গোলটেবিল বৈঠকে (বাঁ থেকে) মনা আল আমিনে, মো. রাসেল সাবরিন, নুরুন আখতার, মো. শহীদ উজ জামান, শফিউল আলম ও ফজলে রাব্বী সাদেক আহমেদ। গতকাল রাজধানীর প্রথম আলো কার্যালয়ে
গোলটেবিল বৈঠকে (বাঁ থেকে) মনা আল আমিনে, মো. রাসেল সাবরিন, নুরুন আখতার, 
মো. শহীদ উজ জামান, শফিউল আলম ও ফজলে রাব্বী সাদেক আহমেদ। গতকাল রাজধানীর 
প্রথম আলো কার্যালয়ে

দুর্যোগ প্রশমন দিবসে গোলটেবিল

দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বয় জরুরি

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম প্রস্তুতি, সরকারি-বেসরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের কাছে সময়মতো সহায়তা পৌঁছানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা। তাঁরা বলছেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, বেসরকারি সংস্থা ও জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন আলোচকেরা। ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) ও প্রথম আলো যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে। এতে সহযোগিতা করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, হেলভেটাস সুইস ইন্টারকোঅপারেশন, স্টার্ট বাংলাদেশ হাব ও ইডিএম।

বৈঠকে সম্মানিত অতিথি ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নুরুন আখতার। তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি দুর্যোগের শিকার হওয়া দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ নবম। তাই ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতির দিক থেকেও এগিয়ে থাকবে হবে।

তিনি বলেন, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সরকার সহায়তা বরাদ্দ দিলেও তা প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতা থেকে যায়।

সরকারি বরাদ্দকে অনেক সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিজেদের অর্থের মতো দায়িত্ব নিয়ে ব্যয় করেন না। ফলে বরাদ্দের পুরো সুফল তৃণমূলের মানুষের কাছে পৌঁছায় না। সরকারি সহায়তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার ও জনগণ—উভয়কেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক (ত্রাণ) রাসেল সাবরিন বলেন, সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসন সমন্বিতভাবে কাজ করলে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানো সহজ হবে।

শৈত্যপ্রবাহ মোকাবিলায় আগাম পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকার একটি প্রটোকল তৈরির কাজ করছে বলে জানান রাসেল সাবরিন। তিনি বলেন, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সরকার প্রায় ১৫ লাখ ৬০ হাজার কম্বল বিতরণ করেছে। চলতি বছরও কম্বল কেনার প্রক্রিয়া চলছে। সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে শৈত্যপ্রবাহে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে সময়মতো সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হবে।

তবে শৈত্যপ্রবাহে কম্বল বিতরণের পাশাপাশি কর্মহীন মানুষের আয়-ক্ষতি পুষিয়ে দিতে নগদ অর্থসহায়তা বেশি কার্যকর বলে মনে করেন স্টার্ট নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার শফিউল আলম। তিনি বলেন, শীতের কারণে মানুষ তিন-চার দিন কাজে যেতে পারেন না। এতে তাঁদের আয় বন্ধ হয়ে যায়। তাই কম্বল দেওয়ার পাশাপাশি ওই কয়েক দিনের আয়-ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা প্রয়োজন।

শফিউল আলম বলেন, বাংলাদেশের চারটি জেলায় শৈত্যপ্রবাহ নিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনায় এ বিষয়টি উঠে এসেছে। আগাম সহায়তা কার্যকর করতে স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ানো এবং সরকারি সংস্থার পাশাপাশি স্থানীয় বেসরকারি সংস্থাগুলোকে কাজে লাগানো জরুরি।

আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস উপলক্ষে ‘বহুমাত্রিক দুর্যোগ মোকাবিলায় চাই শক্তিশালী ও সমন্বিত অংশীজন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা

ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর তথ্যভান্ডার তৈরির প্রস্তাব

দুর্যোগের সময় সহায়তা বণ্টনে সমন্বয় ও নির্ভুল তথ্যভান্ডারের ঘাটতির কথা তুলে ধরেন সরকারের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও ইএসডিওর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ফজলে রাব্বী সাদেক আহমেদ। তিনি বলেন, দুর্যোগের সময় কোনো কোনো এলাকায় মানুষ বারবার সহায়তা পেলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেকে তা থেকে বঞ্চিত হন। এ সমস্যা সমাধানে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর একটি সমন্বিত ডিজিটাল তথ্যভান্ডার তৈরি করা প্রয়োজন।

ফজলে রাব্বী সাদেক আহমেদ বলেন, দুর্যোগের আগাম প্রস্তুতি ও দ্রুত সহায়তা পৌঁছানোর জন্য উপজেলা পর্যায়ে বরাদ্দ রাখার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।

দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম প্রস্তুতি ও পূর্বাভাসভিত্তিক সহায়তার বিষয়টিকে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে বৈঠকে জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সানজিদা ইসলাম। তিনি বলেন, দুর্যোগের পর ত্রাণ দেওয়ার পরিবর্তে দুর্যোগের আগেই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে আর্থিক ও খাদ্যসহায়তা এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম পৌঁছে দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। এ জন্য আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসের ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় ও মাঠপর্যায়ের প্রশাসন আগাম কার্যক্রম শুরু করে।

সানজিদা ইসলাম বলেন, ঘূর্ণিঝড়প্রবণ ১৯টি জেলার ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্বল অবকাঠামোর ঘরে বসবাসকারী মানুষকে আগেই সহায়তা দেওয়া গেলে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে দরিদ্র পরিবার, নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।

সক্ষমতা বাড়াতে হবে

বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ইএসডিওর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক মুহম্মদ শহীদ উজ জামান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশ্বে ভালো উদাহরণ তৈরি করলেও দুর্যোগের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ, মাঠপর্যায়ের কর্মী ও উন্নয়ন সহযোগীদের অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

বৈঠকে মূল উপস্থাপনা করেন হেলভেটাস সুইস ইন্টারকোঅপারেশন বাংলাদেশের প্রজেক্ট ইন্টার্নশিপ অ্যান্ড লোকালাইজেশন কো-অর্ডিনেটর আয়াতুল্লাহ আল-মামুন। উপস্থাপনায় বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততা এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বন্যা, খরা ও নদীভাঙন মানুষের জীবন ও জীবিকার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

উপস্থাপনায় আরও বলা হয়, ২০০৮ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত উপকূলীয় জেলাগুলোতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের প্রায় ৬৮ শতাংশ ভূমি লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সূচনা বক্তব্য দেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী। আরও বক্তব্য দেন ইডিএমের হেড অব হেলথ প্রোগ্রামস মনা আল আমিনে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজের অধ্যাপক খোন্দকার মোকাদ্দেম হোসেন, ইএসডিওর পরিকল্পনা ও দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিভাগের প্রধান মো. মশিউর রহমান, হেলভেটাস সুইস ইন্টারকোঅপারেশন বাংলাদেশের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর শামীম আহমেদ, ইডিএমের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী শামীমা আখতার ও ডিএমইআরটির প্রতিষ্ঠাতা মাহমুদুল ইসলাম প্রমুখ।