গোলটেবিল বৈঠকে (বাঁ থেকে) জাহেদা ফিজ্জা কবীর, মোহাম্মদ আবু ইউছুফ, জিয়াউদ্দিন হায়দার, হালিদা হানুম আখতার ও সাইফুন নাহার। গতকাল প্রথম আলো কার্যালয়ে
গোলটেবিল বৈঠকে (বাঁ থেকে) জাহেদা ফিজ্জা কবীর, মোহাম্মদ আবু ইউছুফ, জিয়াউদ্দিন হায়দার, হালিদা হানুম আখতার ও সাইফুন নাহার। গতকাল প্রথম আলো কার্যালয়ে

গোলটেবিল বৈঠক

মানসিক রোগীদের চিকিৎসার পর পরিবার-সমাজে পুনর্বাসন জরুরি

মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারি-বেসরকারি অংশীজনদের ভূমিকা নিয়ে গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজক সাজেদা ফাউন্ডেশন ও প্রথম আলো

দেশে প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষ গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্ত। তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যয় বহন করার মতো আর্থিক সামর্থ্য ও সচেতনতা বেশির ভাগ পরিবারের নেই। কুসংস্কার ও সমাজের মানুষের অসহযোগিতার কারণে এসব পরিবার ও রোগী সামাজিক বৈষম্যেরও শিকার হন। অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা শেষে পরিবার ও সমাজে ফিরে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনকালীন তাঁরা কমিউনিটিভিত্তিক প্রয়োজনীয় পরিচর্যা ও সহায়তা পান না।

গতকাল বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে সাজেদা ফাউন্ডেশন ও প্রথম আলো আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ কথা বলেন। দীর্ঘমেয়াদি মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন ও স্বাভাবিক সামাজিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে কমিউনিটিভিত্তিক সহায়ক আবাসনসেবা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তাঁরা।

‘মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারি-বেসরকারি অংশীজনদের ভূমিকা, চ্যালেঞ্জ নিরসনে করণীয়’ শিরোনামে গোলটেবিল বৈঠকে ২০১৯ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, দেশের ৫ কোটি ৪০ লাখ মানুষ মানসিক সমস্যায় ভুগছে। এর মধ্যে প্রায় ১৯ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এবং ৭ থেকে ১৭ বছরের প্রায় ১৩ শতাংশ শিশু–কিশোর। বিপুলসংখ্যক মানুষ মানসিক রোগে ভুগলেও তাদের ৯২ শতাংশই চিকিৎসার বাইরে রয়ে যাচ্ছে। মাত্র দুটি পূর্ণাঙ্গ মানসিক হাসপাতাল রয়েছে। 

অনুষ্ঠানে সাজেদা ফাউন্ডেশনের আবাসনসেবা ‘প্রশান্তি’ মডেল প্রকল্প তুলে ধরে দেখানো হয়, কীভাবে একটি এলাকায় মানসিক সমস্যায় ভোগা মানুষদের আবাসিকভাবে সহায়তা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সুস্থ করে পুনর্বাসনের করা হচ্ছে। 

 বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী মর্যাদা) এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, মানসিক অসুস্থতার বিষয়টি শুরুতে শনাক্ত করার মতো সচেতনতা তৈরি হতে হবে। গর্ভাবস্থায় একজন মা যদি মানসিকভাবে সুস্থ না থাকেন, তাহলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে শিশুর ওপরও। দেশের স্বাস্থ্যসেবা অতিরিক্ত কেন্দ্রভিত্তিক। মানসিক সেবাকে এলাকাভিত্তিক ছড়িয়ে দিয়ে প্রতিরোধে গুরুত্ব দেওয়া হবে। শহরের প্রতিটি ওয়ার্ড ও গ্রামের ইউনিয়নে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কর্নার গড়ে তোলা হবে। 

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ আবু ইউছুফ বলেন, মানসিক অসুস্থতায় ভোগা মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে। অনেক পরিবার বাইরের লোকের সামনে এ ধরনের রোগীকে লুকিয়ে রাখে। মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারি–বেসরকারি অংশীদারির ভিত্তিতে কাজ করা দরকার। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যে অবকাঠামো রয়েছে, তার মধ্যে কোনো বেসরকারি সংস্থা পরিকল্পনা নিয়ে এলে মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে কাজ করবে। 

নারীরা বেশি ভুক্তভোগী হন

চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ হালিদা হানুম আখতার বলেন, সরকারি–বেসরকারি অংশীজনের মধ্যে সমন্বিত কাজের ক্ষেত্রে সরকারকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হলে বিপুল অর্থ ব্যয় করে। অথচ মানসিক রোগ, অর্থাৎ মস্তিষ্কের অসুখের জন্য কোনো ব্যয় করতে চায় না। নারীর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ও খরচ করার সামর্থ্য না থাকায় মানসিক রোগীর মধ্যে নারীরা আরও বেশি ভুক্তভোগী হন। 

সাজেদা ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাহেদা ফিজ্জা কবীর বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় পেশাদারত্বের সঙ্গে সফল হতে হলে ধাপে ধাপে সেবাগ্রহীতাকে কতটা সময় সেবা দেওয়া হচ্ছে, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। প্যারা কাউন্সিলর হিসেবে পেশাদার দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে এলাকাভিত্তিক মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানোর জন্য। প্রশান্তির মতো আবাসিক মডেলের অভিজ্ঞতাকে আরও বিস্তৃত করা যেতে পারে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক সাইফুন নাহার বলেন, এই হাসপাতালে প্রতিদিন বহির্বিভাগে গড়ে ৫০০ রোগী আসেন মানসিক সমস্যা নিয়ে। এখন মাদকাসক্তি ও আচরণগত সমস্যার রোগীও বেড়েছে। রোগীকে সহায়তা দেওয়ার জন্য বেশ কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, অথচ সেগুলোর জন্য কোনো কারিগরি সহায়তা ও জনবল নেই। জাতীয় পর্যায়ের একটি হাসপাতালে সমস্যাগুলো শনাক্ত করে ব্যবস্থা না নিলে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্ভব নয়।

‘মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারি-বেসরকারি অংশীজনদের ভূমিকা : চ্যালেঞ্জ নিরসনে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহনকারীরা

পাবনা মানসিক হাসপাতালের পরিচালক শাফকাত ওয়াহিদ বলেন, ডায়াবেটিস হাসপাতালের মডেলের মতো স্থানীয় পর্যায়ে সব সরকারি হাসপাতালে মানসিক রোগের চিকিৎসা ও জরুরি কিছু ওষুধের ব্যবস্থা করতে হবে। একজন রোগী চিকিৎসা নিয়ে ফেরার পর তাঁর পরিবার ও প্রতিবেশীদের অসহযোগিতামূলক আচরণ রোগীকে সুস্থ হতে বাধাগ্রস্ত করে। এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি প্রয়োজন। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় পরিবার ও স্কুলকেও গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবারে বাবা–মা যেন শিশুকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেন। স্কুলে শিক্ষাভিত্তিক সবকিছু শিশুদের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে খেলাধুলা ও অন্যান্য কার্যকলাপের মধ্যে শিশুর সক্ষমতা তৈরির চর্চা করতে হবে। 

আরও আলোচনা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের জাতীয় পেশাদার কর্মকর্তা (মানসিক স্বাস্থ্য) হাসিনা মমতাজ মানসিক সেবাপ্রাপ্তি সহজলভ্য করতে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।

সিটি ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি সিটি ব্যাংক এনএর হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স রুমানা আহমেদ বলেন, সরকারি–বেসরকারি অর্থ সহায়তা মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় পরিবর্তন আনতে পারবে। কারণ, অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের অবহেলায় মানসিক রোগীরা গৃহহীন হয়ে পড়েন।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাজেদা ফাউন্ডেশনের কারিগরি পরামর্শক রুবিনা জাহান। বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) মোহা. কামরুজ্জামান, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টসের (বিএপি) মহাসচিব অধ্যাপক মো. নিজামউদ্দিন, ইনোভেশন ফর ওয়েলবিয়িং ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনিরা রহমান, সুইডিশ ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সির (সিডা) জ্যেষ্ঠ স্বাস্থ্য উপদেষ্টা জহিরুল ইসলাম ও সাজেদা ফাউন্ডেশনের কর্মসূচি পরিচালক তামান্না ফেরদৌস। 

সাজেদা ফাউন্ডেশনের প্রশান্তি প্রকল্পের সেবাপ্রাপ্ত হিসেবে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন মানিকগঞ্জের রূপা আক্তার, হবিগঞ্জের মো. সাকিব ও প্রকল্পের কর্মী (ব্যক্তিগত সহকারী) কামরুন্নাহার। রূপা ও সাকিব জানান, মানসিক অসুস্থতা থেকে মুক্ত হয়ে এখন তাঁরা চাকরি করছেন।

বৈঠক সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।