো যেমন হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়, তেমনি স্ট্রোকেরও কারণ হতে পারে। আবার হৃদ্যন্ত্রের ছন্দ অনিয়মিত হলে সেখানে রক্তের জমাট তৈরি হয়ে মস্তিষ্কের রক্তনালি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। রক্তনালির অসুখ হলে তার প্রভাব হার্টে যেমন পড়ে, মস্তিষ্কেও পড়তে পারে। তাই হার্ট ও মস্তিষ্ককে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। এই দুই রোগের প্রতিরোধেও আমাদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, চোখে ঝাপসা দেখা বা দেখতে না পাওয়া, মুখ একদিকে বেঁকে যাওয়া, শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে যাওয়া কিংবা কথায় জড়তা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নিতে হবে। এসব লক্ষণ আমরা ‘বি ফাস্ট’–এর মাধ্যমে সহজে মনে রাখতে পারি। যত দ্রুত রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা দেওয়া যায়, সুস্থ হয়ে ফেরার সুযোগ তত বেশি থাকে। এ বার্তা আমাদের আরও জোরালোভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
আবার হঠাৎ চোখের সামনে পর্দার মতো আসা, শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে যাওয়া বা কিছুক্ষণ পর তা ঠিক হয়ে যাওয়াকেও অবহেলা করা যাবে না। ট্রানজিয়েন্ট ইস্কেমিক অ্যাটাক বা টিআইএ ভবিষ্যতে বড় স্ট্রোকের সতর্কবার্তা হতে পারে। তাই এমন উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করাতে হবে।
রোগ প্রতিরোধে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষারও গুরুত্ব রয়েছে। বছরে একবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করলে লিপিড প্রোফাইলসহ বিভিন্ন অস্বাভাবিকতা জানা সম্ভব। পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের লক্ষণ, ঝুঁকি ও প্রতিরোধের বার্তা মানুষের কাছে সহজভাবে পৌঁছে দিতে পারলে সচেতনতা বাড়বে। হৃদ্রোগ ও স্ট্রোক প্রতিরোধে তাই সচেতনতা, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসার সমন্বিত উদ্যোগই আমাদের এগিয়ে নিতে পারে।
অধ্যাপক ডা. ফজিলা-তুন–নেসা মালিক
মহাসচিব, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ
আমাদের জীবনে হৃদ্যন্ত্রের প্রতিটি স্পন্দনই মূল্যবান। ছোট ছোট উপসর্গকেও অবহেলা করা যাবে না। একজন গৃহিণী কয়েক দিন ধরে স্বাভাবিক কাজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন বা সামান্য শ্বাসকষ্ট অনুভব করছেন, একজন কর্মকর্তা দুপুরের দিকে নিয়মিত মাথা ভার বা ঝিমঝিম বোধ করছেন কিংবা আগে অনায়াসে সিঁড়ি ভাঙতে পারা একজন মানুষ এখন দু-তিন ধাপ উঠেই দাঁড়িয়ে পড়ছেন—এসব লক্ষণ আমরা প্রায়ই গুরুত্ব দিই না। অথচ প্রতিটি উপসর্গেরই একটি বার্তা আছে। সময়মতো সেগুলোকে গুরুত্ব দিলে বড় কোনো সমস্যা হওয়ার আগেই তা শনাক্ত করে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
প্রায় ৮০ শতাংশ হৃদ্রোগ প্রতিরোধযোগ্য। তাই নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং প্রতিদিনের ছোট ছোট বিষয়ে বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। আমার যদি উচ্চ রক্তচাপ থাকে, সেটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ডায়াবেটিস থাকলে তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কোলেস্টেরল বেশি থাকলে সেটিও কমাতে হবে। জীবনযাপনের ক্ষেত্রেও সচেতন পছন্দ করা দরকার। সিঁড়ি দিয়ে উঠব নাকি লিফট ব্যবহার করব—সুযোগ থাকলে সিঁড়ি বেছে নিতে পারি। ফিজি ড্রিংকের বদলে ডাবের পানি নিতে পারি। ধূমপান থেকেও নিজেকে সরিয়ে আনতে হবে। প্রতিদিনের এমন ছোট ছোট সচেতন সিদ্ধান্ত একত্র হয়েই একটি সুস্থ, হৃদ্রোগমুক্ত জীবনের ভিত্তি তৈরি করে।
তবে বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগে সীমাবদ্ধ নয়। সরকারেরও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। সরকার যদি দূষণমুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে পারে, তাহলে হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমবে। তামাকের বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালী পদক্ষেপ নিতে হবে। বিভিন্ন পর্যায়ে উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের সুযোগ বাড়াতে হবে। একেকটি ছোট উদ্যোগ আলাদাভাবে হয়তো বড় মনে হবে না, কিন্তু এসব উদ্যোগ সম্মিলিতভাবে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক পরিসর ও সরকারি পর্যায়—সব ক্ষেত্রেই হৃদ্স্বাস্থ্যের প্রতিটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।
ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ
অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
হৃদ্রোগ শুধু মানুষের জীবন নয়, একটি পরিবারের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকেও নাড়িয়ে দেয়। আমাদের দেশে হৃদ্রোগের চিকিৎসায় মানুষের নিজের পকেট থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। এ রোগের চিকিৎসা যে কত ব্যয়বহুল, তার উদাহরণ আমরা আলোচনাতেই পেয়েছি। ফলে প্রশ্ন হচ্ছে, এই ব্যয়ের বোঝা কীভাবে কমানো যায় এবং চিকিৎসা কীভাবে মানুষের নাগালের মধ্যে আনা যায়।
এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিমার কথা বলা হয়। কিন্তু আমাদের বাস্তবতা একটু জটিল। দেশের মাত্র ১২ থেকে ১৩ শতাংশ মানুষ আনুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। তাঁদের ক্ষেত্রে বেতন থেকে নিয়মিত প্রিমিয়াম সংগ্রহ করে স্বাস্থ্যবিমা চালু করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু বাকি ৮৭ শতাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে রয়েছেন। তাঁদের কাছ থেকে নিয়মিত প্রিমিয়াম আদায় করা অত্যন্ত কঠিন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রিমিয়াম সরকার ভর্তুকি দিয়ে বা বিনা মূল্যে বহন করতে চাইলে রাষ্ট্রের সেই আর্থিক সক্ষমতাও এখনো তৈরি হয়নি।
আরেকটি সমস্যা সরকারি হাসপাতালকে স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আনার ক্ষেত্রে। বিমার মাধ্যমে সরকারি হাসপাতাল সেবা দিলে সেখান থেকে পাওয়া অর্থ প্রয়োজন অনুযায়ী হাসপাতালেই ব্যয় করার সুযোগ থাকতে হবে। বর্তমান সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিধিতে সেই সুযোগ নেই। তাই স্বাস্থ্যবিমা চালু করতে হলে এই বিধিতে পরিবর্তন আনতে হবে।
এই বাস্তবতায় আমি স্বাস্থ্যবিমার বিকল্প হিসেবে একটি জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল গঠনের প্রস্তাব করছি। এই তহবিল থেকে সরকারি হাসপাতালের অর্থায়নের ঘাটতি পূরণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি হৃদ্রোগসহ ব্যয়বহুল রোগের চিকিৎসায় রোগীদের সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে।
‘প্রতিটি হৃৎস্পন্দনই জীবন’—এ বার্তাকে বাস্তব অর্থ দিতে হলে চিকিৎসার ব্যয় বহনের সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে।
অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ বদিউজ্জামান
অধ্যাপক ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট, কার্ডিওলজি, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট
হৃদ্রোগের ঝুঁকি নিয়ে এত দিন আমরা উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরলের কথা বলে এসেছি। এর সঙ্গে এখন আরও একটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে—আমরা দক্ষিণ এশীয় কি না। দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর হৃদ্রোগের ঝুঁকি অন্য অনেক জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি এবং হৃদ্রোগের প্রক্রিয়াও তুলনামূলকভাবে আগেই শুরু হতে পারে। আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনও দক্ষিণ এশীয় হওয়াকে একটি আলাদা ঝুঁকির কারণ হিসেবে বিবেচনা করে। এর পেছনে জিনগত বৈশিষ্ট্যও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে লাইপোপ্রোটিন (এ)-এর আধিক্য হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। পরিবারে হৃদ্রোগের ইতিহাস থাকলে তাই শিশু বয়স থেকেই স্বাস্থ্যকর খাবার ও জীবনযাপনের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানোর বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।
তরুণদের হৃদ্রোগের ক্ষেত্রেও কিছু ঝুঁকি বিশেষভাবে দেখা যাচ্ছে। ধূমপান, কোলেস্টেরলের আধিক্য, স্থূলতা, মানসিক চাপ, প্রদাহ ও বায়ুদূষণ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘমেয়াদি স্থূলতাও ঝুঁকি বাড়ায়। ভ্যাপিং ও সিসার ব্যবহার নিয়েও আমাদের সতর্ক হতে হবে। বায়ুদূষণের সূক্ষ্ম কণা শরীরে প্রবেশ করে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে হৃদ্রোগের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের প্রচলিত ধারণার বাইরেও এখন এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।
নারীদের ক্ষেত্রেও হৃদ্রোগ নিয়ে একটি বড় ভুল ধারণা রয়েছে—তাঁদের হৃদ্রোগ কম হয়। এ কারণে অনেক সময় উপসর্গ উপেক্ষিত হয়। নারীরা নিজেরাও পরিবার ও পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজেদের শারীরিক সমস্যাকে গুরুত্ব দেন না। আবার চিকিৎসার সিদ্ধান্তেও অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের পরিবারের ওপর নির্ভর করতে হয়। অস্বাভাবিক ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট, পিঠ বা ঘাড়ে ব্যথা, চোয়ালে ব্যথা কিংবা ওপরের পেটে ব্যথার মতো উপসর্গকেও তাই গুরুত্ব দিতে হবে।
ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি বায়ুদূষণ, তামাক ও খাদ্যদূষণের মতো ঝুঁকিগুলোর বিষয়েও আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। হৃদ্রোগের ঝুঁকি যত আগে শনাক্ত করা যাবে, প্রতিরোধের সুযোগও তত বাড়বে।
অধ্যাপক ডা. মেজর (অব.) এম কামরুল ইসলাম তালুকদার
অধ্যাপক ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট, কার্ডিয়াক সার্জন, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট
বাংলাদেশে গত ২০ বছরে বাইপাস সার্জারির অনেক উন্নতি হয়েছে। আগে অধিকাংশ রোগী চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতেন, এখন প্রায় ৯০ শতাংশ রোগীর অপারেশন দেশেই হচ্ছে। এটি রোগীদের আস্থারও প্রতিফলন। বাইপাস একটি বড় ও জটিল অপারেশন হলেও এর সাফল্যের হার প্রায় ৯৮ শতাংশ। অপারেশনের পর অধিকাংশ রোগী স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন। এখন মিনিমাল ইনভেসিভ ও রোবট-সহায়িত সার্জারির মতো নতুন পদ্ধতিও বাংলাদেশে শুরু হয়েছে। এতে শরীরের ক্ষত কম হয় এবং দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ তৈরি হয়। তবে এগুলো এখনো ব্যয়বহুল; প্রচলিত সার্জারির বিকল্প হিসেবে সেটিই প্রধান পদ্ধতি।
করোনারি আর্টারি ডিজিজে হৃদ্যন্ত্রের রক্তনালিতে ব্লক তৈরি হলে রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়। তখন রোগীর বুকে ব্যথা হতে পারে, এমনকি হার্ট অ্যাটাকও হতে পারে। অ্যানজিওগ্রামের মাধ্যমে ব্লকের সংখ্যা ও অবস্থান দেখে আমরা সিদ্ধান্ত নিই—রোগীর ওষুধে চলবে, স্টেন্টিং লাগবে, নাকি বাইপাস সার্জারি প্রয়োজন। যেসব ক্ষেত্রে একাধিক ব্লক থাকে এবং স্টেন্টিং উপযুক্ত নয়, সাধারণত আমরা তাঁদের বাইপাস সার্জারির পরামর্শ দিই। ব্লক অংশটি এড়িয়ে নতুন পথে রক্ত চলাচলের ব্যবস্থা করা হয় বলেই এর নাম বাইপাস সার্জারি।
অপারেশনের পর রোগীকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক পরিবার মনে করে, হার্টের অপারেশন হলে রোগী আর স্বাভাবিক কাজ করতে পারবেন না। এ ধারণা বদলাতে রোগীর পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও কাউন্সেলিং প্রয়োজন। স্থানীয় চিকিৎসকদেরও এ বিষয়ে প্রশিক্ষিত হওয়া দরকার, যাতে ছোটখাটো সমস্যায় রোগীকে অযথা ঢাকায় পাঠাতে না হয়।
বাইপাস সার্জারি ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল চিকিৎসা। তাই প্রশিক্ষিত জনবল প্রয়োজন। আমাদের দেশে সেই জনবল এখনো যথেষ্ট নয় এবং যা আছে, তার বড় অংশ ঢাকাকেন্দ্রিক। চিকিৎসাসেবা সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে এই ঘাটতি পূরণ করা জরুরি। রোগীকে চিকিৎসার পাশাপাশি স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দেওয়াটিও আমাদের দায়িত্ব।
অধ্যাপক ডা. তওফিক শাহরিয়ার হক
অধ্যাপক ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট, পেডিয়াট্রিক অ্যান্ড অ্যাডাল্ট কনজেনিটাল হার্ট ডিজিজ, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট
জন্মগত হৃদ্রোগের বিষয়টি গত ১০ বছরে অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এ বছর বিশ্ব হার্ট দিবস উপলক্ষে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্তায় উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়ার পাশাপাশি জন্মগত হৃদ্রোগকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আমাদের দেশে এ বিষয়ে জাতীয় কোনো পরিসংখ্যান নেই। বিদেশি তথ্য ধরে বলা যায়, প্রতি ১০০ জীবিত শিশুর মধ্যে ৮ থেকে ১০ জন জন্মগত হৃদ্রোগ নিয়ে জন্মায়। সে হিসাবে প্রতিবছর আমাদের দেশে ৭০ হাজারের বেশি শিশু জন্মগত হৃদ্রোগ নিয়ে জন্মায়। বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ এ রোগ নিয়ে বেড়ে উঠছেন।
একটি শিশু জন্মগত হৃদ্রোগ নিয়ে জন্মেছে, এ কথা মেনে নেওয়া মা-বাবা বা পরিবারের জন্য সহজ নয়। সন্তানের সুস্থতার বিষয়ে সবার আগে মাকে সচেতন হতে হবে। মা হওয়ার আগে নিজের দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যেমন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা থাইরয়েডের সমস্যা আছে কি না, কী ওষুধ সেবন করছেন—এসব বিষয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, দূষণ কিংবা পরিবারের অন্যদের ধূমপানের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
শিশুর কিছু লক্ষণও আমরা অবহেলা করি। শিশু খেতে চাইছে না, বেশি ঘামছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, খাওয়ার সময় ঘামছে কিংবা কাঁদলে শরীর নীলচে বা ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে—এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে গুরুত্ব দিতে হবে। জন্মগত হৃদ্রোগ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে স্ক্রিনিংয়ের ভূমিকা অপরিসীম। অনেক জন্মগত হৃদ্রোগে জন্মের পরপরই চিকিৎসা বা হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়। অথচ অনেক শিশু টিকাদান, স্কুল বা মাদ্রাসায় ভর্তির মতো বিভিন্ন পর্যায় পার হলেও যথাযথ স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আসে না। টিকাদানের সময় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা গেলে অনেক রোগ আগেই শনাক্ত করা সম্ভব। কারণ, অনেক জন্মগত হৃদ্রোগই চিকিৎসাযোগ্য। সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা করা গেলে শিশুটি স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেতে পারে। সচেতনতা, স্ক্রিনিং এবং জাতীয় পর্যায়ে একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর আমাদের জোর দিতে হবে।
ডা. এম সাইফুদ্দিন
সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ডায়াবেটিসের কারণে রোগীরা যতটা না মারা যান, তার চেয়ে বেশি মারা যান হার্ট অ্যাটাক ও দীর্ঘমেয়াদি জটিলতায়। দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা বেশি থাকলে রক্তনালিতে স্থায়ী পরিবর্তন ও শক্ত হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ফলে রক্তনালিতে প্লাক তৈরি হয়ে তা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ডায়াবেটিস একা আসে না।
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, শরীরে লবণ জমে থাকা ও ফ্যাটি লিভারের মতো সমস্যাও যুক্ত হয়। ডায়াবেটিসে ট্রাইগ্লিসারাইড বেড়ে যায়, ভালো কোলেস্টেরল কমে এবং ক্ষতিকর এলডিএলেরও পরিবর্তন হয়। ফলে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে শরীরে প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং হৃদ্যন্ত্রের পেশিতে পরিবর্তন দেখা দেয়। ডায়াবেটিস কিডনি রোগ ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
শুধু রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না, আমাদের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে রোগীকে চিকিৎসা দিতে হবে। জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও অন্যান্য সহ-অসুস্থতা—সবকিছুকে বিবেচনায় নিতে হবে। ভালোভাবে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ শুধু জটিলতা প্রতিরোধের জন্য নয়, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক প্রতিরোধেরও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
রোগীদের মধ্যে ইনসুলিন নিয়ে একটি ভুল ধারণা আছে—ইনসুলিন যেন শাস্তি বা ডায়াবেটিস চিকিৎসার শেষ ধাপ। এটি ঠিক নয়। রোগীর জন্য যে চিকিৎসা সবচেয়ে উপযোগী, সেটিই দিতে হবে; তা মুখে খাওয়ার ওষুধ, ইনসুলিন কিংবা দুটির সমন্বয় হতে পারে। কিছু নির্দিষ্ট অবস্থায় ইনসুলিন দেওয়া প্রয়োজন হয়। একই সঙ্গে রোগীকে নিয়মিত চিকিৎসার আওতায় রাখতে হবে।
চিকিৎসা নির্ধারণের সময় রোগীর সামর্থ্য ও চিকিৎসার খরচের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কারণ, অনেক সময় ব্যয়বহুল চিকিৎসা দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়া রোগীর পক্ষে সম্ভব হয় না। তাই রোগীর জন্য উপযোগী ও সাধ্যের মধ্যে থাকা চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণসহ হৃদ্রোগ প্রতিরোধে আমাদের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।
সৈয়দা ফারহানা মাহমুদ
নিউট্রিশনিস্ট ও ডায়েটিশিয়ান
হৃদ্রোগীর কাছে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের কথা বললে অনেকেই ভয় পান। আমি তাঁদের আশ্বস্ত করি, খাবারে আমূল পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। সামান্য কিছু পরিবর্তন করেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব। ভাত বা রুটির পরিমাণ কমিয়ে শাকসবজিকে প্রাধান্য দিতে হবে। এতে ফাইবার, ভিটামিন ও খনিজ পাওয়া যাবে। প্রক্রিয়াজাত খাবারের বদলে মৌসুমি ফল খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে।
প্রোটিনের ক্ষেত্রেও সচেতন হতে হবে। মাছ, মুরগি ও ডিম খাওয়া যেতে পারে। লাল মাংস পরিহার করা বা মাঝেমধ্যে খাওয়া ভালো। খুব বেশি সমস্যা না থাকলে ডিমের কুসুমও খাওয়া যায়। ডিমের কোলেস্টেরল হার্টের জন্য খুব ক্ষতিকর নয়।
তেলের ক্ষেত্রেও পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি। অলিভ অয়েল, রাইস ব্র্যান অয়েল বা শর্ষের তেল খাওয়া যেতে পারে। তবে ‘কোলেস্টেরল ফ্রি’ লেখা থাকলেও বেশি তেল খাওয়ার সুযোগ নেই। তেল তো তেলই, পানি নয়। অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও ফ্রায়েড ফুড এড়িয়ে হালকা মসলায় রান্না করে খাওয়া স্বাস্থ্যসম্মত। বাদামও হার্টের জন্য ভালো, তবে পরিমিত পরিমাণে খেতে হবে। দুধ হজম হলে দুধ, না হলে টক দই খাওয়া যেতে পারে।
তরুণদের হৃদ্রোগের ক্ষেত্রে বংশগত সমস্যায় আমাদের হাত নেই। কিন্তু দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন আনার সুযোগ আমাদের আছে। জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনতে পারলে হৃদ্রোগের প্রকোপ কমানো সম্ভব। শিশুর খাদ্যাভ্যাস তৈরি হয় পরিবার থেকেই। শিশু বয়সেই পরিবারে সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
আশরাফ উদ্দীন আহমেদ
নির্বাহী পরিচালক, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড
হৃদ্রোগের চিকিৎসায় শুধু চিকিৎসা নিশ্চিত করলেই হবে না, রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধও সুলভ ও সহজলভ্য করতে হবে। ফার্মেসিশিল্প হিসেবে এ ক্ষেত্রে আমাদেরও কিছু দায়িত্ব আছে। সুলভ ওষুধ বলতে শুধু কম দাম বোঝালে হবে না। ওষুধটি মানসম্পন্ন কি না, রোগীর ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আছে কি না এবং দেশের সর্বত্র পাওয়া যায় কি না—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।
ইনসেপ্টা শুরু থেকেই দেশে নতুন নতুন ওষুধ নিয়ে আসার পাশাপাশি কম দামে তা মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। ওষুধের মান অক্ষুণ্ন রেখে কাঁচামাল, উৎপাদনপ্রযুক্তি, গুণগত নিশ্চয়তা, নিয়ন্ত্রক শর্ত ও বিতরণব্যবস্থা—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই আমরা দাম নির্ধারণ করি। ভবিষ্যতে ওষুধের দাম যাতে না বাড়ে, সে জন্যও কাজ করছি। দেশে ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়ায় কিছু ওষুধের দাম অর্ধেকের নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
হৃদ্রোগের চিকিৎসায় অস্ত্রোপচার বা রিং বসানোর পরও রোগীকে দীর্ঘদিন ওষুধ খেতে হয়। দরিদ্র মানুষের জন্য এই ব্যয় বহন করা কঠিন। তাই প্রয়োজনীয় ওষুধের প্যাকেজ করে দাম কমানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সরকার কর বা ভ্যাট কমানোর বিষয়টিও বিবেচনা করতে পারে।
একজন হৃদ্রোগীর কাছে ওষুধ কোনো সাধারণ পণ্য নয়; এটি তাঁর বেঁচে থাকা ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন। কোনো রোগী যেন শুধু ওষুধ কিনতে না পারার কারণে বিনা চিকিৎসায় মারা না যান, সেটিই আমাদের লক্ষ্য। আমরা কম দামে ওষুধ দেওয়ার পাশাপাশি সারা দেশে, প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত এর প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে চেষ্টা করছি।
হৃদ্রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে জোর দিতে হবে।
উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
ঢাকার বাইরে হৃদ্রোগের চিকিৎসা ও দক্ষ জনবল বাড়াতে হবে।
হৃদ্রোগের চিকিৎসা সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য করতে হবে।
জন্মগত হৃদ্রোগ শনাক্তে জাতীয় স্ক্রিনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
সুলভ ওষুধের প্রাপ্যতা, বিশেষ করে দরিদ্র রোগীদের জন্য, নিশ্চিত করতে হবে।
হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের লক্ষণ এবং জরুরি চিকিৎসা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
সরকার, চিকিৎসক, বেসরকারি খাত ও গণমাধ্যমের সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।
হৃদ্রোগের জরুরি লক্ষণ ও দ্রুত চিকিৎসার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।