‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে উত্তরণের পথ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে (বাঁ থেকে) হাসিবুর রহমান, ফারাহ আনজুম, শফিকুল আলম, এম শামসুল আলম, খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, মোস্তফা আল মাহমুদ, নেওয়াজুল মাওলা ও তানজিনা দিলশাদ। গতকাল প্রথম আলো কার্যালয়ে
‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে উত্তরণের পথ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে (বাঁ থেকে) হাসিবুর রহমান, ফারাহ আনজুম, শফিকুল আলম, এম শামসুল আলম, খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, মোস্তফা আল মাহমুদ, নেওয়াজুল মাওলা ও তানজিনা দিলশাদ। গতকাল প্রথম আলো কার্যালয়ে

নবায়নযোগ্য জ্বালানির অগ্রাধিকার জরুরি 

‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে উত্তরণের পথ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে প্রথম আলো

দেশে গত এক যুগে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বেড়েছে মাত্র ২ শতাংশ। বিদ্যমান জ্বালানির চাহিদা পূরণে গ্যাস, কয়লা, ফার্নেসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি এখনো প্রধান উৎস। গতকাল রোববার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে উত্তরণের পথ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকেরা বলেছেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিনির্ভরতার কারণেই নীতিনির্ধারকদের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অনীহা রয়ে গেছে। আগামীর সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি বলেও মনে করছেন তাঁরা। 

দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে বাধা এবং তা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে এই বৈঠকের আয়োজন করে প্রথম আলো। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, জ্বালানিবিশেষজ্ঞ, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারে বিভিন্ন বাধার কথা বৈঠকে তুলে ধরেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর কল্পনা নয়, বরং একটি বাস্তবসম্মত প্রযুক্তি। তবে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিনির্ভরতা এর প্রসারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং আমলাতন্ত্রের ভেতরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারের ক্ষেত্রে একধরনের অনীহা কাজ করে বলে মন্তব্য করেন সিপিডির এই গবেষণা পরিচালক। এর পেছনে শক্তিশালী জীবাশ্ম জ্বালানি ‘নেক্সাস’ (আঁতাত) রয়েছে উল্লেখ করে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা এর সঙ্গে জড়িত। এই নেক্সাস এতটাই শক্তিশালী যে তারা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নিয়োগ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নীতি পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। 

দেশে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ১২ টাকার ওপরে। পাকিস্তান বা ভারতে এটি অনেক কম। উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্য দিয়ে আমদানির বাজার করে দেওয়া হয়েছে।
এম শামসুল আলম, জ্বালানি উপদেষ্টা, ক্যাব 

বৈঠকে দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের চরম অব্যবস্থাপনা, লুণ্ঠন এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরেন ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম। তিনি বলেন, দেশে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় পড়ছে ১২ টাকার ওপরে। যেখানে পাকিস্তান বা ভারতে এটি অনেক কম। তাঁর মতে, দেশে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্য দিয়ে আমদানির বাজার তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। 

এম শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুতের প্রকৃত উৎপাদন খরচ কত হওয়া উচিত, তা নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা দরকার। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে ‘এনার্জি জাস্টিস’ নিশ্চিত করে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করার আহ্বান জানান তিনি। 

রাজনৈতিক অর্থনীতি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে বাধা

বৈঠকে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার চেয়ে বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দাম বেশি হওয়ার কারণ নিয়ে আলোচনা হয়। ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম মনে করেন, এর জন্য ‘সোলার ইরেডিয়েশন’ (নির্দিষ্ট জায়গায় সূর্যের আলো থেকে শক্তি পাওয়া) অনেকাংশে দায়ী। তিনি বলেন, দেশে সোলার ইরেডিয়েশন চার ঘণ্টা পাওয়াও বেশ কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে তা ৩ দশমিক ৭ থেকে ৩ দশমিক ৯ ঘণ্টা পর্যন্ত দেখা যায়। যেখানে পাকিস্তানে সাত ঘণ্টা পর্যন্ত সোলার ইরেডিয়েশন পাওয়া যায়।

মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই)

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং খরচ কমাতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার কোনো বিকল্প নেই বলেও মনে করেন আইইইএফএর এই বিশেষজ্ঞ।

বৈঠকে বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, আমদানিনির্ভর জ্বালানির দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি আশীর্বাদ। তবে সেটা ব্যবহার করা যাচ্ছে না এর সঙ্গে জড়িত রাজনৈতিক অর্থনীতির কারণে। এ জায়গায় পরিবর্তন আনতে না পারলে সমাধান হবে না। তিনি বলেন, জ্বালানি-সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প নেই। তাই এ বিষয়ে কঠোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। 

মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের (এমআরডিআই) নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান বলেন, জ্বালানি নিয়ে যে পরিমাণ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হওয়ার কথা, তা হচ্ছে না। এ জন্য গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে গণমাধ্যমের যৌথ উদ্যোগের পরামর্শ দেন তিনি।

গ্লোবাল স্ট্র্যাটিজিক কমিউনিকেশনস কাউন্সিলের (জিএসসিসি) বাংলাদেশ লিড ফারাহ আনজুম বলেন, গত পাঁচ বছরের তথ্য বলছে, দেশে জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতি আসক্তি অনেক বেশি। অন্তর্বর্তী সরকার একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানিনীতি করেছে। যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু ১০০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা কবে করা হবে। সেই পথনকশা কোথায়?

নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর কল্পনা নয়, বরং একটি বাস্তবসম্মত প্রযুক্তি। তবে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিনির্ভরতা এর প্রসারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। 
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, গবেষণা পরিচালক, সিপিডি 

বৈঠকে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিনিয়োগ কৌশল ও চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেন ঢাকার ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রোগ্রাম ম্যানেজার তানজিনা দিলশাদ। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং নীতিমালার অসামঞ্জস্যকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেন তিনি। 

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং নীতিমালার অসামঞ্জস্য দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অগ্রগতিকে ব্যাহত করছে বলে বৈঠকে মন্তব্য করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) কো-অর্ডিনেটর নেওয়াজুল মওলা। তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারের জন্য গঠিত টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) একটি অক্ষম প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সব সময় আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল থাকে। স্বাধীনভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা এই প্রতিষ্ঠানের নেই। এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির হার ভবিষ্যতে কমে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা করেন তিনি।

গোলটেবিল বৈঠকে ধারণাপত্র পাঠ করেন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মো. মহিউদ্দিন। ধারণাপত্রে বলা হয়, জীবাশ্ম জ্বালানি (গ্যাস ৪৩ শতাংশ, কয়লা ২২ শতাংশ, ফার্নেস ১৯ শতাংশ) এখনো দেশের জ্বালানির প্রধান উৎস। এমন পরিস্থিতির থেকে উত্তরণে শুল্ককাঠামো কমানো, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে কর অব্যাহতির কার্যকর প্রয়োগ প্রয়োজন। শুধু কাগজে-কলমে লক্ষ্যমাত্রা না বাড়িয়ে টেকসই নীতিসহায়তার মাধ্যমে জীবাশ্ম জ্বালানির নির্ভরতা কমিয়ে সবুজ জ্বালানির দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুপারিশও ধারণাপত্রে করা হয়েছে। 

বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।