
‘প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: উৎপাদনকারীর সম্প্রসারিত দায়িত্ব (ইপিআর-২০২৬)’ শীর্ষক বৈঠকের আয়োজন করে ওয়াটারএইড বাংলাদেশ ও প্রথম আলো।
প্লাস্টিক দূষণ কমানো এবং প্লাস্টিক বর্জ্যের যথাযথ ব্যবস্থাপনা এককভাবে করা সম্ভব নয়। প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহার নিশ্চিতে উৎপাদনকারী, ভোক্তা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সঠিক সমন্বয় দরকার। উৎসস্থলে বর্জ্য আলাদা করা এবং বর্জ্য সংগ্রহে নিয়োজিত অনানুষ্ঠানিক খাতকে মূলধারায় আনতে হবে। জনবল বাড়িয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে প্লাস্টিকের উৎপাদন, ভোগ ও আমদানির সঠিক উপাত্তের ভিত্তিতে একটি পথনকশা করা দরকার।
গতকাল বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা উঠে আসে। ‘প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: উৎপাদনকারীর সম্প্রসারিত দায়িত্ব (ইপিআর-২০২৬)’ শীর্ষক এ বৈঠকের আয়োজন করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়াটারএইড বাংলাদেশ ও প্রথম আলো। এতে সহযোগিতা করে সুইজারল্যান্ড সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত ওয়াটারএইড ও সুইসকন্ট্যাক্ট কনসোর্টিয়ামের ‘গো–ফর–ইমপ্যাক্ট’ কর্মসূচি।
বৈঠকে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি বলেন, ‘প্লাস্টিক একটা ভয়াবহ দুর্যোগ তৈরি করছে আমাদের জন্য। স্বাস্থ্যহানির পাশাপাশি এটি জলাবদ্ধতা তৈরি করছে। বুড়িগঙ্গার তলদেশে ৬ থেকে ৮ ফুট প্লাস্টিকের স্তর জমে আছে।’
প্লাস্টিক দূষণ কমিয়ে এর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে উৎপাদনকারীর সম্প্রসারিত দায়িত্ব (ইপিআর–২০২৬) প্রণয়ন করা হয়েছে জানিয়ে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ইপিআরের সবাই প্রশংসা করছে। কিন্তু এর চ্যালেঞ্জ হলো বাস্তবায়ন। ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সাল—এই ২৮ বছরে প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়েছে ৮০ গুণ। এ সময়ে এটি ১৫ হাজার টন থেকে ১৮ লাখ টনে পৌঁছেছে। জাতিকে প্লাস্টিক দূষণের হাত থেকে বাঁচাতে যা যা করা, তার সবটুকু করবেন বলে আশ্বাস দেন তিনি।
গত আগস্টে পরিবেশ অধিদপ্তর প্লাস্টিক বর্জ্যের ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে উৎপাদনকারীর সম্প্রসারিত দায়িত্ব বা ইপিআর–২০২৬ নামের একটি নির্দেশিকা তৈরি করে। এ নির্দেশিকার আওতায় কোনো কোম্পানি প্লাস্টিক আমদানি ও পণ্য উৎপাদনে প্লাস্টিকের ব্যবহার করলে সেই বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় ওই কোম্পানিকে দায়িত্ব নিতে হবে।
অনানুষ্ঠানিক খাতকে মূলধারায় আনার তাগিদ
পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (বর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ ব্যবস্থাপনা) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে বলা আছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দুই লাখ অনানুষ্ঠানিক শ্রমিককে আনুষ্ঠানিক খাতে আনা হবে। সরকার কিন্তু একদম ইন-লাইনে (সঠিক পথে) আছে। তাদের উৎসাহ দিতে ফ্যামিলি কার্ড, হেলথ কার্ডের মতো আনুষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া যেতে পারে।
পিইটি (পলিইথিলিন টেরেফথ্যালেট) ধরনের প্লাস্টিকের বাজারমূল্য বেশি হওয়ায় এগুলোর পুনর্ব্যবহারের হারও বেশি উল্লেখ করে বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স ও এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সামিম আহমেদ বলেন, ‘তবে বহুস্তরবিশিষ্ট প্লাস্টিক ও কম ঘনত্বের কিছু প্লাস্টিক অর্থনৈতিকভাবে পুনর্ব্যবহার করা লাভজনক না হওয়ায় সেগুলোর বড় অংশই সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের বাইরে থেকে যায়। সেটা কীভাবে সংগ্রহের আওতায় আনা যায়, সেটা আমাদের ভাবতে হবে।’
স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মালিক মোহাম্মদ সাঈদ দেশের একটি পৌরসভায় প্লাস্টিকের পুনঃ চক্রায়নের (রিসাইকেল) অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে প্লাস্টিক রিসাইকেল করতে গিয়ে দেখি, সেখানে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নাই। এটা যখন থাকবে না, তখন আমরা আসলে এই বর্জ্য আলাদা করা নিয়ে জটিলতার মুখোমুখি হই। স্থানীয় সরকারকে ইপিআর নির্দেশিকার বিষয়ে অবহিত করা দরকার, যাতে তাদের সঙ্গে আমাদের কাজ করতে সুবিধা হয়।’
প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের হেড অব সাসটেইনেবিলিটি সুমাইয়া টি আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অনানুষ্ঠানিক খাতের ভূমিকা প্রধান। তাদের আইনি বা প্রশাসনিক ভয় থেকে মুক্ত রেখে একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে এবং নীতি নির্ধারণে তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি।
দ্রুত নগরায়ণে বাড়ছে প্লাস্টিক বর্জ্য
ওয়াটারএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর আজমান আহমদ চৌধুরী বলেন, দ্রুত নগরায়ণের ফলে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ছে। ভারী বৃষ্টির সময় এসব বর্জ্য শহরের জলাবদ্ধতা তীব্র করে তুলছে। তবে এ উদ্যোগের সুফল পেতে হলে শুধু বড় শহরগুলোতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, ইপিআর বাস্তবায়ন করতে হবে তৃণমূল পর্যায়েও। স্থানীয় সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে (এনজিও) কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ দিতে হবে।
বাংলাদেশে সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের গভর্ন্যান্স ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার শিরিন লিরা বলেন, ‘আমাদের সুইস ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন থেকে একটা জিনিস আমরা সব সময় বলি যে অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এটা আসলে শুধু যারা বেসরকারি খাতে উৎপাদন করছে, তাদেরকে দিলেও হবে না, সরকারকে দিলেও হবে না। এখানে সবার দায়িত্ব রয়েছে। আচরণগত দিক থেকে সাধারণ ভোক্তারও দায়িত্ব রয়েছে।’ অনানুষ্ঠানিক খাতে বর্জ্য সংগ্রহে নিয়োজিত শ্রমিকদের একটা কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক তানভীর আহমেদ, ব্র্যাকের ক্লাইমেট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইনোভেশন অ্যান্ড ডিজাস্টার রিস্ক ম্যানেজমেন্টের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার রাজু বসাক, বাংলাদেশ পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খাদেম মাহমুদ ইউসুফ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার।
বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন ওয়াটারএইড বাংলাদেশের গো–ফর–ইমপ্যাক্ট টিম লিডার সাইফ মনজুর–আল–ইসলাম, ওয়াটারএইড বাংলাদেশের পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স স্পেশালিস্ট রঞ্জন কুমার ঘোষ, হেলভিটাস বাংলাদেশের ভয়েস, ইনক্লুশন অ্যান্ড কোহেশনের হেড অব প্রোগ্রাম শাহরিয়ার মান্নান, ইউএনডিপির প্লাস্টিক সার্কুলারিটি পোর্টফোলিও প্রজেক্ট ম্যানেজার সৈয়দ মনজুরুল হক, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) নির্বাহী পরিচালক সিদ্দীকা সুলতানা ও দ্য স্কেইট লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী মো. নাহিদ আলম।
বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।