ক্যাব আয়োজিত ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০)’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয় ৬ জুলাই ২০২৬ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ, এমপি
মন্ত্রী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়
আমরা এমন একটি সময়ে দায়িত্ব নিয়েছি, যখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। বিপুল বকেয়া, জ্বালানি আমদানির ব্যয় এবং অতীতের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে সরকারকে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার অন্যতম কার্যকর উপায় হিসেবে আমরা জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০) প্রণয়ন করেছি।
এটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নিয়ে খসড়া আরও পরিমার্জন করে মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।
আমাদের লক্ষ্য আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমানো। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে পারলে জ্বালানি আমদানি কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং সেই সাশ্রয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপও ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। সে কারণে কৌশলপত্রে রুফটপ সৌরবিদ্যুৎকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আমরা চাই, বেসরকারি খাত এই খাতে বিনিয়োগ করুক।
বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করতে কর-সুবিধাসহ বিভিন্ন নীতিগত সহায়তার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য, আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে আমরা কৃষিজমি রক্ষার বিষয়েও অঙ্গীকারবদ্ধ। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী ফসলি জমি নষ্ট করে কোনো প্রকল্প নেওয়া হবে না; বরং পতিত জমি, সরকারি সংস্থার অব্যবহৃত জমি এবং উপযোগী অন্যান্য স্থানকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে ভাসমান সৌরবিদ্যুৎসহ নতুন সম্ভাবনাগুলোও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। আমরা অংশীজনদের পরামর্শকে গুরুত্ব দিচ্ছি এবং চূড়ান্ত কৌশলপত্রে সেসব সুপারিশ যথাসম্ভব অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করব।
এম শামসুল আলম
জ্বালানি উপদেষ্টা, কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)
জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্রকে শুধু উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা হিসেবে দেখলে হবে না; এটি জ্বালানি খাতের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের একটি সুযোগ।
বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সংকট মূলত প্রযুক্তিগত নয়; বরং নীতি ও সুশাসনের সংকট। তাই শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে সমস্যার সমাধান হবে না; বরং এমন একটি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সর্বনিম্ন ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, জবাবদিহি ও ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় বড় প্রকল্পের পাশাপাশি বিকেন্দ্রীভূত সৌরবিদ্যুৎ–ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। হাজারো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে সম্পৃক্ত করা গেলে উৎপাদন যেমন বাড়বে, তেমনি কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে।
সরকারি জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্দেশ্য মুনাফা অর্জন নয়, জনসেবা নিশ্চিত করা হওয়া উচিত। বিদ্যুতের ট্যারিফ প্রকৃত উৎপাদন ব্যয়ের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।
একই সঙ্গে জ্বালানিকে নাগরিকের আইনি অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন, যাতে ভোক্তা প্রয়োজন হলে আদালতের আশ্রয় নিতে পারেন এবং ট্যারিফসহ বিভিন্ন বিষয়ে কার্যকরভাবে মতামত দেওয়ার সুযোগ পান।
জ্বালানি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং ভোক্তার অধিকার—এই চারটি বিষয়কে কৌশলপত্র বাস্তবায়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে সরকারের জ্বালানি বিভাগ প্রণয়ন করেছে ২০২৬–২০৩০ মেয়াদের জন্য ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র’র খসড়া, অন্যদিকে ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় এবং জ্বালানি সুবিচার নিশ্চিতে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) উপস্থাপন করেছে এক বিকল্প প্রস্তাব। এই দুই প্রস্তাবের একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো।
নীতির দর্শন
সরকারের প্রস্তাব: জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু অঙ্গীকার এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো।
ক্যাবের প্রস্তাব: নীতির মূল ভিত্তি হতে হবে জ্বালানি ন্যায়বিচার, সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ ও ভোক্তার অধিকার। শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, জনগণের ন্যায্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
বিদ্যুৎ সাশ্রয় লক্ষ্য
সরকারের প্রস্তাব: দক্ষ যন্ত্রপাতি ব্যবহার ও জ্বালানিদক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবহার ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো।
ক্যাবের প্রস্তাব: সাশ্রয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করলে বিদ্যুতের চাহিদার পূর্বাভাসেও সেই সাশ্রয়ের প্রতিফলন থাকতে হবে। অন্যথায় পরিকল্পনায় অসংগতি তৈরি হবে।
বিদ্যুৎ চাহিদার বেজলাইন ও প্রজেকশন
সরকারের প্রস্তাব: ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ–চাহিদা বিবেচনায় উৎপাদন সক্ষমতা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ।
ক্যাবের প্রস্তাব: চাহিদার পূর্বাভাস বাস্তবসম্মত হতে হবে। অতিরঞ্জিত চাহিদা দেখিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সুযোগ রাখা যাবে না।
প্রযুক্তি মিক্স ও সক্ষমতা প্রজেকশন
সরকারের প্রস্তাব: সৌর, বায়ু, বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন প্রযুক্তির সমন্বয়ে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো।
ক্যাবের প্রস্তাব: সব প্রযুক্তির অর্থনৈতিক ও কারিগরি সক্ষমতা যাচাই করে সর্বনিম্ন ব্যয়ের ভিত্তিতে পরিকল্পনা নিতে হবে।
সোলার চার্জিং কৌশল
সরকারের প্রস্তাব: রুফটপ ও বিতরণভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ এবং নেট মিটারিং উৎসাহিত করা।
ক্যাবের প্রস্তাব: নেট মিটারিংয়ের অনুমোদন দ্রুত দিতে হবে। মিটারের সংকট ও প্রশাসনিক জটিলতা দূর করতে হবে।
বিইআরসি ও ট্যারিফ শাসন
সরকারের প্রস্তাব: নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মাধ্যমে ট্যারিফ নির্ধারণ ও খাত পরিচালনা।
ক্যাবের প্রস্তাব: বিইআরসিকে স্বাধীন করতে হবে। কমিশন নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠন এবং ভোক্তার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
আইনি সংস্কারের গভীরতা
সরকারের প্রস্তাব: প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিমালা হালনাগাদ করা।
ক্যাবের প্রস্তাব: বিশেষ আইনের অপব্যবহার বন্ধ করে প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে এবং জ্বালানি খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
অভিযোগ নিষ্পত্তি ও আদালতে যাওয়ার অধিকার
সরকারের প্রস্তাব: প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।
ক্যাবের প্রস্তাব: ভোক্তার আদালতে যাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং জ্বালানিসেবাকে আইনি অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
সিদ্ধান্ত গ্রহণে নাগরিক/ভোক্তা প্রতিনিধিত্ব
সরকারের প্রস্তাব: অংশীজনের মতামত গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।
ক্যাবের প্রস্তাব: নীতিমালা তৈরির আগে যথেষ্ট সময় দিয়ে প্রকৃত জনপরামর্শ নিশ্চিত করতে হবে। দু–তিন কর্মদিবস মতামতের জন্য যথেষ্ট নয়।
রুফটপ সোলার বাস্তবায়নপদ্ধতি
সরকারের প্রস্তাব: রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ।
ক্যাবের প্রস্তাব: কর অব্যাহতি, সহজ লাইসেন্স, দ্রুত অনুমোদন ও বেসরকারি বিনিয়োগবান্ধব ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
ভূমিভিত্তিক/ইউটিলিটি-স্কেল সোলার
সরকারের প্রস্তাব: বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন।
ক্যাবের প্রস্তাব: কৃষিজমি নয়; অনাবাদি জমি, চর, জলাশয় ও অব্যবহৃত স্থান অগ্রাধিকার পাবে।
অর্থায়নকাঠামো
সরকারের প্রস্তাব: দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ।
ক্যাবের প্রস্তাব: বিদ্যুৎ বন্ড, সহজ অর্থায়ন ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রণোদনা ও নীতি সহায়তা
সরকারের প্রস্তাব: কর ও নীতিগত সহায়তা প্রদান।
ক্যাবের প্রস্তাব: সব বিনিয়োগকারীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে এবং শর্তহীন প্রণোদনা বিবেচনা করতে হবে।
লাইসেন্সিং ও প্রতিযোগিতা
সরকারের প্রস্তাব: লাইসেন্সিংয়ের মাধ্যমে প্রকল্প অনুমোদন।
ক্যাবের প্রস্তাব: লাইসেন্স সহজ করতে হবে এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করতে হবে।
কার্বন ক্রেডিট ও আয়ের ব্যবহার
সরকারের প্রস্তাব: কার্বন বাজারের সুযোগ কাজে লাগানো।
ক্যাবের প্রস্তাব: কার্বন ক্রেডিটের আয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে ব্যয় করতে হবে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
জাস্ট ট্রানজিশনের কাঠামো
সরকারের প্রস্তাব: জ্বালানি রূপান্তরকে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নেওয়া।
ক্যাবের প্রস্তাব: কয়লা ও জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অঞ্চল ও শ্রমিকদের জন্য ন্যায়সংগত রূপান্তর পরিকল্পনা থাকতে হবে।
জমি, কৃষি ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা
সরকারের প্রস্তাব: পরিবেশ বিবেচনায় প্রকল্প বাস্তবায়ন।
ক্যাবের প্রস্তাব: কৃষিজমি রক্ষা করতে হবে। জমি ব্যবহারের আগে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে।
কৃষি, সেচ ও গ্রামীণ অর্থনীতি
সরকারের প্রস্তাব: কৃষিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি।
ক্যাবের প্রস্তাব: গ্রামভিত্তিক বিকেন্দ্রীভূত সৌরবিদ্যুৎ কৃষি, সেচ ও গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য অগ্রাধিকার পাবে।
ক্লিন কুকিং ও ওয়াস্ট টু এনার্জি
সরকারের প্রস্তাব: পরিচ্ছন্ন রান্না ও বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের উদ্যোগ।
ক্যাবের প্রস্তাব: এসব উদ্যোগে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, স্থানীয় সরকার ও বেসরকারি বিনিয়োগ যুক্ত করতে হবে।
শ্রম, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী
সরকারের প্রস্তাব: অন্তর্ভুক্তিমূলক জ্বালানি উন্নয়ন।
ক্যাবের প্রস্তাব: নারী, তরুণ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে হবে।
গ্রিড মডার্নাইজেশন ও বিইএসএস
সরকারের প্রস্তাব: গ্রিড আধুনিকায়ন ও বিদ্যুৎ সংরক্ষণ প্রযুক্তি উন্নয়ন।
ক্যাবের প্রস্তাব: ব্যাটারি স্টোরেজ, স্মার্ট গ্রিড ও বিতরণব্যবস্থা দ্রুত আধুনিক করতে হবে।
মনিটরিং কাঠামো
সরকারের প্রস্তাব: বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
ক্যাবের প্রস্তাব: স্বাধীন মনিটরিং, নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন ও জনসমক্ষে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
গবেষণা, উদ্ভাবন ও পাইলটিং
সরকারের প্রস্তাব: গবেষণা ও নতুন প্রযুক্তি উৎসাহিত করা।
ক্যাবের প্রস্তাব: নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা চিহ্নিত করতে ম্যাপিং, গবেষণা ও পাইলট প্রকল্পে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
মান নিয়ন্ত্রণ ও যন্ত্রপাতির দায়বদ্ধতা
সরকারের প্রস্তাব: মানসম্মত প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব।
ক্যাবের প্রস্তাব: সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারিসহ সব যন্ত্রপাতির মান নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী ব্যবস্থা, পরীক্ষাগার ও প্রস্তুতকারকের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।
অ্যাডভোকেট হুমায়ূন কবীর ভূঁইয়া
সাধারণ সম্পাদক, কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার যে ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০)’-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে, ক্যাব সে উদ্যোগকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানায়।
আমরা আশা করি, আজকের আলোচনা ও মতবিনিময় সরকারের জন্য একটি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, বাস্তবসম্মত এবং ভোক্তাবান্ধব জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র চূড়ান্ত করতে সহায়ক হবে।
বাংলাদেশের জন্য একটি কার্যকর নবায়নযোগ্য জ্বালানিকৌশল হতে হবে এমন, যা সাশ্রয়ী ও পরিবেশগতভাবে টেকসই হওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগবান্ধব, প্রযুক্তিগতভাবে নির্ভরযোগ্য, আইনগতভাবে জবাবদিহিমূলক এবং ভোক্তার অধিকার সুরক্ষায় দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
মোস্তফা আল মাহমুদ
সভাপতি, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন
জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্রকে আমরা ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছি। নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প নেই। আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকেই যেতে হবে। তবে কৌশলপত্র নিয়ে মতামত দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সময় দেওয়া প্রয়োজন ছিল।
বাজেটে এসআরওর মাধ্যমে আমদানি শুল্ক কমানো হয়েছে, যা ইতিবাচক। তবে এটি সবার জন্য উন্মুক্ত না রেখে শর্তসাপেক্ষ করা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিপুলসংখ্যক প্রকল্প হবে। তাই এসব প্রকল্পের সমন্বয়ের জন্য একটি দক্ষ সমন্বয়কারী দল প্রয়োজন।
নেট মিটারিংয়ের আবেদন নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা দূর করা জরুরি। বর্তমানে অনেক আবেদন ঝুলে থাকায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করা যাচ্ছে না।
অ্যাডভোকেট আরিফ খান
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল
সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে অনুচ্ছেদ ১৫ ও ১৬–তে বর্ণিত রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির আলোকে সবার জন্য জ্বালানিতে ন্যায্য প্রবেশাধিকার সমতাভিত্তিক উন্নয়নের একটি মৌলিক শর্ত। তাই জ্বালানিসংক্রান্ত আইন, নীতি, কৌশলপত্র ও অ্যাডভোকেসিকে সাংবিধানিক অধিকারের কাঠামোয় পুনর্বিন্যাস করা জরুরি। অন্যথায় বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও টেকসই উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় এই ইস্যু প্রয়োজনীয় নীতিগত ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব পাবে না।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্রে ‘অধিকার’ ও ‘সামাজিক উদ্যোগ’—এই দুটি ধারণার সংজ্ঞা ও প্রয়োগ আরও সুস্পষ্ট করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৌশলপত্রটির প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি অবস্থানও পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। যেহেতু কৌশলপত্রটি কোনো আইন নয়, তাই এটি বাস্তবায়নে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে সরকারকে সরাসরি আইনি জবাবদিহির আওতায় আনার সুযোগ সীমিত। এ বাস্তবতায় কৌশলপত্রের মধ্যেই জবাবদিহি, দায় নির্ধারণ এবং প্রতিকারের কাঠামো স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
আলমগীর কবির
পরিবেশ ও উন্নয়নকর্মী; সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)
জ্বালানি খাতে যেসব অনিয়ম ও অপরাধ হয়েছে, সেগুলোর বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আমরা সব সময় দাবি জানিয়েছি, জ্বালানি খাতের অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে না পারলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের সংকট আবার ফিরে আসবে। তাই এ খাতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
বর্তমানে জনগণের অর্থে সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে। কিন্তু কেন এই ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রতিবছর ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিপুল অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে। এই ব্যয় কমানো গেলে জনগণের ওপর আর্থিক চাপও কমবে। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানির অর্থায়নে জনগণকে সম্পৃক্ত করার একটি উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
আবুল কালাম আজাদ
পরিবেশ ও উন্নয়নকর্মী
জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর প্রণয়নপ্রক্রিয়া। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় নীতিমালার খসড়া প্রকাশের পর মতামত দেওয়ার জন্য মাত্র দু-তিন কর্মদিবস সময় দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। কারণ, আরও বেশি মতামত এলে কৌশলপত্রটি আরও সমৃদ্ধ হবে। সরকার নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে অংশীজনের মতামত গ্রহণের একটি যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করবে বলে আশা করি।
জমির বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিজমি ব্যবহারের আগে অবশ্যই যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। তবে কৃষিজমি ব্যবহার না করেও দেশে ৩০–৪০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
সেরাজুল ইসলাম সেরাজ
নির্বাহী পরিচালক, ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ
আমাদের দেশে অনেক ভালো নীতিমালা ও আইন হলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন হয় না। ১৯৯৫ সালের জ্বালানি নীতিমালায় প্রতিবছর চারটি অনুসন্ধান কূপ খননের কথা বলা হলেও কোনো সরকার তা বাস্তবায়ন করেনি। তাই নতুন কৌশলপত্র নিয়েও আমার মূল উদ্বেগ বাস্তবায়ন।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্রে যন্ত্রপাতির মান নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া উচিত। বর্তমানে বিভিন্ন বৈদ্যুতিক পণ্যের গুণগত মান নিয়ে ভোক্তারা সমস্যায় পড়ছেন।
বিদ্যুৎ খাতে অতীতের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও চুক্তি নিয়েও আমাদের প্রশ্ন রয়েছে। বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি, ট্যারিফ নির্ধারণ এবং ক্যাপাসিটি পেমেন্টের ক্ষেত্রে কীভাবে ব্যয় বেড়েছে, সেসব বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নাজিফা তাজনূর
সদস্য, ক্যাব যুব সংসদ; শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬–২০৩০)’ প্রণয়নে জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এটি শুধু প্রযুক্তিনির্ভর কোনো পরিকল্পনা নয়; জ্বালানি অর্থনীতি, ভোক্তা অধিকার, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের একটি রূপরেখা হওয়া উচিত। ভোক্তাকে জ্বালানি খাতের সক্রিয় অংশীজন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ন্যায্যমূল্যে মানসম্মত বিদ্যুৎ পাওয়ার অধিকার, নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ এবং কার্যকর অভিযোগ প্রতিকারের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
বিবিআরসি আইন সংস্কার করে ভোক্তাকে ট্যারিফ পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়ার এবং প্রয়োজনে আদালতে প্রতিকার চাওয়ার অধিকার দিতে হবে। ট্যারিফ নির্ধারণে স্বচ্ছতা, বিদ্যুতের মান নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কৌশলপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০)’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপে উপস্থাপিত সুপারিশ
দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে সরকার কোনো বিনিয়োগে বা ব্যবসায় জড়াবে না, এমনকি পিপিতেও নয় এবং প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত টাস্কফোর্সের এক–তৃতীয়াংশ সদস্য হবেন নাগরিক প্রতিনিধি।
কোনো পাবলিক মানি ক্যাপেক্স সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ হবে না।
মাঠপর্যায়ের মনিটরিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হতে হবে।
অনলাইন মনিটরিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি ও অপারেশনে বিদ্যালয়গুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হতে হবে।
গ্রিডে সরবরাহযোগ্য সব সৌরবিদ্যুৎ বিতরণ ইউটিলিটি কর্তৃক কেনা নিশ্চিত হতে হবে।
প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে দরপত্রের মাধ্যমে বিনিয়োগ হবে এবং দরপত্রে অনধিক ক্রয়মূল্য (বেঞ্চমার্ক প্রাইস) উল্লেখ থাকবে।
গণশুনানির ভিত্তিতে বিইআরসি বেঞ্চমার্ক প্রাইস নির্ধারণ করবে।
সংশ্লিষ্ট আইনের আওতায় জ্বালানি অপরাধের প্রতিকারের জন্য ভোক্তাকে সরাসরি ফৌজদারি আদালতে মামলা করার অধিকার দিতে হবে।
আর্থিক প্রণোদনা বা ছাড় সব বিনিয়োগকারী ও ডেভেলপারের জন্য সমান ও সমতাভিত্তিক হতে হবে।
কোনো বিদেশি লোন বা অনুদানের ওপর সুদ বা সেবামূল্য আরোপ করা যাবে না।
কার্বন ক্রেডিট বাবদ পাওয়া অর্থ ভোক্তার বিনিয়োগ হিসেবে মূল্যহারে সমন্বয় হবে এবং বেঞ্চমার্ক প্রাইস কমাবে। সরকার ও ভোক্তা—উভয়ই লাভবান হবে।
সৌর বা নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের বেঞ্চমার্ক প্রাইস নির্ধারণ প্রস্তাব এসআরইডিএ বা স্রেডা বিদ্যুৎ বিভাগে নয়, বিইআরসিতে দাখিল করবে।
বিইআরসি আইনের ১১ ধারার আওতায় বিইআরসির জবাবদিহি নিশ্চিত হতে হবে।
ব্যয় সাশ্রয়ের লক্ষ্যে যাচাই-বাছাই ব্যতীত গ্রিড উন্নয়ন সীমিত রাখতে হবে।
আলোচ্য কৌশলপত্র বাস্তবায়নে সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ এসআইপিপির অনুরূপ যত দূর সম্ভব ইউটিলিটির বিতরণ নেটওয়ার্কে সীমাবদ্ধ রাখা হলে ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।
ইউটিলিটি স্কেলে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণে ছাদ ব্যবহারের অনুরূপ পতিত/অনুৎপাদনশীল জমি বিনা খরচে ব্যবহারের বিধান থাকতে পারে, অর্থাৎ জমি বাবদ কোনো ব্যয় ট্যারিফে সমন্বয় হবে না।
জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমানো ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে সৌরবিদ্যুৎ তথা নবায়নযোগ্য জ্বালানিশিল্পকে ক্ষুদ্র শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার থাকতে হবে।
বিইআরসির সক্ষমতা উন্নয়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিইআরসি আইন, ২০০৩ ক্যাবের সংস্কার প্রস্তাবের আলোকে বিইআরসি আইন সংস্কার হতে হবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকার ব্যবসায়ী। সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে ইউটিলিটিগণ লাইসেন্সি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ানোর জন্য তারা বিইআরসির নিকট যেকোনো সময় আবেদন করে। কিন্তু দাম পরিবর্তন করার ব্যাপারে কোনো আবেদন করার অধিকার ভোক্তার নেই। জ্বালানি সুবিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ অধিকার ভোক্তাকে দিতে হবে।
কৌশলপত্রে ‘জ্বালানি অধিকার’-এর আইনি অবস্থান উল্লেখ থাকতে হবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগে অপরাধ এবং/অথবা অপচয় হয়ে থাকলে তা ‘খারাপ বিনিয়োগ’ হিসেবে আদায়যোগ্য বলে ঘোষিত হতে হবে।