উপকূলীয় অঞ্চলে সমন্বিত ম্যানগ্রোভ–ভিত্তিক মৎস্য চাষ নিয়ে গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়া ও প্রথম আলো।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রা বেড়ে চিংড়ির উৎপাদন কমছে। জলবায়ুর সে ক্ষতিকর প্রভাব কাটিয়ে উঠতে বিকল্প হতে পারে ম্যানগ্রোভভিত্তিক চিংড়ি চাষ। উপকূলীয় অঞ্চলে এ পদ্ধতিতে চিংড়ির চাষ হলে চিংড়ির ওপর তাপমাত্রার প্রভাব পড়ে কম। উৎপাদনও বৃদ্ধি পায়। প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বনের বাইরে এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারি নীতি কাঠামোর পাশাপাশি সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন।
গতকাল বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চলে সমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন জলবায়ু পরিবর্তন, বন ও মৎস্য বিশেষজ্ঞরা। এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়া ও প্রথম আলো।
গোলটেবিলের শুরুতে ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষের ওপর একটি গবেষণা উপস্থাপন করেন এক্সেমপ্লেরি কনসাল্টিংয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নুরুল আজম।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রা বাড়ছে, যার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে চিংড়ি চাষে। সনাতন পদ্ধতির চাষে চিংড়ির মৃত্যুহার ৬৪ শতাংশ। ম্যানগ্রোভভিত্তিক চাষে সেটা কমিয়ে ৫০ শতাংশে নিয়ে আসা যায়। খুলনার পাইকগাছায় একটি পরীক্ষায় এ ফলাফল উঠে এসেছে। পরীক্ষামূলকভাবে ১০০ হেক্টর জমিতে এ পদ্ধতির প্রয়োগ করা হয়। আগামী ২০ বছরে ২৯ হাজার হেক্টর জমিতে ম্যানগ্রোভভিত্তিক পদ্ধতিতে মৎস্য চাষ করার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে গবেষণায়।
ম্যানগ্রোভভিত্তিক এ পদ্ধতি সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বনের বাইরে করার পরামর্শ দিয়ে বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, চিংড়িঘের যেখানে আছে, সেখানে কী পরিমাণ মাটির বাঁধ আছে, আগে সেটার একটা প্রকৃত চিত্র (ম্যাপিং) করতে হবে। এ চিত্র পাওয়ার পর কী পরিমাণ ম্যানগ্রোভ চারা রোপণ করা যাবে, সেটা ঠিক করতে হবে।
প্রধান বন সংরক্ষক বলেন, চিংড়িঘেরে এ ধরনের ম্যানগ্রোভ চারা রোপণ একদিকে মাছকে ছায়া দেবে, গাছের পাতা পানিতে পড়ে প্লাংকটনের জোগান বাড়াবে। সব মিলিয়ে চিংড়ির জন্য একটা অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে। যেহেতু এখানে কীটনাশক, ফিড ও সারের ব্যবহার হবে কম, ফলে এখানে অর্গানিক চিংড়ির উৎপাদন বাড়বে। তাতে হাই ভ্যালু প্রোডাক্ট (উচ্চ মূল্যের) হিসেবে চিংড়ির রপ্তানি আয় বাড়ানোর সুযোগ আছে। প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভকে রক্ষা করেই এটা করতে হবে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক নাজমুল আহসান বলেন, ‘আমাদের গবেষণায় আমরা দেখেছি ম্যানগ্রোভভিত্তিক এ পদ্ধতি ভালো ফল দেয়। এখন মাঠপর্যায়ে চাষিদের আগ্রহী করতে হলে এটার দৃশ্যমান ফলাফল দেখাতে হবে।’
আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক মো. লতিফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের উপকূলে যেখানে চিংড়ির চাষ হয়, সেখানে সবগুলো জমি ম্যানগ্রোভ চাষের উপযোগী কি না, সেটা আগে দেখতে হবে। এর পাশাপাশি আমাদের চিংড়ির জোনিং (চিংড়ির জন্য নির্ধারিত অঞ্চল) করতে হবে।’
চিংড়ি একসময় রপ্তানি পণ্যের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল জানিয়ে মো. লতিফুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে রপ্তানিতে চিংড়ি এখন চতুর্থ বা পঞ্চম অবস্থানে। চিংড়িকে রপ্তানির তালিকায় এক নম্বরে নিয়ে উৎপাদন বাড়াতে আমাদের আধুনিক ও উচ্চ প্রযুক্তিতে কাজে লাগাতে হবে। এ বিষয়ে মৎস্য, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, বন অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সকল অংশীজনদের সঙ্গে নিয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।’
ম্যানগ্রোভভিত্তিক চিংড়ি চাষ করে সফল হয়েছেন, এ রকম দুজন উদ্যোক্তা খুলনার পাইকগাছা উপজেলার লতিকা বালা বৈদ্য ও তুষার কান্তি মন্ডল নিজেদের সফলতার গল্প তুলে ধরেন গোলটেবিল বৈঠকে।
সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়া, কান্ট্রি ম্যানেজার (বাংলাদেশ) সেলিম রেজা হাসান বলেন, ‘ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষের মাধ্যমে আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে একদিকে রেজিলিয়েন্ট লাইভলিহুড (অভিঘাত–সহনশীল জীবিকা)। একই সঙ্গে প্রকৃতিকে ফিরিয়ে আনা। এটার ইমিডিয়েট বেনিফিটটা ধীরে আসে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে লাভ বেশি।’
ম্যানগ্রোভভিত্তিক চাষের মডেলটা অবলম্বন করলে সুন্দরবনের ওপর চাপটাও কমবে বলে মনে করেন তিনি।
গোলটেবিলে এইচএসবিসি ব্যাংক, বাংলাদেশের হেড অব সাসটেইনেবিলিটি সৈয়দা আফজালুন নেসা বলেন, ‘আমরা প্রথম ম্যানগ্রোভ বনায়নে অর্থায়ন করি মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে। যেহেতু ম্যানগ্রোভ অন্যান্য প্রজাতির গাছের চেয়ে চার গুণ বেশি কার্বন শোষণ করে, আমাদের বৈশ্বিক কৌশল ছিল আমাদের মানবকল্যাণ তহবিল থেকে প্রকৃতি সংরক্ষণ ও ম্যানগ্রোভ বনায়নে তহবিল দেব। ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষে আমরা সলিডারিডাডের সঙ্গে এ লক্ষ্যে কাজ করছি।’
মৎস্য অধিদপ্তরের ব্লু ইকোনমি সেলের পরিচালক মো. সাজদার রহমান বলেন, ‘ম্যানগ্রোভ গাছ থাকলে চিংড়ির জন্য ছায়া ও প্রাকৃতিক খাদ্যের একটা আধার তৈরি হয়। আমাদের উপকূলের একেক এলাকার একেক ধরন। কোন এলাকায় ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ উপযুক্ত হবে এবং সর্বোচ্চ সুফল আসবে, সেটা নির্ধারণে একটা সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।’
নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের সিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজার (কৃষি) এ কে ওসমান হারুনী বলেন, ‘গাছ থাকলে মাছ ছায়ায় আশ্রয় নেয়, তাপ কমে। এটা ভালো দিক। তবে আমাদের উন্নত আধুনিক প্রযুক্তিতে যেতে হবে, যেটা মাছের উৎপাদন বাড়িয়ে ব্যবসাকে যেমন লাভজনক করবে, একই সঙ্গে প্রকৃতির জন্যও সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।’
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপের সিনিয়র ডিরেক্টর ও হেড অব স্ট্রাটেজি প্ল্যান অ্যান্ড ক্লাইমেট কাজী এমদাদুল হক বলেন, টেকসই জীবিকা ও ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার এ দুটোর মধ্যে একটা সমন্বয় করতে হবে।
প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সারোয়ার আলম দীপু ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষের উদ্যোগে প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানের (নেচার–বেইজড সল্যুশন) সমন্বয় করার তাগিদ দেন।
ব্র্যাকের জলবায়ু পরিবর্তন ও মৎস্য খাতের বিশেষজ্ঞ কানিজ ফাতেমা–তুজ–জোহরা উপকূলে অঞ্চলভিত্তিক লবণাক্ততার মাত্রা নির্ধারণ করার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
অ্যাকুয়াকালচার ও ভ্যালু চেইন এক্সপার্ট মইন উদ্দিন আহমদ নতুন যে চর জেগে উঠছে, সেখানে ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান।
গোলটেবিল বৈঠক সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।